একদিনে সূচকের উন্নতিতে সাড়ে তিন বছরের রেকর্ড গড়েছে পুঁজিবাজার। গতকাল দেশের দুই পুঁজিবাজারেই এ ঘটনা ঘটে। ধারাবাহিক পতনের পর সাম্প্রতিক সময়ে ঘুরে দাঁড়ানো পুঁজিবাজারগুলো গতকাল একদিনে সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ সূচকের উন্নতি দিয়ে দিন শেষ করে। পুঁজিবজারের এ আচরণকে স্বাভাবিক মনে করলেও এ মুহূর্তে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ঘনিষ্ঠ নজরদারির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। অপর দিকে, বাজারের সাম্প্রতিক প্রবণতাকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে লোকসানে থাকা বিনিয়োগকারীরা চাচ্ছেন ক্ষতি পুষিয়ে নিতে।
সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখেই মূলত ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে পুঁজিবাজার। কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া দীর্ঘ দিন ধরে ধুঁকতে থাকা পুঁজিবাজারগুলো গত বছরের শেষ দিকে আরো বড় পতনের শিকার হয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে এমন ধারণা থেকে দেশী-বিদেশী প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তি বিনিয়োগকারীরা ব্যাপকভাবে শেয়ার বিক্রি করতে থাকেন। কিন্তু নির্বাচনী প্রচারাভিযানে খারাপ কোনো বার্তা না পাওয়ায় নির্বাচনের আগের সপ্তাহ থেকে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে দেশের দুই পুঁজিবাজারে। আর এরই ধারাবাহিকতায় গত ১১ কর্মদিবসে টানা উন্নতি ঘটে পুঁজিবাজার সূচকের। গতকাল তারই চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে। দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স এ দিন ১১৫ দশমিক ৫৯ পয়েন্ট তথা ২ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচকের উন্নতি ঘটে ৪০২ দশমিক ৪৮ পয়েন্ট। ২০১৫ সালের ২৫ মের পর একদিনে পুঁজিবাজার সূচকের আর এত উন্নতি ঘটেনি।
পুঁজিবাজার পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ড. মির্জা আজিজুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, এ মুহূর্তে বাজার স্বাভাবিক আচরণই করছে। দীর্ঘ দিন ধরে ব্যাপক দরপতন ঘটতে থাকায় বাজারের মূল্যস্তর ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখেও ধারাবাহিক দরপতনের শিকার হয় পুঁজিবাজার। কিন্তু নির্বাচনে বড় ধরনের কোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটেনি। তা ছাড়া, নির্বাচন পরবর্তী নতুন সরকার গঠনের ফলে সর্বস্তরের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা তৈরি হয়েছে। বাজারের সাম্প্রতিক আচরণ তারই প্রতিফলন। তিনি মনে করেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঠিক নজরদারি বজায় থাকলে এখন যেভাবে বাজার আচরণ করছে তাতে সাড়ে ছয় হাজার পর্যন্ত সূচকে তেমন একটা ঝুঁকি থাকার কথা নয়।
মির্জা আজিজ আরো বলেন, ডিএসইর ব্রোকারদের সরকার যথেষ্ট নীতি সহায়তা দিয়েছে। এটা কাজে লাগিয়ে অনেকে তাদের শেয়ার বিক্রির টাকা বাজারে বিনিয়োগ করবেন। আইসিবি বাজারে বিনিয়োগ সুযোগ নিতে বড় মাপের বন্ড ছেড়েছে। এ টাকাও বাজারে ঢুকবে। তাই এ মুহূর্তে বাজারে তারল্যের অভাব থাকবে না। বিনিয়োগকারীরাও এসব ব্যাপারে খুবই সচেতন। তবে সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতাকে কাজে লাগিয়ে বরাবরই কিছু কিছু মৌলভিত্তিহীন কোম্পানির যে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটে সে বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে।
বিশিষ্ট পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, গত এক বছরের বেশি সময় ধরে পুঁজিবাজারে যে দরপতন ঘটেছে সে তুলনায় এখনো সূচকের তেমন উন্নতি ঘটেনি। স্বাভাবিক বাজার আচরণ হিসেবে আরো বাড়তে পারে বাজার সূচক। নতুন সরকার, নতুন অর্থমন্ত্রী সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটার আস্থার ভাব তৈরি হয়েছে। এটারই প্রতিফলন ঘটছে বাজার সূচকে। তবে তিনি মনে করেন, সূচকের উন্নতি বড় কোনো বিষয় নয়। সরকারের উচিত এ মুহূর্তে বাজারের গভীরতা বাড়ানোর দিকে নজর দেয়া। অনেক ভালো কোম্পানি এখনো লিস্টেড হচ্ছে না। ইউনিলিভারের মতো অনেক বহুজাতিক কোম্পানি এখনো পুঁজিবাজারের বাইরে। বাজারকে ঝুঁকির বাইরে রাখতে হলে এ ধরনের ভালো ভালো কোম্পানিগুলোকে বাজারে নিয়ে আসতে হবে। ভালো শেয়ারের প্রবাহ বাড়লে খারাপ কোম্পানিগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন বিনিয়োগকারীরা। বাজারের ঝুঁকিও হ্রাস পাবে। তিনি সর্বাবস্থায় বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন।
জানতে চাইলে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটির অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মুসা নয়া দিগন্তকে বলেন, বিগত দিনগুলোতে পুঁজিবাজার যেভাবে মন্দার শিকার হয়েছে তাতে বাজারের মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির বেশির ভাগই সাম্প্রতিক সময়ের সর্বনি¤œ মূল্যস্তরে নেমে এসেছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের ক্রেজ তৈরি হয়েছে। স্বল্প মূল্যস্তরের এসব শেয়ার সবার হাতের নাগালে। সবাই তা কিনছেন। তা ছাড়া, আস্থারও একটি বিষয় আছে। নতুন সরকার গঠনের পর এক ধরনের আস্থার পরিবেশও তৈরি হয়েছে, তাই বিনিয়োগও বাড়ছে।
তিনি আরো বলেন, বিনিয়োগ নিরাপদ করার দায়িত্ব বিনিয়োগকারীদেরই। তাদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোন কোম্পানিতে বিনিয়োগ করবেন। বিনিয়োগ সম্ভাব্যতা যাচাই করে ভালো কোম্পানিতেই বিনিয়োগ করা উচিত। এরপরও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে সার্বক্ষণিক বাজার পরিস্থিতির ওপর ঘনিষ্ঠ নজরদারি রাখতে হবে।
গতকাল বিভিন্ন ব্রোকার হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকের ট্রেডিং ফ্লোরগুলো ঘুরে দেখা যায়, বিনিয়োগকারীদের উপচে পড়া ভিড়। তাদের চোখেমুখে ছিল আস্থার প্রতিফলন। কয়েকজন বিনিয়োগকারীর সাথে আলাপ করে জানা যায়, এ মুহূর্তে তারা অতীতের লোকসান সামলে ওঠার স্বপ্ন দেখছেন। তারা চান বাজার স্বাভাবিক আচরণ করুক। আর কেউ যেন বাজারকে অনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে না পারে সেদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা নজর দিক।
অস্বাভাবিকতা দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা
সূচকের উন্নতিতে সাড়ে ৩ বছরের রেকর্ড ডিএসইর
একদিনে সূচকের উন্নতিতে সাড়ে তিন বছরের রেকর্ড গড়েছে পুঁজিবাজার। গতকাল দেশের দুই পুঁজিবাজারেই এ ঘটনা ঘটে। ধারাবাহিক পতনের পর সাম্প্রতিক সময়ে ঘুরে দাঁড়ানো পুঁজিবাজারগুলো গতকাল...





