দৈনিক পত্রিকায় নিবন্ধ লেখার জেরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খানকে অব্যাহতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন শিক্ষক ও ছাত্র সংগঠন। একে নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত মত প্রকাশের স্বাধীনতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং ভিন্ন মতের প্রতি অসহিষ্ণুতা বলে উল্লেখ করেছেন তারা। পাশাপাশি ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়।
বাংলাদেশ শিক সমন্বয় কমিটি এক বিবৃতিতে প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছে, একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত তার একটি নিবন্ধের সূত্র ধরে উদ্ভূত প্রতিক্রিয়া ও পরিস্থিতিতে তিনি পত্রিকার নিবন্ধটি প্রত্যাহার, দৈনিক পত্রিকায় বিবৃতি প্রদানের মাধ্যমে দুঃখ প্রকাশ ও মা প্রার্থনা সত্তবেটও তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি প্রদান করার ঘটনা নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত। কেবল ভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মতের অনুসারী হওয়ায় সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূতভাবে তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। আমরা এ ধরনের নজিরবিহীন ও ন্যক্কারজনক সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
সংগঠনের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম এবং সদস্য-সচিব অধ্য মো: সেলিম ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত এ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ১৯৭৩ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশের ৫৬ ধারার ৩ উপধারা এবং প্রথম স্ট্যাটিউটের ৪৫ ধারার ৩ উপধারা অনুযায়ী নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধ এবং অদতা প্রমাণিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিককে চাকরি থেকে অব্যাহতি প্রদান করা যায়। অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান এ ধরনের কোনো অভিযোগে অভিযুক্ত নন। ১৯৭৩ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশের ৫৬ ধারার ২ উপধারা অনুযায়ী বিশ^বিদ্যালয়ের যেকোনো শিক বা কর্মকর্তা রাজনীতি করার তথা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকার রাখেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্বাধীন মত প্রকাশ ও মুক্তবুদ্ধির লালন ও চর্চার কেন্দ্র হিসেবে সুপরিচিত। তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি প্রদানের ঘটনা স্বাধীন মত প্রকাশ ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার বিশ্ববিদ্যালয়ের সুমহান ঐতিহ্যেরও পরিপন্থী। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত চাকরিবিধিরও সুস্পষ্ট ব্যত্যয় হবে বলে আমরা মনে করি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষের ঐতিহ্য, বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার নির্ধারিত আইন এবং প্রচলিত বিধিবিধানের ব্যত্যয় ঘটিয়ে মহল বিশেষের চাপে অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খানকে চাকরিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত কেবল ভিন্ন মতের প্রতি আক্রোশেরই প্রতিফলন। আমরা এ সিদ্ধান্ত বাতিল করে তাকে চাকরিতে পুনর্বহাল করার জোর দাবি জানাচ্ছি।
মত প্রকাশের দায়ে শিককে অপসারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন চরিত্রের বিরোধী : বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সভাপতি সাখাওয়াত ফাহাদ ও সাধারণ সম্পাদক রাগীব নাঈমের পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, শুধু মত প্রকাশের দায়ে একজন অধ্যাপককে পদচ্যুত করা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন চরিত্রের বিরোধী।
বিবৃতিতে তারা বলেন, অধ্যাপক মোর্শেদ হাসান যে বিষয়ে মত প্রকাশ করেছিলেন তা বিতর্কিত, তার মন্তব্য অনেকাংশে মিথ্যা বলে প্রমাণিত। কিন্তু তার জন্য তিনি মা প্রার্থনা করে বক্তব্য প্রত্যাহারও করেছিলেন বলে আমরা জানতে পেরেছি। একজন শিক রাষ্ট্রীয় বিতর্কিত একটি বিষয়ে তার মত প্রকাশ করবেন, একজন নাগরিক মত প্রকাশ করবেন, এটি তার অধিকার। একটি মতকে কেবল আরেকটি মতের দ্বারাই অবদমন করা যেতে পারে। ভিন্ন মত প্রকাশের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একজন শিকের চাকরি চলে যাওয়া, এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন চরিত্রের বিরোধী।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন চরিত্রকে পুরোপুরি নষ্ট করে দিতে অস্ত্র হিসেবে কাজ করবে উল্লেখ করে তারা অধ্যাপক মো: মোর্শেদ হাসান খানের বিরুদ্ধে দেয়া এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানান।
রাজশাহী ব্যুরো জানায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মার্কেটিং বিভাগের প্রফেসর ড. মোর্শেদ হাসান খানের চাকরিচ্যুতির তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) জাতীয়তাবাদী শিক ফোরাম। গতকাল শুক্রবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এই প্রতিবাদ জানান ফোরামের শিক্ষকগণ।
বিবৃতিতে বলা হয়, রাবি জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম গভীর উদ্বেগের সাথে ল করেছে যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের প্রফেসর ড. মোর্শেদ হাসান খানকে ভিন্নমতের কারণে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলকভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। আমরা এই অনাকাক্সিত ও ন্যক্কারজনক সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
আমরা মনে করি, গণতান্ত্রিক চর্চা ও বাক-স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ধরনের অবস্থান প্রতিষ্ঠানটির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ভূলুণ্ঠিত করেছে।
জাতীয়তাবাদী শিক ফোরাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বিধি-বহির্ভূত ও অন্যায়ভাবে গ্রহণ করা এই সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার জোর দাবি জানাচ্ছে। আমরা আশা করি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপ অবিলম্বে এই বৈষম্য ও পপাতমূলক সিদ্ধান্তটি প্রত্যাহার করে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ এবং মুক্তজ্ঞান চর্চায় ভূমিকা রাখবে।
বিবৃতিতে স্বার করেনÑ রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় জাতীয়তাবাদী শিক ফোরামের সভাপতি প্রফেসর ড. মো: হাবীবুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর ড. আরোঙ্গজীব মো: আব্দুর রাহমান এবং ফোরামের কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্যবৃন্দÑ প্রফেসর ড. শামসুল আলম সরকার, প্রফেসর ড. সি এম মোস্তফা, প্রফেসর ড. আশরাফুজ্জামান, প্রফেসর ড. এনামুল হক, প্রফেসর ড. মামুনুর রশীদ, প্রফেসর ড. এ এন এম জাহাঙ্গীর কবীর, প্রফেসর ড. ফরিদুল ইসলাম, প্রফেসর ড. আবুল হাসান, মুহাম্মদ সাজ্জাদুর রহিম, ড. তারিকুল ইসলাম, ড. আব্দুল খালেক, প্রফেসর ড. মাসুদ পারভেজ রানা, ড. শাহানা পারভীন, ড. সাইফুল ইসলাম ফারুকী, প্রফেসর ড. রেজাউল করিম-২, প্রফেসর ড. এফ নজরুল ইসলাম, প্রফেসর ড. সৈয়দ সরওয়ার জাহান, প্রফেসর ড. যাহার-ই-তাশনীম, প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান, প্রফেসর ড. ইসমাইল তারেক, প্রফেসর ড. মাহবুবার রহমান, প্রফেসর ড. জাহাঙ্গীর হোসেন, প্রফেসর ড. আতিকুল ইসলাম, প্রফেসর ড. আরিফুল হাসান, প্রফেসর ড. আবুল কালাম আজাদ, প্রফেসর ড. এম আসাদুল হক, ড. এম মোস্তফা কামাল।
স্বতন্ত্র জোটের প্রতিবাদ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসানকে শিকের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতির প্রতিবাদ জানিয়েছে স্বতন্ত্র জোট। জোটের এক বিবৃতিতে বলা হয়, প্রশাসনের মনগড়া অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের শিক অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসানকে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। স্বতন্ত্র জোট এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩ অনুসারে দুইটি কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিককে শিকতা থেকে অব্যাহতি দেয়া যেতে পারেÑ দায়িত্ব পালনে অমতা ও নৈতিক স্খলন। স্বতন্ত্র জোট বিস্ময়ের সাথে ল করেছে যে অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ, তথা ‘বঙ্গবন্ধুর অবমাননা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি’ কোনোভাবেই দায়িত্ব পালনে অমতা বা নৈতিক স্খলনের সাথে যুক্ত নয়।
কোনো বিষয়ে কেউ নিজের মতামত প্রকাশ করলে, অথবা অজ্ঞতাপ্রসূত বক্তব্য দিলে তার ওপর শারীরিক-মানসিক আক্রমণ বা তার অধিকার কেড়ে নেয়া কোনো সমাধান নয়। বরং তার বক্তব্যের ভুলগুলো ধরিয়ে দেয়াটাই কাম্য। অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতে ভুল তথ্য দিয়ে থাকেন, তবে তার প্রতিবাদ হিসেবে তার ভুলগুলো ধরিয়ে দিয়ে লেখা প্রকাশ করা যেত কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের প থেকে বিবৃতি দেয়া যেত। এ ছাড়াও, যদি বিশ্ববিদ্যালয় বা রাষ্ট্র মনে করে এতে আদালতের রায়ের অবমাননা হয়েছে, কিংবা সংবিধান লঙ্ঘিত হয়েছে তবে সংুব্ধ প হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা রাষ্ট্র অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসানের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নিতে পারতেন।
এই পথগুলো অবলম্বন না করে একটি ট্রাইব্যুনাল বসিয়ে বিচার করে তাকে অব্যাহতি দেয়া কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩-এর কোথাও এভাবে ট্রাইব্যুনাল বসানোর বিষয়ে কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। ফলে কিসের ভিত্তিতে এই ট্রাইব্যুনাল বসানো হয়েছে এবং বিচারকেরা কোন যোগ্যতার ভিত্তিতে নিযুক্ত হয়েছেন তাও পরিষ্কার নয়।
সর্বোপরি স্বতন্ত্র জোট মনে করে এই পদপে বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃজনশীলতা ও গবেষণার স্থানকে আরো সঙ্কুচিত করবে।