সারা দেশে নারী ধর্ষণ ও নিপীড়নের ঘটনায় দোষীদের বিচারের দাবিতে রাজধানীর শাহবাগে একটানা প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে আসছে সাধারণ শিক্ষার্থী ও প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলো। এতে সংহতি জানিয়ে বিশিষ্ট নাগরিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা নিয়মিত উপস্থিত এবং অনেকেই সংহতি জানাচ্ছেন। গতকাল সোমবার প্রতিবাদের অষ্টম দিনের মতো প্রতিবাদী কর্মসূচি পালন করেছেন তারা। এ সময় গান ও কবিতায় প্রতিবাদ জানান সাংস্কৃতিক কর্মীরা। কর্মসূচি থেকে বক্তারা বলেন, ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের চেয়ে দ্রুত বিচার করা জরুরি।
সোমবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী শুরু হয় প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক আয়োজন। ‘ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ’ লেখা ব্যানার নিয়ে তারা প্রতিবাদ করেন।
এ সময় সেøাগান সেøাগানে ধর্ষণের প্রতিবাদ জানান আন্দোলনকারীরা। তারা ‘ধর্ষক লীগের আস্তানা ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও’, ‘আমার মাটি আমার মা, ধর্ষকদের হবে না’, ‘আমার সোনার বাংলায়, ধর্ষকদের ঠাঁই নাই’, ‘যে রাষ্ট্র ধর্ষক পুষে, সে রাষ্ট্র ভেঙে দাও’, ‘ধর্ষকদের কারখানা, ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও’ সেøাগান দেন।
এ সময় বিক্ষোভকারীরা বলেন, দেশে ধর্ষণের ঘটনায় বিচার না হওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বা সরকারের ব্যর্থতা স্বীকার করার সৎ সাহস নেই। গত এক বছরে দেশে যত ধর্ষণ হয়েছে, সেগুলোর বিচার হয়নি। এই জনবিচ্ছিন্ন সরকার আবার প্রমাণ করল তারা বিচারহীনতার সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করে। বিচারব্যবস্থায় যে ফাঁক আছে সেটা আবার প্রমাণিত হলো।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, নারীর মুক্তি ছাড়া কখনোই মানুষ এগোতে পারে না। এ দেশে অনেক ক্ষেত্রে উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু মানুষের মগজে মূল্যবোধ ও চেতনার জায়গায় পিছিয়ে আছে।
ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক অনিক রায় বলেন, আইন করে, সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখে ধর্ষণের অপরাধ বন্ধ করা যাবে না। এর জন্য পরিবেশের পরিবর্তন করতে হবে সে উদ্যোগ সরকারের নেই। প্রশাসন দায়সারা গোছের একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি বলেন, ধর্ষণের সংজ্ঞা ও সাক্ষ্য আইনের সংস্কার করে আইন সংশোধনের দাবির কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করে ধর্ষণের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ধোঁয়াশা তৈরি করা হয়েছে। ধর্ষণের প্রতিবাদে এই আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।
গান ও কবিতায় প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান : বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর গণসঙ্গীতের মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ কর্মসূচি শুরু হয়। তারা আকাশ চক্রবর্তীর লেখা ‘চিৎকার করো মেয়ে দেখি কত দূর গলা যায়, আমাদের শুধু মোমবাতি হাতে নীরব থাকার দায়’ গানটি পরিবেশন করে। এরপর রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর লেখা ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’ শীর্ষক কবিতা আবৃত্তি করেন প্রগতি লেখক সঙ্ঘের পক্ষে মাহবুবুল হক। নজরুলগীতি ‘জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা’ দলগতভাবে পরিবেশন করেন চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সদস্যরা। এরপর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সংকোচের বিহ্বলতা’ গান পরিবেশন করেন তারা। উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী ‘সামলে রাখো হাল, এখন ঢেউ বড় উত্তাল; অজাত রাত্রি ভাসব এবার, সাক্ষী মহাকাল’ শীর্ষক গান পরিবেশন করে। গণ-অবস্থান কর্মসূচিতে সংহতি জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. সামিনা লুৎফা বলেন, ধর্ষণের ঘটনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমাজের প্রভাবশালীরা জড়িত থাকে। বিচারের দীর্ঘসূত্রতা কারণে ধর্ষণের ন্যায়বিচার পাওয়া থেকে ভিকটিমকে বঞ্চিত হতে হয়। এই সমস্যা রাজনীতি বা আইনের মধ্যে। তাই সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের চেয়ে দ্রুত বিচার করা জরুরি।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক প্রগতি বর্মণ বলেন, ধর্ষণের ঘটনায় বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে ভাঙতে হবে। যারা ধর্ষকদের পৃষ্ঠপোষক তাদেরও চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক জামশেদ আনোয়ার বলেন, ৯ দফার দাবির সমর্থনে আজকের এই সমাবেশ। সরকারের পক্ষ থেকে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বিধান রেখে আইন তৈরির কথা ঘোষণা হয়েছে; কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের বিধান কি অপরাধ কমাতে পেরেছে, পারেনি। এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। তিনি বলেন, সাক্ষ্য আইন সংস্কার করা হচ্ছে না, সিডও সনদে সরকার স্বাক্ষর করছে না। আদালতে লাখ লাখ মামলা পড়ে আছে, বিচার হচ্ছে না।