তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা এ বছর থেকেই তুলে দেয়ার কথা বলা হয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে। কিন্তু সারা দেশের প্রায় সব স্কুলে সম্প্রতি শেষ হয়েছে মধ্যবর্তী পরীক্ষা। আর পরীক্ষা মানেই ঘরে ঘরে চলছে শিশুদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। অতিষ্ঠ অনেক অভিভাবক জানিয়েছেন এখন থেকেই পরীক্ষা বাতিল করলে ভালো হতো। শিশুদের পরীক্ষা নিয়ে বাড়াবাড়ি আর সহ্য করার মতো নয়।
রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংক কলোনিতে অবস্থিত একটি স্কুলের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রীর একজন অভিভাবক জানান, তার মেয়ে প্রায় প্রতিদিন কাঁদতে কাঁদতে পরীক্ষার হল থেকে বের হয়। এত বেশি সৃজনশীল প্রশ্ন যে, কোনো পরীক্ষায়ই সব প্রশ্নের উত্তর লিখে সে শেষ করতে পারেনি। প্রতি বিষয়ে ছয় থেকে সাতটি করে বড় প্রশ্ন, সাত আটটি করে ছোট প্রশ্ন রয়েছে। এরপর রয়েছে শূন্যস্থান পূরণসহ আরো অনেক বিষয়। কিন্তু পরীক্ষার সময় মাত্র দুই ঘণ্টা। কিন্তু দুই ঘণ্টায় যে প্রশ্নের উত্তর লিখতে বলা হয়েছে তা আমাদের মতো বড়রাও লিখে শেষ করতে পারবেন না। ক্ষুব্ধ এ অভিভাবক জানান, সৃজনশীল আর বেশি প্রশ্নের কারণে তার মেয়ে সব প্রশ্ন পড়ারও সময় পায়নি। ফলে খুব খারাপ হয়েছে পরীক্ষা।
রাজধানীর খিলগাঁওয়ে অবস্থিত নামকরা এক স্কুলের একজন অভিভাবক জানান, তার ছেলে দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে। তারও পরীক্ষা শেষ হয়েছে এ সপ্তাহে। পরীক্ষার কারনে এমন কোনো দিন নেই যে পড়া নিয়ে তাকে মারধর করতে হয়নি। এত বেশি পড়ার চাপ যে, তা এত ছোট শিশুর পক্ষে সময়মতো পড়ে শেষ করানো যায় না। আর এত ছোট শিশু সব সময় পড়তেও চায় না। তাই পড়া আদায়ের জন্য আর পরীক্ষায় ভালো রেজাল্টের জন্য প্রতিদিন পিটিয়ে তার কাছ থেকে পড়া আদায় করতে হয়। পড়া নিয়ে এত অশান্তি আর সহ্য করা যাচ্ছে না।
অনেক অভিভাবক জানিয়েছেন, তারা আশা করেছিলেন এ বছর থেকেই তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত সব পরীক্ষা বন্ধ হবে। কিন্তু তা হলো না।
অনেক অভিভাবক আবার আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, স্কুলে হয়তো বছরে দু’টি বা তিনটি পরীক্ষা তুলে দেয়া হবে। কিন্তু তার পরিবর্তে আবার যদি সারা বছর ক্লাস টেস্ট আর মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা হয় তাহলে পরীক্ষা তুলে দিয়েও কোনো লাভ হবে না। এখন নামকরা অনেক স্কুলে বছরে দু’টি পরীক্ষা ছাড়াও সারা বছর প্রতি সপ্তাহে ক্লাস টেস্টের নামে পরীক্ষা চলছে। এ পরীক্ষা ঘিরেও শিশু ও শিশুর পরিবার প্রচণ্ডভাবে শারীরিক ও মানসিক চাপের মুখে রয়েছে। কারণ এ পরীক্ষার নম্বর যোগ করে মেধা তালিকা তৈরি করা হয়। সে কারণে মায়েরা এসব পরীক্ষা খুব গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেন এবং ছেলেমেয়েদের চাপ দিয়ে পড়া আদায় করেন। এ পরীক্ষার কারণে শিশুরা সারা বছর চাপে থাকে। তাই অভিভাবকেরা আশঙ্কা করছেন বছরে দু’টি পরীক্ষা তুলে দিয়ে যেন সারা বছর পরীক্ষা চাপিয়ে দেয়া না হয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ অনুযায়ী প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে গত মার্চ মাসে জানানো হয়, আগামী শিক্ষা বছর থেকে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পরীক্ষা বন্ধ করে দেয়া হবে। কয়েক দিন পর আবার মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, এ বছর থেকেই পরীক্ষা তুলে দেয়া হচ্ছে। এতে অনেক অভিভাবক আশা করেছিলেন হয়তো তাদের সন্তানরা মধ্যবর্তী পরীক্ষা থেকেই মুক্তি পাবে। কিন্তু সেটি না হওয়ায় আক্ষেপ প্রকাশ করেন অনেকে।
পড়ার নামে শিশুদের ওপর থেকে অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও মানসিক অত্যাচার বন্ধ করতে ও তাদের সুষ্ঠু বিকাশ যাতে ব্যাহত না হয় সে জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত শিশুদের পরীক্ষা বন্ধের নির্দেশ দেন এ বছর। প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণায় যারপরনাই খুশি হয়েছেন অনেক অভিভাবক। তবে তারা দ্রুত এ ঘোষণা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের প্রতি।