অন্তর্বর্তী সরকার ক্রান্তিকালীন সময়ে বাংলাদেশ পরিচালনার দায়ভার গ্রহণ করেছে। যে প্রত্যাশা নিয়ে দেশের মানুষ তাদের এই দায়ভার দিয়েছে, সেই প্রত্যাশা পূরণে তারা যদি ব্যর্থ হয় তাহলে কিন্তু দেশের মানুষ তাদের একেবারে ক্ষমা করে দেবে, সেটা নাও হতে পারে। সম্প্রতি নয়া দিগন্তকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান এসব কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, সংস্কারের জন্য অনির্দিষ্ট সময় সরকারের হাতে নেই। এটা সরকারকে বুঝতে হবে। আজকে যারা সরকারে গিয়েছেন বাংলাদেশের মানুষ তাদের পক্ষে কিছুদিন আগে যে রাজপথে মুহুর্মুহু স্লোগান দিয়েছে, সেই একই মানুষ কিন্তু আবার সরকারের বিরুদ্ধেও স্লোগান দিতে পারে। এটাই বাংলাদেশের মানুষের চরিত্র। সেই বিষয়টি সম্পর্কে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে।
দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে বিএনপির অন্যতম এই শীর্ষ নেতা রাষ্ট্র সংস্কার, ছাত্রদের নতুন রাজনৈতিক দল গঠন, নির্বাচন ও বিএনপির সাথে ভারতের সম্পর্কসহ নানা বিষয়ে মতামত তুলে ধরেছেন। নি¤েœ সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত তুলে ধরা হলো-

নয়া দিগন্ত : গণঅভ্যুত্থানের পর প্রায় ৭ মাস কেটে যাচ্ছে। কেমন বাংলাদেশ দেখছেন?
ড. মঈন খান : বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের অনেক প্রত্যাশা এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ওপরে। বিএনপি আশা করে যে, বাংলাদেশের মানুষের যে আকাক্সক্ষা, গণতন্ত্রের যে আকাক্সক্ষা, এ দেশের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার যে আকাক্সক্ষা, এ দেশের দরিদ্র মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির যে আকাক্সক্ষা, সেই আকাক্সক্ষা পূরণে এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দ্রুততম সময়ে তাদের যে এই ক্রান্তিকালীন কার্যক্রম সেটা তারা পালন করবে এবং তৎপরবর্তীতে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ একটি নির্বাচনের মাধ্যমে তারা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব ফিরিয়ে দেবে। এখানে একটি কথা বলা প্রয়োজন যে, বিষয়টি ক্ষমতায় যাওয়ার নয়। মানুষ হয়তো অনেক সময় এভাবে চিন্তা করে- রাজনৈতিক দলগুলোও হয়তো সেভাবে চিন্তা করে যে, তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য ক্ষমতায় যাওয়া। আমি সেটা বিশ্বাস করি না। রাজনৈতিক দলের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশের মানুষের সেবা করা। কেউ যদি মনে করে যে রাজনীতি আমার পেশা (কিংবা ব্যবসা) সেটা কিন্তু সঠিক হবে না। রাজনীতি একটি ভিন্নধর্মী চিন্তাধারা এবং যারা সেই আত্মত্যাগে বিশ্বাসী হয়েছে, আমি মনে করি তারাই রাজনীতিতে সত্যিকার অবদান রাখতে পারবে। এবং সেই চিন্তাধারা থেকে আমরা মনে করি, এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার যেগুলো অত্যাবশ্যক, যে সংস্কার অবিলম্বে করা প্রয়োজন সেই অত্যাবশ্যকীয় সংস্কারগুলো সম্পন্ন করে দ্রুততম সময়ে তারা একটি সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথ বাংলাদেশের বার কোটি ভোটারের কাছে উন্মুক্ত করে দেবে। এবং সেটা অর্জন হলেই আমি বিশ্বাস করি, এই দেশের মানুষ তাদের প্রত্যাশা পূরণে আশাবাদী হবে।

নয়া দিগন্ত : অন্তর্বর্তী সরকার কি জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে সক্ষম হচ্ছে?
ড. মঈন খান : এটা নির্ভর করবে এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কিভাবে তাদের পরিকল্পনা করছে তার উপর। সেটা আমরা সঠিকভাবে এখনো জানি না। তারা বিভিন্ন সময়ে আমাদের সাথে আলোচনা করেছে। আমরা তাদেরকে আমাদের মতামতগুলো দিয়েছি। আমি স্পষ্ট ভাষায় জনসমক্ষে বলেছি যে, আমাদের সামনে একটি প্রিসিডেন্স রয়েছে। একটি পূর্ব উদাহরণ রয়েছে যেখানে আমরা দেখেছি যে, মাত্র নব্বই দিনের মাথায় এরশাদ সরকারের ৯ বছরের জঞ্জাল অপসারিত করে তারা একটি সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে সক্ষম হয়েছিল। জাস্টিস সাহাবুদ্দীন সাহেব তার কাজের মাধ্যমে সেটা প্রমাণ করেছিলেন এবং বাংলাদেশের মানুষ বিপুল উৎসাহ ও উদ্যমে ১৯৯১ সালে নির্বাচনে গিয়েছিল। সে নির্বাচনটি সর্বজন স্বীকৃত যে, সেটি সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ হয়েছিল এবং এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, বাংলাদেশের তেপ্পান্ন বছরের ইতিহাসে সেটি সম্ভবত সর্বোৎকৃষ্ট নির্বাচন। কাজেই বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে একটি অনির্দিষ্ট সময় নিয়ে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করবে, দুনিয়ার সব সংস্কার শেষ করে তারা নির্বাচন দেবে এটা খুব যুক্তিসঙ্গত মনে হয় না এবং বাংলাদেশের মানুষের যে সাইকোলজি এবং তাদের যে মনোবৃত্তি তাতে এটা যে খুব বেশি গ্রহণযোগ্য হবে সেটাও আমার মনে হয় না।

নয়া দিগন্ত : অনেকে বলছেন যে, এই সরকার আসলে একটা দুর্বল সরকার। তারা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিসহ অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। আপনি কী মনে করছেন? সরকার কি সঠিকভাবে শক্ত হাতে দেশ পরিচালনা করতে পারছে?
ড. মঈন খান : আমি খোলাখুলি বলেছি। তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না, নাকি তারা নিয়ন্ত্রণ করছেন না। সেই প্রশ্নটি কিন্তু জনমানুষের মনে রয়েছে। তারা কি ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্বল হয়ে বসে আছেন নাকি তারা আসলেই দুর্বল? এটাই হচ্ছে মূল প্রশ্ন। তাদের দুর্বল হওয়ার কোনো কারণ নেই। তারা জনগণের একটা ইচ্ছার পরিপ্রেক্ষিতে এই দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন। তারা হয়তো বলতে পারেন যে দেশের মানুষ জোর করে এটা তাদের ওপরে চাপিয়ে দিয়েছে। এটা যেমন সত্য, পাশাপাশি এটাও তো সত্য যে তারা কিন্তু সেই দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। পরে এসে এখন যদি তারা বলেন যে, তাদের সেই ক্ষমতা নেই যেটা প্রকারান্তরে তারা ইতোমধ্যে বলেছেন, তাহলে তো সেটা যুক্তিসঙ্গত হবে না। তাহলে অন্য একটি পথ থাকবে তাদেরকে সেই দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে যারা এই দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম তাদের ওপর সেই দায়িত্ব দিতে হবে। কথাটি কিন্তু সেখানে নয় যে, সংস্কারের প্রশ্নটি এখন এসেছে। এটা একটু ব্যাখ্যার দাবিদার। দেখুন, পৃথিবী সৃষ্টির লগ্ন থেকেই কিন্তু আমরা সংস্কারের ভেতর দিয়ে আজকে এই সভ্য জগতের পর্যায়ে এসেছি। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ তো প্রাচীন ঐতিহাসিক যুগে তারা তো বনে-জঙ্গলে বাস করত। আজকে তো মানুষ সেই পর্যায়ে নেই। এটা কিভাবে হয়েছে? সংস্কারের মাধ্যমেই হয়েছে, শুধু পরিবতর্নের মাধ্যমেই হয়েছে। কাজেই এই সংস্কার বলুন, পরিবর্তন বলুন, সেটা তো চলতেই থাকবে এবং সেটা কোনো দিন থেমে যাবে না। আমরা বিশ্বাস করি যে, এই সরকার একটি খুব নির্দিষ্ট একটি দায়িত্ব নিয়ে এই ক্রান্তিকালীন সময়ে বাংলাদেশ পরিচালনার দায়ভার গ্রহণ করেছে। এবং সেই দায়ভার তাদের কিন্তু পালন করতে হবে এবং তারও কিন্তু একটি জবাবদিহিতা রয়েছে। সেই জবাবদিহিতাও কিন্তু তাদের দিতে হবে। যে প্রত্যাশা নিয়ে দেশের মানুষ তাদের এই দায়ভার দিয়েছে, সেই প্রত্যাশা পূরণে তারা যদি ব্যর্থ হয় তাহলে কিন্তু দেশের মানুষ যে তাদের একেবারে ক্ষমা করে দেবে, সেটা নাও হতে পারে। বাংলাদেশের মানুষের যে চরিত্র সেটা তো আমরা জানি, আমরা বুঝি। আমরা মানুষের সাথে কাজ করি। আমরা দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা তাদের সুখে দুঃখে তাদের পাশে থাকি। মানুষ কী চায়, কী প্রত্যাশা করে সেটা আমরা বুঝতে পারি অনেক সময়। হয়তো সেটা তারা মুখ ফুটে নাও বলতে পারে। কিন্তু বিষয়টি হচ্ছে এই যে, বাংলাদেশের গণমানুষের একটি প্রত্যাশা- সেটা হচ্ছে একটি ছোট্ট দেশ। এখানে বিশাল জনসংখ্যা। আপনি বলছেন যে, এখানে সঙ্ঘাত রয়েছে, এখানে দ্রব্যমূল্যের সমস্যাটি রয়েছে, যেটি হয়েছে বিগত সরকারের পনেরো বছরে অর্থনৈতিক যে লুণ্ঠন তার ফলশ্রুতিতে সৃষ্টি হয়েছে। হাজার হাজার কোটি টাকা যারা বিদেশে লোপাট করে দিয়েছে, মেগা প্রকল্পের নামে তারা মেগা দুর্নীতি করেছে। তারা দরিদ্র মানুষের রক্ত শুষে নিয়েছে। ট্যাক্সের টাকা যেটা বাংলাদেশের কোটি কোটি দরিদ্র মানুষ প্রতিটি মুহূর্তে ভ্যাটের মাধ্যমে সরকারের কাছে জমা দিয়েছে, সেই টাকা অলিগার্করা নিজেরা লুণ্ঠন করেছে। তারা বিশাল সম্পদ নিজেদের জন্য- তাদের গুটিকয়েক মানুষের জন্য পুঞ্জীভূত করেছিল। তারা কী না করেছিল? এটা শুধু একটি স্বৈরাচারী সরকার ছিল তা নয়, স্বৈরাচারী সরকারের পাশাপাশি এটা কিন্তু একটি অলিগার্কি পদ্ধতিতে রূপান্তরিত হয়েছিল এবং সেই কারণে বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে আমি জানি না, সম্ভবত মাত্র ১৬ শ’ লোক ছিল বেনিফিশিয়ারি। কোটি কোটি মানুষ, তারা কেবল আত্মত্যাগ করেছে। তারা পরিশ্রম করেছে। এ দেশের উন্নয়নে তারা কাজ করেছে। কিন্তু তার সুফল দেশের সেই দরিদ্র জনগোষ্ঠী পায়নি। এই কথা মনে রেখে, এই বর্তমান সরকারের কাছে বিশাল জনগণের প্রত্যাশা তারা একটি সুষম সমাজ প্রণয়ন করবে। তারা একটি সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে। সত্যিকার জনপ্রতিনিধিদের হাতে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব যাতে যেতে পারে সেই ব্যবস্থাটি তারা সৃষ্টি করে দেবে। এই প্রত্যাশা পূরণেই তারা কাজ করবে। আমরা শুধু এইটুকুই বলতে চাই, এর বেশি কিছু বলার নেই।

নয়া দিগন্ত : আমরা মাঝে মাঝে শুনতে পাই বা বৈষম্যবিরোধী স্টুডেন্টদের প্ল্যাটফর্ম থেকে বলা হয় যে, শুধু একটি নির্বাচনের জন্য এই বিপ্লব হয়নি। আপনার মতামত কি ?
ড. মঈন খান : তাহলে আমাকেও যদি একটু অপ্রিয় কথা বলতে হয়, তাহলে কি এই বিপ্লব হয়েছিল যে আমি সরকারি চাকরিতে মোটা বেতনের চাকরি পাব, দামি গাড়ি দৌড়াব? সেই জন্য কি বিপ্লব হয়েছিল? এটা ভুল ধারণা। ছাত্রগোষ্ঠীর কথা আপনি বলছেন? যারা প্রথমে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নেমেছিল তারা মেধার ভিত্তিতে কি চাকরি পেয়েছিল? এই কঠিন কথাগুলো যদি আপনি আমাকে বলতে বাধ্য করেন, তাহলে তো আমাকে বলতে হবে যে, দেশের একটি বিশাল সমস্যায় যে তরুণ জনগোষ্ঠী, যারা লেখাপড়া করেছে বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তারা বের হয়েছে তারা একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন যাপন করছে। এই সমস্যাটি কিন্তু কোন ছোট্ট সমস্যা নয় এবং তারা দেখেছে তাদের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও এখানে একটি রাজনৈতিক দল তাদের দলীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে। তারা দলের অযোগ্য ছাত্রছাত্রীদের চাকরি দিয়েছে। কিন্তু যারা সত্যিকার অর্থে মেধাবী এবং যোগ্য তাদেরকে চাকরি দেয়নি। তাই তারা ফুসে উঠেছিল। এটা তো অস্বীকার করার কোনো উপায় নাই এবং তারা রাজপথে নেমেছিল এবং তাদের ডাকে আপামর ছাত্র জনতা রাজপথে নেমেছিল। ঢাকার রাজপথে ৫ আগস্ট যে জনগোষ্ঠী ছিল তার শতকরা কত শতাংশ সত্যিকার ছাত্র ছিল? আজকে যদি আমি সেই প্রশ্নটি জিজ্ঞাসা করি তাহলে হয়তো আমি অপ্রিয় হয়ে যাব। কিন্তু এটাই বাস্তবতা। বাস্তবতার ভিত্তিতে যে আন্দোলনটি হয়েছে সেটি আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। ছাত্ররা একটি দীর্ঘ সময়ব্যাপী আন্দোলন, যেটি পনেরো বছর ধরে বিগত পনেরো বছর থেকে এই ফ্যাসিস্ট, অত্যাচারী স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে হয়েছে- তার শেষ পর্যায়ে এসে যখন ছাত্র-জনতা তাদের নিজেদের দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল, তখন সব দাবি একাকার হয়ে গিয়েছিল। আমি কিন্তু এই আন্দোলনটিকে এভাবেই দেখি। বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের ভিতরে যে সুপ্ত ক্ষোভ, সেই সুপ্ত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হয়েছিল সর্বশেষ মুহূর্তে এসে জুলাই-অগাস্ট ২০২৪ সালে। তারই ফলশ্রুতিতে লাখ লাখ মানুষ ঢাকার রাজপথে- তারা সবাই কি ছাত্র ছিল? সবাই তো ছাত্র ছিল না। এমনকি আজকে যারা নিজেদের ছাত্র নেতা বলে দাবি করেন তারা কি সত্যিকার অর্থে ছাত্র? তাদের ছাত্রত্ব তো কিন্তু বেশ আগেই শেষ হয়ে গেছে। আপনারা আমাকে সত্যিকারভাবে এই কঠিন কথাগুলো বলতে বাধ্য করেছেন। আমি তো না বলে পারছি না। এই আন্দোলনকে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের মুক্তির আন্দোলনে, এ দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির আন্দোলনে সার্বিক বিবেচনায় এনে এটাকে বিশ্লেষণ করতে হবে। এটা সত্যি কথা যে, সর্বশেষ পর্যায়ে ছাত্ররা এসে এখানে একটি বিস্ফোরণোন্মুখ রাজনৈতিক পরিবেশে তারা দিয়াশলাইয়ের কাঠি যেমন স্ফুলিঙ্গ তৈরি করে, সে স্ফুলিঙ্গ দিয়ে তারা আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল এবং সেই স্ফুলিঙ্গের আগুন তখন দাবানলের মতো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং তারই ফলশ্রুতিতে কিন্তু হাসিনা সরকার পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। সার্বিক এই আন্দোলনটি কিন্তু শুধু চৌঠা বা পাঁচই আগস্টের আন্দোলন নয়, এই সত্যটিও কিন্তু আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। একটি দীর্ঘস্থায়ী মানুষের যে আকাক্সক্ষা আমি বলব, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের যে আকাক্সক্ষা ছিল যে, এ দেশের মানুষ গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে, মানুষের ভোটের অধিকার থাকতে হবে এবং মানুষ তাদের মনের যে ইচ্ছা সেটি অবাধে তারা একটি নির্বাচনের মাধ্যমে প্রকাশ করবে। এই আকাক্সক্ষা থেকেই কিন্তু বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়েছিল। বাংলাদেশের মানুষ বুঝতে পেরেছিল যে, পাকিস্তানের মানুষের যে মনোবৃত্তি, সেই অবকাঠামোর ভেতরে কোনো দিন সত্যিকার গণতন্ত্র সম্ভব নয়। এবং সেটা বুঝতে পেরেছিল বলেই একপর্যায়ে গিয়ে সেদিন তারা মুক্তিযুদ্ধে নেমেছিল, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল এবং একটি স্বাধীন দেশ তারা সৃষ্টি করেছিল। আজকের এই তেপ্পান্ন বছরে আপনি যদি মানুষের যে প্রতিরোধ, মানুষের যে প্রতিবাদ, সেই ইতিহাসগুলো যদি ধারাবাহিকতা হিসেবে যদি আপনারা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন, তাহলে দেখতে পাবেন যে, এই চৌঠা বা পাঁচই আগস্টের আন্দোলন কিন্তু কেবলমাত্র চৌঠা/পাঁচই আগস্টের, উনসত্তরের/নব্বইয়ের বা ভাষা আন্দোলনেরই ছিল না। এই আন্দোলন কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের অন্তরে সুপ্ত। যে গণতন্ত্রের আকাক্সক্ষা, গণতন্ত্রের আকাক্সক্ষার আন্দোলন সেটা কিন্তু মানুষের, বাংলাদেশের মানুষের মনে চিরস্থায়ী একটি প্রতিবাদ এবং এটা কোনো একটি সময়ের সীমারেখায় আবদ্ধ নয়। আমি এটা বিশ্বাস করি।

নয়া দিগন্ত : সরকার সংস্কারের জন্য গোটা পনেরো কমিশন গঠন করেছে। ইতোমধ্যে অনেকগুলো কমিশন রিপোর্ট জমা দিয়ে দিয়েছে। সরকারের তরফ থেকে কি আমরা এই সংস্কার প্রক্রিয়াকে ত্বরিতগতিতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য খুব একটা উদ্যোগ দেখছি?
ড. মঈন খান : সরকার যেটা বলেছে সেটা কিন্তু আমি আবার অযৌক্তিক মনে করি না। সরকার বলেছে যে তারা তাদের কমিশনগুলোর রিপোর্টগুলো যখন তাদের কাছে পৌঁছবে তখন তারা সেগুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনায় বসবে। কাজেই তাদের যে ঘোষিত নীতি তার পেছনে চমৎকার যুক্তি রয়েছে। সেটা আমি অস্বীকার করব না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যে, কেবল মুখে বললে তো হবে না। এই কাজটির জন্য তো কোনো অনির্দিষ্ট সময় সরকারের হাতে নেই। এটা সরকারকে বুঝতে হবে। আমি একটু আগে যে কথা বলেছি যে বাংলাদেশের মানুষ আজকে যারা সরকারে গিয়েছেন তাদের পক্ষে তারা রাজপথে মুহুর্মুহু স্লোগান দিয়েছে। সেই একই মানুষ কিন্তু আবার সরকারের বিরুদ্ধেও স্লোগান দিতে পারে। এটাই বাংলাদেশের মানুষের চরিত্র। সেই বিষয়টি সম্পর্কে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে। সরকার যদি বিশ্বাস করে যে তারা ভালো কাজ করছে, সরকার যদি বিশ্বাস করে তারা এ দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করছে, তাহলে সরকার সাহস করে সেটা জনগণের সামনে পরীক্ষা দিতে প্রস্তুত থাকুক। এখানে একটি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যে প্রশ্নটি আপনি এখনো করেননি তা হয়তো আপনি পরে করবেন। আমি এখনই সেটা বলছি। যে সংশ্লিষ্ট বিষয় সেটা হচ্ছে এই যে, সরকার যদি সত্যিই বিশ্বাস করে তারা ভালো কাজ করছে তাহলে তারা জনগণের কাছে ভোট চাইতে পারে। আমি এতে কোনো বাধা দেখি না। তারা আজকে যে কথাটি বলেছে, যে ছাত্ররা রাজনৈতিক দল গঠন করবে এটা তো আগে ছাত্ররা বলেছিল। এখন তো আমাদের প্রধান উপদেষ্টা তিনি নিজেই বলেছেন। একটি ইন্টারভিউতে- বিশ্বের একটি নামিদামি পত্রিকার ইন্টারভিউতে তিনি নিজেই বলেছেন, আমি তো কোনো সমস্যা দেখি না। ছাত্ররা কেন? আজকে যারা রয়েছেন তারা যদি বিশ্বাস করেন যে তারা ভালো কাজ করছেন, তারা জনগণের কাছে ভোট চাইবেন, চাইতে পারেন। কিন্তু প্রশ্নটি এখানে - বাংলাদেশের মানুষ যেটা বিশ্বাস করে যে ক্ষমতায় থেকে নয় এবং আমরা কিন্তু যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি সৃষ্টি করেছিলাম সংবিধানের অ্যামেন্ডমেন্টের মাধ্যমে, তখন কিন্তু যারা অন্তর্বর্তীকালীন এই কাজগুলো করত তারা কিন্তু পরবর্তী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য যোগ্যতা হারিয়েছিল। কেননা এটা একটা ন্যাচারাল জাস্টিস হিসেবে বলা হয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কনসেপ্টটা এই যে, আমি ক্ষমতার অপব্যবহার করে যেন কোনো নির্বাচন না করি এবং সেই আইডিয়া থেকেই কিন্তু এটা এসেছে যে, আজকে যারা সরকারে আছেন তারা যদি নির্বাচন করতে চান- তারা জনগণের জন্য ভালো কাজ করছেন- এটা যদি তারা বিশ্বাস করেন এবং তারা জনপ্রিয় বলে নিজেদের যদি তারা দাবি করেন এতে কোনো সমস্যা আমি দেখি না। নির্বাচন করতে হলে তো তাদের সরকারের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে জনতার কাতারে আসতে হবে এবং জনগণের ভোট চাইতে হবে। জনগণ যদি তাদের ভোট দেয়, তাদেরকে দিয়ে পরবর্তী সরকার গঠনের জন্য জনগণ যদি ইচ্ছা প্রকাশ করে সেটা হবে। তাতে আমাদের তো কোনো আপত্তি নেই। আমরা তো সেই কথাই বারবার বলেছি। মানুষের এই দেশের সত্যিকার মালিক তো সরকার নয়। এ দেশের সত্যিকার মালিক হচ্ছে জনগণ। সরকারকে তারা একটা নির্দিষ্ট সময় দেশ পরিচালনা করার দায়িত্ব দেয় এবং সেই দায়িত্ব তারা দেয় একটা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোটের মাধ্যমে। এই যে, ৩০০ সংসদ সদস্যকে তারা যে দায়িত্বটি দেয়, কোটি কোটি মানুষের ভোটের মাধ্যমে, ১৬ কোটি মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে যে ৩০০ লোককে নির্বাচিত করে, যে দায়িত্বটা দিচ্ছে, এটা কিন্তু কোনো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নয়। একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য, পাঁচ বছরের জন্য। ফলে এই সংসদ সদস্যদের আবার জনগণের কাছে পরীক্ষা দিতে ফিরে আসতে হয় আরেকটি সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে। এবং জনগণ যদি দেখে তারা ভালো কাজ করেছে, জনগণের সেবা করেছে তাহলে তারা সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারবে। জনগণ যদি আবার ভোট না দেয়, জনগণ মনে করে যে তারা উত্তীর্ণ হয়নি, তাহলে দ্বিতীয়বার সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা থাকলে দ্বিতীয়বার তাদেরকে আর জনগণ ভোট দেবে না এবং যদি জনগণ তাদেরকে দ্বিতীয়বার ভোট না দেয় তাহলে তাদের বিদায় নিতে হবে। এটাই হচ্ছে গণতন্ত্রের মূল কথা।

নয়া দিগন্ত : বৈষম্যবিরোধী ছাত্ররা পলিটিক্যাল পার্টি গঠন করার কথা বলছে। বিএনপি কি এটাকে তেমন চ্যালেঞ্জ মনে করছে না?
ড. মঈন খান : বিএনপি তাদের মতামত দিয়েছে। এখন আমি নিজেও বলছি যে ছাত্ররা একটি রাজনৈতিক দল গঠন করবে, এটা তো তাদের মৌলিক অধিকার। আমি একটু আগে এ কথাও বলেছি, তারা কিন্তু সত্যিকার অর্থে ছাত্র নয়। আমরা তাদের ছাত্র বলছি, যারা ছাত্র বলে নিজেদের পরিচয় দিয়েছে তারা সত্যিকার অর্থে তাদের মধ্যে কয়জন এনরোলমেন্ট করা স্টুডেন্ট এটা আমার সন্দেহ আছে। কিন্তু যাই হোক, আমরা তাদের ছাত্র বলছি, ছাত্র-জনতা বলছি আমরা। কিন্তু প্রশ্নটি হচ্ছে এই যে, তারা যদি একটি রাজনৈতিক দল গঠন করতে চায়, কনস্টিটিউশনে তো রাইট দেয়া হয়েছে, সিস্টেমে দেয়াই আছে। এখানে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করতে তো কোনো বাধা আমি দেখি না। কিন্তু রাজনৈতিক দল গঠন করায় নয়, প্রশ্নটি হচ্ছে যে, এই রাজনৈতিক দল গঠন করার প্রক্রিয়ায় তারা আজকে যারা সরকারে আছেন তারা এটার পেছনে থেকে কাজ করবেন কি না? এই সত্যটিই কিন্তু জনমনে সংশয় সৃষ্টি করেছে।

নয়া দিগন্ত : প্রধান উপদেষ্টা একটা সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘ছাত্রদের রাজনৈতিক দল গঠন করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।’ আপনার কি মনে হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতিদিনের কার্যক্রম কিংবা তাদের সার্বিক বিষয়ে ছাত্রদের একটা প্রভাব আছে।
ড. মঈন খান : ছাত্রদের প্রভাব থাকবে না কেন? থাকলে অসুবিধাটা কি? ছাত্ররা যতক্ষণ সঠিক কথা বলবে দেশের মানুষ তাদের লুফে নেবে, আমি এটা বিশ্বাস করি। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ছাত্রদেরকে বাংলাদেশের মানুষ ভালোবেসে বুকে তুলে নেয়নি? উনসত্তরের আন্দোলনে যখন পাকিস্তানি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে, সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্ররা আন্দোলন করেছিল, পূর্ব পাকিস্তানে তখন কোটি কোটি মানুষ তাদেরকে বুকে ধারণ করেনি? ছাত্ররা যখন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল, তখন কি বাংলাদেশের মানুষ তাদেরকে মুক্তিযুদ্ধ করার পেছনে যে সার্বিক সহযোগিতা সেটি কি বাংলাদেশের মানুষ দেয়নি? তৎপরবর্তীতে আমরা দেখেছি যে, ১৯৮৯-৯০ সালে সেই সময় ছাত্ররা এরশাদের স্বৈরাচারী সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে, সেখানে গিয়ে বাংলাদেশের মানুষ তাদের সহযোগিতায় নিশ্চয়তা দিয়েছে এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালে ছাত্রদের যে কোটা আন্দোলন, যেটা পরবর্তীতে হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়, সেখানে গিয়ে দেশের মানুষ তাদের সহযোগিতা দিয়েছে। ছাত্রদের উপরে তো বাংলাদেশের মানুষের অগাধ আস্থা রয়েছে। ছাত্রদের উপরে এই দেশের মানুষ যে আস্থা রেখেছে আমি বিশ্বাস করব। আমি আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করব। ছাত্ররা সেই আস্থার মূল্যায়ন করে ঠিক সেভাবে তারা নিজেদের পরবর্তী কার্যক্রম নির্ধারণ করবে।

নয়া দিগন্ত : অন্য একটি প্রসঙ্গে আমরা যাই। শেখ হাসিনা এবং তার দলের মূল নেতৃত্ব দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে এবং তারা বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছে। কেউ কেউ মনে করে যে, আওয়ামী সরকার গত দেড় যুগ বিনা ভোটে ক্ষমতায় যে টিকেছিল, এর পিছনে ভারত ছিল তাদের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। এই বিপ্লবের পর ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক কি স্বাভাবিক হয়েছে?
ড. মঈন খান : এখন এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমি মনে করব দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের যে রাজনীতি সেটার উপরেও কিছু আলোকপাত করতে হবে। ভারত এই অঞ্চলের একটি বড় দেশ। তাদের জনসংখ্যা এখন অনেকে বলেন বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ। বিশাল সামরিক শক্তি তাদের রয়েছে। তাদের জ্ঞান বিজ্ঞানের শক্তিও রয়েছে তবে সেখানে তাদের অনেক রাজনৈতিক দলও বলছে, একসময় ভারতের রাজনীতিতে- আমরা যেটা বলি ধর্মনিরপেক্ষতা- সেটি একটি মূলনীতি ছিল সেটাতে আজকে অবশ্য কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। আজকে সম্ভবত সেখানে হিন্দুত্ব প্রাধান্য পাচ্ছে। এটিও একটি দিক। ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো ছাড়াও অর্থনৈতিক দিক থেকে ভারত বিশ্বে একটি বৃহৎ শক্তিশালী অর্থনীতি। এ কথাগুলো বলার পরও যে প্রশ্নটি রয়ে যায়, সেটা হচ্ছে, একটি অঞ্চলে একজনকে নেতৃত্ব দিতে হলে এই যে ফ্যাক্টরগুলো আমি একটু আগে তালিকাবদ্ধ করেছি, শুধু সেই ফ্যাক্টরগুলোই প্রাধান্য পেলে হবে না। তার বাইরে তাকে অন্য কিছু কাজ করতে হবে। যেমন- আমরা কী দেখেছি এখানে? ভারতবর্ষে আমরা কী দেখছি? আমরা দেখেছি, আজকের যে ভারত, সেই ভারতের চারপাশে যে ছোট ছোট দেশগুলো রয়েছে, একটি একটি করে যদি তাদের সাথে ভারতের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখবেন একটি বড় দেশ হওয়ার যেসব মূল নীতির কথা একটু আগে উল্লেখ করেছি, তার সাথে একটি কন্ট্রাডিকশন সৃষ্টি হয়েছে এবং একটু লক্ষ করলে সেই কন্ট্রাডিকশনগুলো আপনারা স্পষ্ট দেখতে পাবেন। নেপালের সাথে ভারতের দ্বন্দ্ব কেন সৃষ্টি হলো? কেন শ্রীলঙ্কার সাথে ভারতের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হলো? আপনারা দেখুন, মালদ্বীপ একটি ছোট্ট দেশ। কত হাজার মানুষ বাস করে সেখানে? সেই দেশের সাথে ভারতের তো কোনো কম্পিটিশনের কোনো প্রশ্ন নেই। তাহলে সেখানে কেন দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হলো? বাংলাদেশের প্রশ্নে আমি সর্বশেষে যাব। তার আগে বলি, যে পাকিস্তান ভারতবর্ষ থেকে ভেঙে সৃষ্টি হয়েছিল, সেই পাকিস্তানের সাথে সাতচল্লিশ সাল থেকে আজ পর্যন্ত কেন তাদের সুসম্পর্ক সৃষ্টি হলো না? একটি দ্বন্দ্ব ক্রমাগত সৃষ্টি হয়ে রয়েছে। আর বাংলাদেশ? হ্যাঁ, এটা সত্যি যে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভারতবর্ষের সহায়তা না পেলে হয়তো এত দ্রুত ৯ মাসের মধ্যে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করতে পারতাম না। সেই সমর্থনটা আমরা ভারত থেকে পেয়েছিলাম। এটা ফ্যাক্ট, এটা তো অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু প্রশ্নটি সেটি নয়। প্রশ্নটি হচ্ছে যে, যদি এটাই আমরা মনে রাখি, তাহলে তো বাংলাদেশ ভারতের যে মধুর সম্পর্ক সেই সম্পর্ক তো চিরদিন ঠিক থাকার কথা। আমি উল্টো আপনাকে প্রশ্ন করতে চাই যে, তাহলে ভারতের সাথে বাংলাদেশের এই সম্পর্কটা আজকে এই পর্যায়ে কেন এসেছে? এর জন্যে কে দায়ী? আমি এ কথা বললে হয়তো অত্যুক্তি হবে না যে, ভারত তাদের নীতিগত পর্যায়ে যে ভুলটি করেছে সেটি হচ্ছে এই যে, তারা ভারতের মানুষ এবং বাংলাদেশের মানুষের সুসম্পর্ক স্থাপনের কোনো প্রচেষ্টা না নিয়ে তাদের পলিসি হিসেবে তারা ভারতের সরকার ও বাংলাদেশের সরকার এর মধ্যে সুসম্পর্ক স্থাপনের প্রচেষ্টা চালিয়েছে। এবং যার ফলশ্রুতিতে আজকের দুই দেশের মধ্যে এই বৈরী পরিবেশের উদ্ভব হয়েছে। তারা বাংলাদেশে যে একটি অত্যাচারী, একটি স্বৈরাচারী, একটি নির্যাতনকারী, একটি মানবাধিকার হরণকারী সরকার ছিল, তাদেরকে তারা অন্ধভাবে সমর্থন দিয়েছে, দিয়ে যাচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষ সেটা গ্রহণযোগ্য মনে করেনি। সেই কারণেই আজকে বাংলাদেশের সাথে ভারতের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে। আমি স্পষ্ট ভাষায় কথাটি বলছি। আশা করি আপনার প্রশ্নের উত্তর পেয়েছেন। এখানে বলা প্রয়োজন যে, আজকে ভারতের তিনটি গোষ্ঠী- একটি হচ্ছে রাজনৈতিক নেতারা, একটি হচ্ছে তাদের ব্যুরোক্রাট, প্রশাসক, কূটনীতিকবৃন্দ- বিভিন্ন নীতিনির্ধারক যারা সাউথ ব্লকে বসে নীতি নির্ধারণ করেন এবং সর্বশেষ ভারতের সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজিস্ট যারা রয়েছেন, তারা বাংলাদেশকে কেন শত্রু বলে মনে করছে? বাংলাদেশ ও ভারতের শত্রু হওয়ার কোনো কারণ নেই। যদি বাংলাদেশ ভারতের শত্রু হওয়ার কোনো কারণ না থাকে, তাহলে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে তারা স্ট্র্যাটেজিক পজিশন কেন নিতে যাবে? কেন বাংলাদেশে এমন একটি সরকারকে তাদের ব্যাক করতে হবে, যে সরকার গণতান্ত্রিক নয়? ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো, আমরা তার প্রশংসা করি। আমরা বিভিন্ন সময়ে দেখেছি- একটা ছোট্ট উদাহরণ দেই- এই যে বর্তমান সরকার যেটা ভারতে রয়েছে তারা তৃতীয়বারের মতো নির্বাচিত হয়েছে। সেই নির্বাচনের আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন যে তার পপুলারিটি অনেক বেড়ে গিয়েছে। ভারতের সংসদে বা লোকসভায় চারশ’র বেশি সিট তারা পাবেন, এ কথা প্রকাশ্যে চারিদিকে বলে গিয়েছেন। এখন প্রশ্ন হলো, সেই চারশ’র বেশি সিট পাওয়ার পরিবর্তে আজকে ভারতের সেই মৌলবাদী দল, তারা কেন একক সরকার গঠন করার জন্যে প্রয়োজনীয় অর্ধেক সিটও তাদের দলটি পায়নি? আমি বিশ্বাস করি এই কারণে যে, শেখ হাসিনা সরকার যেভাবে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করেছে, সেভাবে ভারতের প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়ে যায়নি এবং যায়নি বলেই ভারতে সাতচল্লিশ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত যতবার সরকার পরিবর্তন হয়েছে তার প্রত্যেকটি সরকার কিন্তু নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন হয়েছে। আমি পাল্টা প্রশ্ন করতে চাই, ভারত যে মৌলিক কাঠামো সাতচল্লিশ সালের পর থেকে দীর্ঘ পঁচাত্তর বছরের বেশি সময় ধরে তারা সৃষ্টি করেছে, তারা যে প্রতিষ্ঠানগুলো সৃষ্টি করেছে, আমরা কি এখনো বাংলাদেশে তা পেরেছি? ৫৩ বছরের ইতিহাসে দেখুন কী হয়েছে। তবে এটাও সত্যি, ভারত তাদের পজিটিভ যে সাইডগুলো আছে সেগুলোকে তাদের বর্তমান সরকার প্রাধান্য না দিয়ে তারা তাদের একটি এক্সট্রিম পলিসিকে বাংলাদেশে কার্যকর করতে চেয়েছিল শেখ হাসিনার মতো জনবিরোধী একটি সরকারের উপরে ভর করে এবং তার ফলশ্রুতিতে কিন্তু- আপনি যে প্রশ্নটি আমাকে করেছেন- এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যার কারণে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ ভারতের এই অন্যায় নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদে মুখর হয়ে আছে।

নয়া দিগন্ত : আমাদের এই দেশের জনগণের মধ্যেও একটা এন্টি ইন্ডিয়ান সেন্টিমেন্ট আমরা দেখছি এবং ছাত্র মুভমেন্টের মধ্যেও দেখেছি ভারতবিরোধী নানা স্লোগান। বিপ্লবের পরে বিএনপির সাথে ভারতের কি একটা যোগাযোগ বা সুসম্পর্ক তৈরি হয়েছে?
ড. মঈন খান : বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কী বলে? বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি বলে যে, সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়। আমরা তো যখন আমরা সরকারে ছিলাম, আমরা তো সেই নীতিই আমরা অনুসরণ করেছি। আজকে আমরা বিরোধীদলে আছি। আমরা তো সেই নীতিরই অনুসারী। কাজেই এখানে কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো অবস্থান নেবার কোনো কারণ নেই। কিন্তু কথাটি সেখানে নয়। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, আপনি যেটা নিজেও উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশের জনগণের ভারতের প্রতি তাদের যে মনোভাব, সেই মনোভাবটা এভাবে কেন বিগড়ে গেছে সেটাকে বুঝতে হবে। সেই বিষয়টি উপলব্ধি করতে হবে এবং তার একটি মূল কারণ, আমি যেটা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের মানুষ তার অন্তর থেকে তারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিশ্বাস করে। আমিও অনেকবার বলেছি, বাংলাদেশের মানুষকে যদি দুটি অপশন দেয়া হয়- আইদার অর - হয় গণতন্ত্র পাবে অথবা উন্নয়ন পাবে, বাংলাদেশের মানুষ কিন্তু উন্নয়নকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে, বলেছে, আমার উন্নয়ন প্রয়োজন নেই। আমি গণতন্ত্র চাই। যখন তারা লক্ষ করেছে যে, ভারতের যে নীতি সেটা বাংলাদেশের গণতন্ত্র প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে চলে গেছে, তখনই কিন্তু তারা ভারতকে প্রত্যাখ্যান করেছে। আজকে যেটা প্রকাশ পেয়েছে, বাংলাদেশের মানুষের ভারতের প্রতি এই মনোভাবটা তৈরি হয়েছে যখন বাংলাদেশের মানুষ লক্ষ করেছে যে ভারত গণতন্ত্র বিরোধী একটি শক্তিকে বাংলাদেশের ভেতরে ব্যাকআপ করছে। ভারতের প্রতি আমি আরেকটু স্পষ্ট করে বলে দেই যে, ভারতের প্রতি এই যে প্রতিবাদ যেটা সৃষ্টি হয়েছে, সেটা কিন্তু ভারতের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের প্রতিবাদ নয়। আমি মনে করি যে, এটা আসলে শেখ হাসিনার, আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি যে বাংলাদেশের মানুষের অবিশ্বাস, ঘৃণা এবং প্রতিবাদ, মনস্তাত্ত্বিকভাবে যেটা প্রতিফলিত হয়েছে।

নয়া দিগন্ত : কেউ কেউ বলেন, বিপ্লবোত্তর বিএনপির সাথে ইন্ডিয়ার একটা ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। শেখ হাসিনার পলায়নের পরে রাজনৈতিক নানা ইস্যুতে বিএনপি যে স্ট্যান্ড নিচ্ছে, সেগুলো কি আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করা অথবা আওয়ামী লীগকে দ্রুত ফিরে আসার পথ তৈরি করে দিচ্ছে?
ড. মঈন খান : এই প্রশ্নটির উত্তর দিতে হলে আমাকে একটু বাংলাদেশ, ভারত, আওয়ামী লীগ, বিএনপি এসবের বিশ্লেষণে যেতে হবে। আগেই বলেছি যে, বাংলাদেশের যে পররাষ্ট্র নীতির যে কথাটি এখানে উল্লেখ করেছি এবং বলেছি সেটা সবার সাথে বন্ধুত্বের নীতি। এর বাইরে বিএনপি কখনো যায়নি। সেটি হচ্ছে একটি দিক। আর দ্বিতীয়ত আমি মনে করি এটা বিশ্লেষণ করতে হবে এভাবে যে, বিএনপির সাথে আমরা যখন ভারতের সম্পর্কের কথা বিবেচনা করি- যে বিষয়টি আপনি উপস্থাপন করেছেন- সেখানেও কিন্তু আমি বলব যে, এখানেও বিএনপিকে যে বিষয়টি চিন্তা করতে হবে বিষয়টি ভারত সরকারের বিষয় নয়। বিএনপিকে বিবেচনা করতে হবে ভারতের জনগণের সাথে কী সম্পর্ক সেটা এবং ভারতের মানুষকে আমরা কিভাবে দেখতে চাই। ভারতের মিডিয়ায় আমি খোলাখুলিই বলছি, ভারতের মিডিয়া যেভাবে সে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে এটাও কিন্তু খুব সঠিক নয়। কি তাই তো? যেটা সত্য সেটা জনগণের সামনে উপস্থাপন করা আর একটি কাল্পনিক গল্প তৈরি করে ডিস-ইনফরমেশন বা মিথ্যা ইনফরমেশন দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করা- এটা তো কোনো মিডিয়ার কাজ হতে পারে না। এবং আজকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যে বৈরী সম্পর্ক তাতে মিডিয়ারও একটি রোল রয়েছে। বিএনপির নীতি তো কারো বিরুদ্ধে শত্রুতা করা নয়। কিন্তু যে ভুল করেছে আওয়ামী লীগ আজকে, যে ভুল তারা করে চলেছে, তারা আগামীতে নির্বাচনে আসবে কি আসবে না, সে প্রশ্নটি আপনি করেও আমাকে খোলাখুলি বলেননি। এসব ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা মতামত দেয়া আসলে কিন্তু বিএনপির নয়। কেউ যদি এটার উত্তর দিয়ে থাকেন, আমি মনে করি সেটাও সঠিক নয়। এবং কেউ যদি এই প্রশ্ন করে থাকেন সেটাও আমি মনে করি সঠিক নয়। আওয়ামী লীগ পরবর্তী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কি না এবং আরো খোলাখুলিভাবে, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে পুনর্বাসিত হবে কি হবে না, তার দুটো প্রশ্নেরই সত্যিকার উত্তর নির্ভর করবে আওয়ামী লীগের ওপর। কী চায় সেটা আওয়ামী লীগকে নির্ধারণ করতে হবে। এ দেশে জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে রাজনৈতিক দল পরিচালনা করতে চায় নাকি আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে এসে অন্য কারো প্রতিনিধি হিসেবে এ দেশের রাজনৈতিক দল পরিচালনা করতে চায়, সেটা আওয়ামী লীগকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তারা রাজনীতিক হিসেবে কি জনগণের সেবা করতে চায়? সে ব্যাপারে এই সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগকে নিতে হবে। সত্যিকার অর্থেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কি বাংলাদেশে একটি সত্যিকার জনকল্যাণমুখী রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের ইমেজ সৃষ্টি করতে চায়, নাকি তারা বাংলাদেশে একটি স্বৈরশাসক হিসেবে তাদের ইমেজ অব্যাহত রাখবে। এই সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগকে নিতে হবে। তারা যখন এই প্রশ্নগুলো নিজেদের করবে এবং এই প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর আওয়ামী লীগ বের করতে পারবে, তখন কিন্তু আপনি যে প্রশ্নটি করেছেন তার উত্তর সবার কাছে অটোমেটিক্যালি স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্পষ্ট হয়ে যাবে। তখন আমাকে সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে না। আরেকটু যোগ করে দিচ্ছি। আপনি বলুন, আজকে তো ৫ আগস্টের পরে ছয় মাস প্রায় অতিক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। এই ছয় মাসে আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সর্বনিম্ন পর্যায় পর্যন্ত একটি নেতাকর্মী আপনি দেখাতে পারবেন, তারা যে চরম জঘন্য অপকর্ম বাংলাদেশে করেছে- বিগত পনেরো বছর নিয়ে তাদের কোনো অন্তর্দাহ আছে, তাদের কোনো ক্ষোভ লজ্জা আছে, তাদের কোনো কলঙ্ক তারা নিজেরা স্বীকার করেছে যেসব কাজ তারা ভালো কাজ করেনি? আজও পর্যন্ত তারা বড়াই করে বলে যাচ্ছে যে, তারা যা করেছে এ দেশের জন্য ভালো করেছে তারা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে, তারা হয়তো আওয়ামী লীগ দল হিসেবে এ কথা বলতে পারে। বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষ যদি সেটা মেনেই নিতো তাহলে তো আজকে তারা বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত হতো না। তাদের পলায়ন করতে হতো না। তারা নিজের লজ্জা ঢাকার জন্য অথবা নিজেদের জীবন বাঁচানোর জন্য তারা পালিয়ে যেত না। এটাই হচ্ছে আজকের বাস্তবতা। আওয়ামী লীগ ফেসবুকে একটা কর্মসূচি দিয়েছিল। আমি প্রশ্ন করতে চাই, এই কর্মসূচি না দিয়ে তারা যদি একটা আত্মশুদ্ধি কর্মসূচি বাংলাদেশের মানুষের কাছে দিত, ১লা ফেব্রুয়ারি থেকে ১৮ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সেটা বরং আওয়ামী লীগের জন্য মঙ্গলজনক হতো বলে আমি মনে করি।

নয়া দিগন্ত : অনেকে মনে করেন যে, আগামীতে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপিই ক্ষমতায় যাবে। বিএনপির আগামী দিনের পথ কি মসৃণ?
ড. মঈন খান : প্রথম কথা হচ্ছে যে, আপনি যেটা বলেছেন, আগামীতে নির্বাচন হলে বিএনপি ক্ষমতায় যাবে। আপনি অনুমতি দিলে আমি একটি ফর্মুলা যুক্ত করব একজন নগণ্য রাজনীতিক হিসেবে। এটা আমি কখনোই বিশ্বাস করি না যে আমরা ক্ষমতায় যাব। এই কনসেপ্ট, এবং রাজনীতিবিদদের ভেতর থেকে ক্ষমতায় যাওয়ার কনসেপ্টটি দূর করতে হবে। আমি একটু আগে বলেছি, রাজনীতি এমন একটি দায়িত্ব যেখানে ক্ষমতায় যাওয়ার কথা নয়। কথা হচ্ছে, জনগণ যদি আমাদের এই দায়িত্বটা অর্পণ করে। আমি ব্যাখ্যা করেছি একটু আগে যে, দেশের মালিক তো জনগণ, আমরা তো রাজনীতিক। আপনারা যে দেশের মালিক সেটা কিন্তু নয়। এমন একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, মানুষ ভাবছে রাজনীতিবিদরাই দেশ চালায়। তারাই দেশের সব কিছুর হর্তা-কর্তা-বিধাতা। কিন্তু সেটা নয়। সত্যিকার অর্থে এই দেশের হর্তা-কর্তা-বিধাতা হচ্ছে দেশের আঠারো কোটি মানুষ। তারা একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আমাদের দায়িত্ব দেয়। আমরা সে দায়িত্বটি পালন করতে চেষ্টা করি। আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন হতে হবে যাতে করে আমরা এটা মনে না করি যে, জনগণ আমাদের ক্ষমতা দিয়েছে। আমরা ক্ষমতার দাপটে ঘুরে বেড়াব। অর্থ-বিত্ত-বৈভব আমরা অর্জন করব। আমরা লুটপাট করব, আমরা শাসন করব। রাজনীতিকদের এ থেকে বের হয়ে আসতে হবে। দ্বিতীয় প্রশ্নটি করেছেন, আগামী দিন মসৃণ কি মসৃণ নয়। সেটা আমি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করি না। আমি যদি রাজনীতির পেশায় নিজেকে জড়িয়ে থাকি, তাহলে কিন্তু আগামীর পথ যদি মসৃণ নাও হয়, যদি দুর্গম হয়, তাহলেও আমাকে কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার মনোবৃত্তি শক্ত রাখতে হবে। রাজনীতি কখনোই কোনো মসৃণ পথে হয় না। রাজনীতির পথ কিন্তু দুর্বার এবং কঠিন। সেই মানসিকতা আমাদের রাখতে হবে। বাংলাদেশকে যেভাবে বিগত পনেরো বছরে বাংলাদেশের প্রতিটি সেক্টর, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি যা কিছু বলুন না কেন- শিক্ষানীতি আমি আলাদা করে বলছি- প্রত্যেকটি জিনিস বিগত পনেরো বছরে এই স্বৈরাচারী সরকার ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। এখন এটাকে রিডিম করতে হবে। আপনি একটা প্রশ্ন করেননি, কিন্তু এ প্রসঙ্গে আমি আরেকটি প্রশ্নের উত্তর আপনাকে দিচ্ছি যেটা আমি মনে করি আমাকে অনেকেই জিজ্ঞাসা করেন। আপনারা চিন্তা করছেন না? একদিকে তো ভালোই হচ্ছে, সব ডার্টি জব এ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার করে দিয়ে যাচ্ছে। সব কিছু ক্লিন হলে আপনারা ক্ষমতায় আসবেন। তখন তাদের যে এই প্রশ্নটি করেছেন, সেটি একটি ভুল ধারণা থেকে এসেছে। কেন হয়েছে? একটি রাজনীতিকের কখনো এটা চিন্তা করা উচিত নয় যে অন্য লোকে ডার্টি জব করে দিবে। আমি এসে সেটাকে এনজয় করব। ক্ষমতায় আসব। ভুল ধারণা। আমি দেশ পরিচালনা করব। যদি দেশের সমস্যা থাকে, যদি আওয়ামী লীগ দেশকে ডার্টি করে থাকে, আমি কেন সাহসী হয়ে সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করব না যে এই দেশকে আমি ক্লিন করব। কাজেই যারাই সত্যিকার অর্থে রাজনীতির পেশায় আছেন তারা চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসেন। আমিও ব্যক্তিগতভাবে কোনো চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে কখনো পিছপা হইনি। দেশের যত কঠিন সমস্যা আসুক রাজনীতিবিদদেরই সেটা সমাধান করতে হবে। একটি মসৃণ পথ তৈরি হলে সেই মসৃণ পথ দিয়ে আমি খুব সুন্দর স্যুট প্যান্ট, কোট, জুতো, পরে হেঁটে চলে যাব। এটা তো রাজনীতিকের জীবনের আদর্শ হতে পারে না। রাজনীতির পথ কঠিন দুর্বার, দুর্গম।

নয়া দিগন্ত : আগামী নির্বাচন কি সুষ্ঠু হবে?
ড. মঈন খান : না হওয়ার কী কারণ আছে বলুন? সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্যেই তো বিগত দেড় দশক ধরে আমরা আন্দোলন করেছি। বাংলাদেশের সকল গণতন্ত্রকামী রাজনৈতিক দল এবং বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ আপনারা দেখেছেন। আমরা যে দুই হাজার বাইশ সাল থেকে শুরু করেছিলাম, বাংলাদেশের দশটি বিভাগে আমরা সেই বিশাল বিশাল জনসমাবেশ করেছিলাম। সর্বশেষ আমরা করেছিলাম ঢাকায়। এভাবে আমরা আটাশে অক্টোবর ২০২৩ সাল, যেদিন এখানে ক্রাকডাউন করেছিল স্বৈরাচারী সরকার। তারা হয়তো সেদিন ভয় পেয়েছিল যে সেদিন স্বৈরাচারী সরকারের পতন হবে। তখন সেই ক্রাকডাউনের ফলশ্রুতিতে আমরা বেশ কিছুক্ষণ বেশ প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা আমরা সেখানে ছিলাম। তারপরে মহাসচিব সেখানে হরতালের ঘোষণা দিয়ে সেই সভাটি সমাপ্ত করেন। এই আন্দোলনগুলো আমরা কিন্তু স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে করেছিলাম এবং এই দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে যে একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, সেই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে ছাত্র-জনতা যখন রাজধানী ঢাকার রাজপথে যায়, সেই অভ্যুত্থান তখন শেষ পর্যায়ে। চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে এই সরকার পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। সেই সব আন্দোলন কিসের জন্য ছিল? গণতন্ত্রের জন্য। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া যাতে বাস্তবায়িত হয়, একটি সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন যাতে হয় সেই জন্যই তো আমরা রাজপথে থেকেছি। আমরা কথা বলেছি, আমরা আত্মত্যাগ করেছি। হাজার হাজার মানুষ মারা গিয়েছে, আহত হয়েছে। লাখ লাখ মামলা আমাদের উপরে দেয়া হয়েছে। মিথ্যা মামলা, গায়েবি মামলা দেয়া হয়েছে। ৫০ লাখ নেতাকর্মী বিরোধী দলে, তাদের আসামি করা হয়েছে। তো আমাদের উদ্দেশ্যটা কি? এই যে আত্মত্যাগ, এই আত্মত্যাগের উদ্দেশ্যটা কী ছিল? বাংলাদেশে গণতন্ত্র আনতে হবে এবং সেই গণতন্ত্র সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমেই আনতে হবে। কাজেই এই বিশ্বাস আমাদের আছে যে, নিশ্চয়ই আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ হবে। দেশের মানুষের যে আকাক্সক্ষা, সেই আকাক্সক্ষার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে এমন কোনো জনগোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে আছে এটা মনে করা ভুল হবে।

নয়া দিগন্ত : সাম্প্রতিক সময়ে বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছাত্রদের যে প্ল্যাটফর্ম রয়েছে, তাদের পক্ষ থেকে নানা দাবি তোলা হয়েছে। সংবিধান পরিবর্তন, এর পরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্রের একটা বিষয় এসেছে। এসব ক্ষেত্রে ছাত্রদের অবস্থানের বিপরীত অবস্থান ছিল বিএনপির। বিএনপির এই অবস্থান কি সঠিক ?
ড. মঈন খান : প্রশ্নটি একটু ব্যাখ্যার দাবিদার এই কারণে যে, আসলে আমরা যে বিরোধী অবস্থান নিয়েছি সেটা নয়। আমরা একটা যুক্তিসঙ্গত অবস্থান নেবার চেষ্টা করেছি। আমরা এটা বলার চেষ্টা করেছি যে একটা (ঘোষণাপত্র) তো হুট করে হয় না। আঠারো কোটি মানুষের একটা কনসার্নের বিষয় আছে। কাজেই আমরা কোনো দ্বন্দ্ব নয়, একটা আলোচনার কথা বলেছি। প্রধান উপদেষ্টা নিজেই তো বলেছেন, এটা রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনা করে করতে হবে। সবাই মিলে যদি একমত হয় তাহলে এটা করা হবে। আজকে আমরা যদি ছয় মাস পরে এসে একটা কাগজ তৈরি করে, ডকুমেন্ট তৈরি করে ব্যাকডেট দিয়ে সেটা ৫ আগস্ট ২৪ থেকে কার্যকরী করতে চাই, এটা কি আসলে বাস্তবসম্মত হবে? আমাদের তো কোনো বিরোধিতা নেই। এটা যাতে একটা গ্রহণযোগ্য ডকুমেন্ট হয় সেই কথাই বলেছি। সংবিধান বাতিলের প্রশ্নটি দেখুন বা দ্বিতীয় রিপাবলিক যেটা আপনি উল্লেখ করেননি, আমি উল্লেখ করে দিচ্ছি। ৫ আগস্টের পরে যে ৮ আগস্ট শপথ নিয়েছিল সরকার, সেটা তো সংবিধানের রেফারেন্সের মাধ্যমেই করা হয়েছে এবং সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্সের মাধ্যমে করা হয়েছে। আর সংবিধানকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে তো এই সরকার আসেনি। এই যে বাস্তবতা, এই বাস্তবতাকে এখন আমি হয়তো কাগজে-কলমে অস্বীকার করতে পারি। আমি একটা পুরনো কথা মনে করিয়ে দিতে চাই। ১৯৭৫ সালের মার্চে সংবিধানে ১৫ মিনিটের ব্যবধানে তো বাহাত্তরের সংবিধানকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে এ দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রকে বিসর্জন দিয়ে একদলীয় বাকশাল সৃষ্টি করা হয়েছিল। সেটি কি টিকেছে? গায়ের জোরে হয়তো অনেক কিছু করা যায়, কিন্তু সেটা আলটিমেটলি টেকে না। এর ভূরি ভূরি প্রমাণ আছে। একটা রেকর্ড আমাদের দলিল হিসেবে থাকবে কিন্তু তার অর্থ এটা নয় যে এটাকে ব্যাকডেটেড করতে হবে। আমরা জানি দুর্নীতিপরায়ণ আমলারা ব্যাকডোর দিয়ে ফাইলে অনেক কিছু করে থাকে। জনগণের সামনে থেকে সামনের দরজা দিয়ে ছাত্র-জনতা এ দেশকে মুক্ত করেছে। তারা পেছনের দরজা দিয়ে কেন কাজ করবে?

নয়া দিগন্ত : বিপ্লবের পরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একধরনের অনৈক্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। এক পার্টি অন্য পার্টির বিরুদ্ধে বলছে। ঐক্যে কি ফাটল ধরেছে?
ড. মঈন খান : না, না, আমি বিশ্বাস করি আমরা বিগত ১৫ বছরের আন্দোলন সংগ্রাম করেছিলাম একসাথে। ৪৫টি রাজনৈতিক দলকে নিয়ে কোয়ালিশন করেছিলাম। আমরা কিন্তু সে ঐক্য এখনো বাজায় রেখেছি। এখানে ভিন্ন মতাবলম্বী রাজনৈতিক দল আছে। ঐক্যের প্রশ্নে ইতোমধ্যে আমি উত্তর দিয়েছি। ঐক্য থাকবে- তবে ঐক্যের অর্থ এই নয় যে, আমরা আবার বাকশাল করে ফেলব। সবাইকে বাধ্য করব একই কথা বলতে, এটা হতে পারে না। যার যার ভিন্ন মত থাকবে, এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।

নয়া দিগন্ত : ধন্যবাদ।
ড. মঈন খান : আপনাদের অগণিত পাঠক এবং আপনাকেও ধন্যবাদ।