বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনে (বিআইডব্লিউটিসি) জলযান এবং আয় কমলেও বাড়ছে ব্যয়। একমাত্র আয়ের উৎস মাওয়া ও পাটুরিয়া রুটের ফেরি পারাপার খাত ছাড়া বিআইডব্লিউটিসির যাত্রী সেবা ও অন্যান্য ফেরি রুটে মোটা অঙ্কের লোকসান হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ যানবাহন পরিত্যক্ত বা বন্ধ থাকলেও বিআইডব্লিউটিসিতে জ্বালানি তেল নিয়ে দুর্নীতি হচ্ছে। করপোরেশনের কোটি কোটি টাকার জ্বালানি তেল চুরি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ দিকে নৌপরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পদ্মা সেতুতে যানবাহন চলাচল শুরু হলে বিআইডব্লিউটিসি দেউলিয়া হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ হিসেবে তারা বলছেন সংস্থাটির লাভজনক খাত হচ্ছে মাওয়া। সেতু চালু হলে আয় বন্ধ হয়ে যাবে।
করপোরেশনটির বিভিন্ন পদে কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী অভিযোগ করেছেন, ফেরি পারাপারের ব্যবস্থাপনা ও ফেরির তেল নিয়ে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য চলছে। তারা অভিযোগ করেছেন, এই বাণিজ্যের মূল কেন্দ্রে আছেন বিআইডব্লিউটিসির ফুয়েলের দায়িত্বে থাকা ও বাণিজ্য বিভাগের কর্মকর্তারা। যার ভাগ উপর মহল পর্যন্ত পৌঁছায় বলে অভিযোগ করেন তারা।
বিআইডব্লিউটিসি সূত্র মতে, ২০০৬-০৭ অর্থবছরে জ্বালানি তেল বাবদ খরচ হয়েছে ৪০ কোটি টাকা। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় জ্বালানি তেল খরচ বাবদ খরচ হয়েছে ৪৫ কোটি টাকা। এ সময় করপোরেশনটির জলযানের সংখ্যা ছিল ১৮৩টি। কিন্তু তার পরের অর্থবছরে ২০০৯-১০ অর্থবছরে জ্বালানি তেল খরচ বেড়ে ৬৫ কোটি টাকা এসে দাঁড়ায়।
সূত্র জানায়, বিআইডব্লিউটিসির বর্তমানে সচল জলযানের সংখ্যা ১০৯টি। আর পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে ৩৭টি। অথচ ২০১৮ সালে জ্বালানি তেল বাবদ খরচ হয়েছে ১৩০ কোটি টাকা। তবে করোনার কারণে চলাচল বন্ধ থাকায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে জ্বালানি তেল বাবদ খরচ হয়েছে ১২১ কোটি টাকা।
করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, বিআইডব্লিউটিসির মাওয়া ও পাটুরিয়া রুটের ফেরি পারাপার খাত ছাড়া যাত্রী সেবা ও অন্যান্য ফেরি রুটে মোটা অঙ্কের লোকশান হচ্ছে। মাওয়া ফেরি রুটে ২০১৯-২০ অর্থবছরে আয় ১০৫ কোটি টাকা এবং পাটুরিয়া রুটে হয়েছে ২১০ কোটি টাকা।
বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান সৈয়দ তাজুল উসলাম বলেন, পদ্মা সেতুতে যান চলাচল শুরু হলেও এর প্রভাব যাতে না পড়ে সে জন্য বিকল্প লাভজনক রুট খোঁজা হচ্ছে। এছাড়া তেল চুরির যে অভিযোগ করা হচ্ছে সে বিষয় অনেক তদন্ত হয়েছে।
নদী, নৌখাত ও পরিবহনবিষয়ক লেখক-গবেষক সাংবাদিক আশীষ কুমার দে নয়া দিগন্তকে বলেন, নৌ পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন করা সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার। এ বিষয়ে সরকারের শীর্ষ মহল বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নিজে এবং নৌ প্রতিমন্ত্রীও আন্তরিক। বিভিন্ন খাতে পর্যাপ্ত অর্থবরাদ্দও দেয়া হচ্ছে। গ্রহণ করা হচ্ছে বড় বড় প্রকল্প। কিন্তু আশানুরূপ অগ্রগতি হচ্ছে না। বিআইডব্লিউটিসি তেমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে খরচ বাড়লেও উন্নয়ন-চিত্র হতাশাব্যঞ্জক।
মাঠপর্যায়ের অর্থাৎ নৌ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বিভিন্ন সংস্থা ও দফতরের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করে আশীষ কুমার দে বলেন, বিআইডব্লিউটিসি একটি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। মাওয়া-বাংলাবাজার ও পাটুরিয়া-দৌলতদিয়াসহ গুরুত্বপূর্ণ সব নৌপথে তাদের ফেরি সার্ভিস রয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা-বরিশাল-খুলনা নৌপথে স্টিমার এবং উপকূলীয় এলাকায় বেশকিছু যাত্রীবাহী জাহাজ পরিচালনা করে তারা। তবে দু-একটি ছাড়া সব নৌপথেই তাদের লোকসান গুনতে হয়। অথচ জ্বালানি তেল ও জনবলসহ অন্যান্য খরচ বেড়েই চলেছে। সংস্থাটিকে লাভজনক করতে হলে মাঠপর্যায়ে সব অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি দূর করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের যুগ্ম মহাসচিব এবং নদী ও নৌপথ সংরক্ষণ বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি মিহির বিশ্বাস বলেন, বিআইডব্লিউটিসি টিকে আছে মাওয়া ও পাটুরিয়ার ফেরির আয়ের উপরে। কিন্তু পদ্মা সেতুতে যানবাহন চলাচল শুরু করলে মাওয়ার আয় বন্ধ হয়ে যাবে। পাটুরিয়া ফেরি রুটের আয় ৬০ শতাংশ কমে যাবে। আর মাওয়া এবং পাটুরিয়া রুটের মতো বিকল্প লাভজনক রুট দেশের কোথাও নেই। তাই পদ্মা সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল শুরুর পরে করপোরেশনটি দেউলিয়া হতে মাত্র তিন বছর সময় লাগবে বলে তিনি মনে করেন।
জানা গেছে, দেশ স্বাধীনের পরে ১৯৭২ সালে পাকিস্তানি নাগরিকদের মালিকাধীন পরিত্যক্ত কয়েকটি কোম্পানির ও পাকিস্তান সরকারের রেখে যাওয়া ৬০৮টি জলযান নিয়ে বিআইডব্লিউটিসি গঠন করা হয়। অভ্যন্তীণ ও উপকূলীয় নৌপথে নিরাপদ ও সহজে যাতায়াতের জন্য ১৯৮০ সালে যাত্রীবাহীসহ ৬১১টি বাণিজ্যিক ও সহায়ক জাহাজ যুক্ত হয়ে ছিল। এর পরবর্তিতে বেশ কিছু জলযান সংগ্রহ করা হলেও পুরনো ও জরাজীর্ণ জাহাজ বিক্রি করা হয়। যার ফলে করপোরেশনটির জলযানের সংখ্যা কমতে থাকে।





