পাবলিক পরীক্ষায় গ্রেডিং পদ্ধতি পরিবর্তনের সাথে প্রশ্ন পদ্ধতিরও পরিবর্তন চান শিক্ষক অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের অনেকে। তাদের মতে বহু নির্বাচনী প্রশ্ন যেমন বাদ দেয়া উচিত তেমনি বাদ দেয়া উচিত সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতিও। বহু নির্বাচনী প্রশ্ন বাদ দেয়ার দাবি জানিয়ে একজন শিক্ষক বলেছেন, পরীক্ষার হলে বাতাসে উড়ে বহু নির্বাচনী প্রশ্নের উত্তর। বহু নির্বাচনীর নামে যাচ্ছে তাই চলছে।
বহু নির্বাচনী প্রশ্নের উত্তর যেমন পরীক্ষা হলে বলে দেয়া আর দেখা দেখির ঘটনা ঘটে তেমনি এ কারণে এক সময় অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে প্রশ্নফাঁস। গত বছর ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এসএসসি ও সমমানের সব বিষয়েরই বহু নির্বাচনী বা এমসিকিউ প্রশ্ন পরীক্ষা শুরুর আগেই ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাঁস হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর ২০ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রেস কনফারেন্সে প্রশ্নফাঁস বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, টিক মারাটা বন্ধ করে দেবো। ওখানেই সুবিধা বেশি। ওটা বন্ধ করে দেবো।
এরপর গত বছর অনুষ্ঠিত সমাপনী পরীক্ষায় বহু নির্বাচনী প্রশ্ন বন্ধ করা হয়। কিন্তু এখনো চালু রয়েছে এইচএসসি পর্যন্ত এ ব্যবস্থা। শিক্ষক অভিভাবকদের অনেকে এমসিকিউ বন্ধের পক্ষে। তবে এ বিষয়ে আলোচনার সময় কোনো কোনো অভিভাবক ও শিক্ষার্থী এমসিকিউ রাখার পক্ষে মত দেন। তাদের মতে এতে অধিক নম্বর পাওয়া আর জিপিএ ৫ পাওয়া সহজ।
বর্তমানে এইচএসসি পর্যন্ত ৩০ নম্বরের এমসিকিউ চালু রয়েছে। ১৯৯২ সালে যখন এসএসসিতে এমসিকিউ পদ্ধতি চালু হয় তখন এটি ৫০ নম্বরের ছিল। ২০১৭ সাল থেকে ৩০ নম্বরের এমসিকিউ পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে।
অপর দিকে সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি বিশেষ করে সৃজনশীল প্রশ্নের সংখ্যা ও প্রশ্নের উত্তর লেখার জন্য বরাদ্দকৃত সময় নিয়ে এক সময় দেশব্যাপী শিক্ষার্থীরা রাজপথে মিছিল সমাবেশ করেছে। কিন্তু এখনো এসএসসি ও এইচএসসি পর্যায়ে সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর লেখার জন্য যে সময় বরাদ্দ রয়েছে তাতে আতঙ্কিত অভিভাবক আর শিক্ষার্থীরা।
অনেক শিক্ষক-অভিভাবক জানিয়েছেন এ পদ্ধতিও বাতিল করা উচিত। কারণ যে উদ্দেশে এটি চালু করা হয়েছিল বাস্তবে তার কিছুই হয়নি। মুখস্ত প্রবণতা কমেনি বরং আগের চেয়ে বেড়েছে। আর এ পদ্ধতির কারণে সবার জন্য এখন অপরিহার্য হয়ে পেড়েছে গাইড নির্ভরতা। একই সাথে বেড়েছে কোচিং আর প্রাইভেট নির্ভরতা। পূর্বে যেখানে এসএসসি পর্যন্ত গাইডের দরকার হতো না সেখানে বর্তমানে পঞ্চম শ্রেণী থেকেই সবার জন্য গাইড বাধ্যতামূলক হয়ে গেছে। গাইড আর কোচিং প্রাইভেট ছাড়া অচল যে সৃজনশীল ব্যবস্থা তা কোনো অবস্থাতেই শিক্ষার মান বাড়াতে পারে না। এ পদ্ধতি তাই অবিলম্বে বাদ দেয়ার পক্ষে অনেক শিক্ষক অভিভাবক।
এমসিকিউ পদ্ধতি বাতিলের দাবি জানিয়ে অনেক শিক্ষক বলেছেন এ কারণে পরীক্ষার হলে অসদুপায় প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। নকল উঠে গেলেও এমসিকিউ পদ্ধতি ঘিরে পরীক্ষার হলে নানা ধরনের অনিয়ম দুর্নীতি বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সাথে জড়িয়ে পড়ছে এক শ্রেণীর অসাধু শিক্ষকও।
বর্তমানে পরীক্ষার হলে নৈরাজ্য অনেকটা কমে এলেও কয়েক বছর আগে সারা দেশের বিভিন্ন পরীক্ষার হলে নৈরাজ্য ছড়িয়ে পড়ে। আর এর মূলে ছিল এমসিকিউ পদ্ধতি। ফলাফল প্রতিযোগিতায় লিপ্ত নামকরা অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পারস্পরিক আতাতের মাধ্যমে পরীক্ষার কেন্দ্রে শিক্ষার্থীদের উত্তর বলে দেয়ার অভিযোগ ওঠে। এমনকি পরীক্ষা শুরুর অনেক আগেই প্রশ্নের প্যাকেট খুলে শিক্ষক কর্তৃক প্রশ্নের উত্তর তৈরির সময় হাতেনাতে ধরা পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। পাবলিক পরীক্ষার সময় বিভিন্ন পরীক্ষার হলে দেখা গেছে শিক্ষার্থীরা একত্রে বসে উত্তর তৈরি করছে। এসবের ভিডিও দৃশ্যও তখন ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
এমসিকিউ বাতিলের পক্ষে শিক্ষকদের মতে এই পদ্ধতির কারণে ভালো মন্দের পার্থক্য করা কঠিন হয়ে গেছে। বাস্তবে দেখা গেছে ক্লাসে একজন শিক্ষার্থীর ভালো পারফরম্যান্স না থাকা সত্ত্বেও পাবলিক পরীক্ষায় সে ভালো রেজাল্ট করছে। সহজে পাস করতে পারা, পাসের হার বৃদ্ধি এবং অধিক নম্বর পেলেও শিক্ষার্থীদের মানের উন্নতি হয়নি এ পদ্ধতিতে। বরং মানের অবনতি হয়েছে বলে মনে করেন তারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইংরেজি বিভাগের প্রফেসর এমিরিটাস সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সৃজনশীল ও এমসিকিউ পদ্ধতির সমালোচনা করে বলেন, একজন শিক্ষার্থী কোন কিছু বুঝলো কি-না তা মূল্যায়নের একটি ভালো উপায় হলো তাকে কিছু লিখতে বলা।
কেরানীগঞ্জে অবস্থিত নুরুল আলম স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রিন্সিপাল দেওয়ান বাকিউল্লাহ নয়া দিগন্তকে বলেন, এমসিকিউ আর সৃজনশীলের কারণে রেজাল্ট ভালো হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে ভালো রেজাল্টা কর বেশ সহজ। কিন্তু এমসিকিউর কারণে শিক্ষার মান কমেছে। এ পদ্ধতি বাতিল করা উচিত। এ ছাড়া সৃজনশীলের পরিবর্তে পূর্বের রচনামূলক ও সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন পদ্ধতি ভালো ছিল। তিনি বলেন, পাবলিক পরীক্ষায় গ্রেডিং পদ্ধতি পরিবর্তনের সাথে প্রশ্নপদ্ধতিও পরিবর্তন করা দরকার।