কয়েক দিন আগে সারা দেশের বিভিন্ন স্কুলে শেষ হয়েছে তৃতীয় শ্রেণীসহ বিভিন্ন শ্রেণীর অর্ধবার্ষিকী পরীক্ষা। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকার স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীর পরীক্ষায় সৃজনশীল প্রশ্নপত্র নিয়ে ক্ষোভ আর হতাশা বিরাজ করছে অভিভাবকদের মধ্যে। বিশেষ করে ইংরেজি আর গণিতের সৃজনশীল প্রশ্নপত্র দেখে মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার অবস্থা অনেক অভিভাবকের। রাজধানীর বিভিন্ন স্কুলে ইংরেজি আর গণিতে চার পৃষ্ঠা করে সৃজনশীল প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে পরীক্ষা নেয়া হয়েছে ছোট্ট শিশুদের। অনেক শিশুই পরীক্ষায় খারাপ করার পর ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে বের হয়েছে স্কুল থেকে। অনেক শিশু তেমন কিছুই বোঝেনি সৃজনশীল প্রশ্নসহ অনেক প্রশ্ন। আর পরীক্ষার খাতায়ও কিছু লিখতে পারেনি তারা। অনেক অভিভাবক তৃতীয় শ্রেণীর ইংরেজি ও গণিত বিষয়ের সৃজনশীল প্রশ্ন নিয়ে অকথ্য ভাষা ব্যবহার করেছেন স্কুলসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। অনেকে বলেছেন, লেখাপড়ার নামে আসলে বর্তমানে চলছে শিক্ষার্থী আর অভিভাবকদের প্রতি এক ধরনের নির্যাতন। এর পরিণত ভালো হতে পারে না পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য।
রাজধানীর মতিঝিল নটর ডেম কলেজের বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক কলোনির মধ্যে অবস্থিত একটি স্কুলের তৃতীয় শ্রেণীর ইংরেজি আর গণিতের সৃজনশীল প্রশ্নপত্র চার পৃষ্ঠা করে। ইংরেজি চার পৃষ্ঠার সৃজনশীল প্রশ্নে একটিও বাংলা শব্দ ব্যবহার করা হয়নি। আর প্রশ্নের যে ধরন আর যে পরিমাণ কঠিন প্রশ্ন করা হয়েছে সে বিষয়ে একজন অভিভাবক তীব্র ক্ষোভের সাথে বলেন, কিছু দিন আগে আমার এক মেয়ে সমাপনী পরীক্ষা দিয়েছে। আমি সে পরীক্ষায় ইংরেজির প্রশ্নপত্র দেখেছি। সমাপনী পরীক্ষায়ও এত কঠিন প্রশ্ন করা হয়নি। তৃতীয় শ্রেণীর একজন শিক্ষার্থী কিভাবে এসব প্রশ্নের উত্তর দেবে? প্রশ্ন দেখে মনে হয় সম্পূর্ণ ইংরেজি মাধ্যমে পড়ালেখা করছে তারা। ইংরেজিতে তারা খুবই দক্ষ। বাস্তবে কিন্তু মোটেই তা নয়।
তিনি বলেন, পঞ্চম শ্রেণীতে ডব্লিউএইচ প্রশ্ন ছিল। এটি শেখাতে অনেক বেগ পেতে হয়েছে আমার মেয়েকে। সেই প্রশ্ন দেয়া হয়েছে তৃতীয় শ্রেণীতে। এটি অমানবিক। ডব্লিউএইচ প্রশ্নসহ আরো যেসব প্রশ্ন করা হয়েছে তৃতীয় শ্রেণীতে তার সঠিক উত্তর দিতে হলে একজন শিক্ষার্থীকে ইংরেজি ভাষায় পারদর্শী হতে হবে। কিন্তু তৃতীয় শ্রেণীর একজন শিক্ষার্থী কিভাবে ইংরেজিতে এত দক্ষ হবে? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ক্ষুব্ধ এ অভিভাবক বলেন, মূল বইয়ের ইংরেজি এবং সেখানে প্রশ্নের যে নমুনা দেয়া আছে তাতে এত কঠিন বিষয় নেই। কিন্তু মূল বই অনুসারে প্রশ্ন করা হয়নি।
এ স্কুলের আরেক অভিভাবক হতাশা প্রকাশ করে বলেন, পরীক্ষার হলে শিক্ষক বলেছেন, ভালো করে প্রশ্ন পড়তে। আমার মেয়ে শিক্ষকের কথা শুনে মনোযোগ দিয়ে প্রশ্ন পড়েছে এবং তাতে দেড় ঘণ্টা কেটে গেছে। এরপর আধা ঘণ্টা বাকি ছিল। পরীক্ষা দুই ঘণ্টার। আধা ঘণ্টায় সে কী লিখবে বলেন। একেতো সৃজনশীল প্রশ্ন, তার ওপর খুবই কঠিন প্রশ্ন। অনেকে প্রশ্নের তেমন কিছুই বোঝেনি। আমার মেয়েতো ফেল করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক কলোনির এ স্কুলের আরেক অভিভাবক বলেন, লেখাপড়ার নামে আমাদের ওপর ভয়াবহ রকমের অবিচার চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। তৃতীয় শ্রেণীর একটি শিশু সৃজনশীলের কী বোঝে? আর এত বড় প্রশ্নপত্র পড়ে বুঝতেই তো পরীক্ষার হলে অর্ধেক সময় পার হয়ে যায়, তাহলে লিখবে কখন?
আরেক অভিভাবক এ প্রতিবেদককে বলেন, আমার তৃতীয় শ্রেণীর সন্তানের ইংরেজি সৃজনশীল প্রশ্নপত্র দেখে মনে হয়েছে এটি এসএসসির প্রশ্ন। তিনি বলেন, এটি কখনোই তৃতীয় শ্রেণীর প্রশ্ন হতে পারে না। এসএসসির অনেক শিক্ষার্থীও এ প্রশ্নে পরীক্ষা দিলে ৬০ এর বেশি পাবে কি না সন্দেহ আছে।
এ স্কুলের বাংলা ও বিজ্ঞান বিষয়ের সৃজনশীল প্রশ্ন তিন পৃষ্ঠা করে। অনেক অভিভাবক জানান, যেখানে তৃতীয় শ্রেণীর শিশুদের পরীক্ষা নেয়াই উচিত না, সেখানে এ ধরনের কঠিন প্রশ্ন কোনো অবস্থাতেই মেনে নেয়া যায় না। যারা শুধু আর্থিক কারণে সরকারি বইয়ের বাইরে শিশুদের ওপর অতিরিক্ত কঠিন বই চাপিয়ে দিয়ে তার পরীক্ষা নিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর ব্যবস্থা নেয়া উচিত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নামক এসব নির্যাতনকেন্দ্র বন্ধ করে দেয়ার কথাও ক্ষোভের সাথে বলেন অনেক অভিভাবক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ও প্রফেসর ড. মো: আবুল এহসান তৃতীয় শ্রেণীর প্রশ্নপত্র বিষয়ে নয়া দিগন্তকে বলেন, আমি সম্প্রতি উন্নত একটি দেশ ভ্রমণ করেছি। দেশটির একটি স্কুলে আমি সারা দিন কাটিয়েছি। শিশুদের ক্লাসে অংশ নিয়েছি। পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত কোনো পরীক্ষাই নেই তাদের। এ ছাড়া পড়ালেখারও নেই কোনো চাপ। কত আনন্দ আর কী শান্তিতে তাদের শিশুরা পড়ালেখা করে। আর তার বিপরীতে আমাদের দেশের শিশুদের বিশেষ করে শহরের শিশুদের পড়ালেখার কথা ভাবলে মনটা সত্যিই দুঃখে বিষিয়ে যায়। খুব কষ্ট হয় তাদের জন্য। আমরা আসলে পড়ালেখার নামে শিশুদের সুন্দর জীবনটা শেষ করে দিচ্ছি।