একের পর এক অজানা আগুনে নিঃস্ব হচ্ছে বস্তির বাসিন্দারা। চোখের পলকে পুড়ে ছাই হচ্ছে তাদের তিল তিল করে গড়া স্বপ্ন। শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে পথে বসছেন অসহায় মানুষগুলো।
নিঃস্ব মানুষগুলো জীবিকা আর ঘুরে দাঁড়ানোর তাগিদে কিছু দিন পরই ভুলে যায় আগুনের কথা। কিন্তু প্রতিবারই প্রশ্ন ওঠে কারা লাগাচ্ছে বা কিভাবে লাগছে এই আগুন? এগুলো কি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি বস্তি খালি করতে প্রভাবশালী মহলের এই নাশকতা? প্রশ্ন উঠলেও এর সঠিক উত্তর মিলছে না কখনো। অগ্নিনির্বাপণকারী সংস্থা ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে আগুন লাগার কারণ জানতে গঠন করে তদন্ত কমিটি। কিন্তু প্রায় প্রতিটি ঘটনারই দায় চাপানো হচ্ছে অবৈধ বিদ্যুৎ আর গ্যাস সংযোগের ওপর। গত সোমবার মহাখালীর সাততলা বস্তিতে লাগা আগুনের পরও সেই অবৈধ বিদ্যুৎ আর গ্যাস সংযোগকে দায়ী করা হয়। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে এসব অবৈধ সংযোগ দিচ্ছে কারা? ঢাকা ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) বলছে, অবৈধ সংযোগ স্থাপনের জন্য একটি চক্র গড়ে উঠেছে। যারা বিদ্যুৎ কোম্পানির নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
আশ্রয়স্থল হারানো বস্তিবাসীর অভিযোগ, জায়গা খালি করতে পরিকল্পিতভাবে বস্তিতে আগুন দেয়া হতে পারে। এর পেছনে যারা জড়িত তাদের নাম তদন্তেও বের হবে না বলে আক্ষেপ করেন তারা। তবে বস্তি খালি করার জন্য অগ্নিকাে প্রভাবশালী মহলেরও হাত থাকতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ফায়ার সার্ভিসের সাবেক পরিচালক মেজর (অব:) শাকিল নেওয়াজ বলেন, বস্তিতে অনেক রাজনীতি থাকে, অনেক কোন্দল থাকে। প্রভাবশালীরা অনেক সময় জায়গা খালি করতে আগুন লাগিয়ে দিতে পারে। যদিও অপরিকল্পিত, ঘিঞ্জি আবাসনে আগুন লাগার জন্য ঘুরেফিরে দায়ী করা হচ্ছে, অবৈধ বিদ্যুৎ এবং গ্যাস সংযোগকেই।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) আবু নাঈম মো: শফিউল্লাহ গণমাধ্যমকে বলেন, নানা কারণেই বস্তিতে আগুন লাগে। এর আগে তদন্তে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট ও গ্যাসের পাইপের লিকেজ থেকে আগুনের কারণ উঠে এসেছে। তবে দুই পক্ষের শত্রুতা ও দখল-পুনর্দখলের বিষয়টিও উড়িয়ে দেয়া যায় না। কিছু ক্ষেত্রে নাশকতার বিষয়টিও থাকতে পারে। ফায়ার সার্ভিসের হিসাব মতে, শুধু ২০২০ সালেই সারা দেশে ২১ হাজার ৭৩টি অগ্নিকা ঘটেছে। ফায়ার সার্ভিসের আরেকটি হিসাব বলছে, শুধু রাজধানীতেই গত দেড় বছরে প্রায় অর্ধশত বস্তিতে আগুন লেগেছে। এ অগ্নিকাে র পেছনে আসলে কী?
কিছু দিন পর পর বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাে র ঘটনায় ভুক্তভোগীসহ সচেতন মহলের প্রশ্ন, এগুলো কি নিছক দুর্ঘটনা নাকি নাশকতা? এ অগ্নিকাে র পেছনে আসলে কী? বারবার স্বপ্ন পুড়ে আশ্রয়স্থল হারানো বস্তিবাসীর অভিযোগ, এসব রহস্যজনক অগ্নিকাে র নেপথ্যে রয়েছে দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি ও উচ্ছেদের কৌশল। কিছু দিন পরই প্রশাসন চালায় উচ্ছেদ অভিযান। প্রতি বছরই এসব অপতৎপরতার বলি হচ্ছেন তারা। কিন্তু তাদের পুনর্বাসনে এগিয়ে আসছে না সরকার।
স্থানীয়রা জানান, প্রত্যেকটি আগুন লাগার পর নতুন করে নির্মাণ করা ঘর কমে এবং বড় বস্তিগুলোর আকার ছোট হয়ে আসে। ফলে আগুনে হতদরিদ্র মানুষের জীবনে মহাদুর্যোগ নেমে আসে। ঘটে প্রাণহানিও। ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগানোর অভিযোগ বারবার উঠলেও তদন্তে প্রমাণ মেলে না। অবৈধ বিদ্যুৎ কিংবা গ্যাসসংযোগ থেকে সর্বশেষ মহাখালীর সাততলা বস্তিতে ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা ফায়ার সার্ভিসের।
সচেতন মহলের প্রশ্নÑ রাজধানীসহ সারা দেশের বস্তিগুলোতে কারা ওইসব অবৈধ সংযোগ দিয়ে মাসোয়ারা আদায় করে, সেটি কি কখনো খতিয়ে দেখেছে প্রশাসন। এ ছাড়া দরিদ্র বস্তিবাসীকে আগুন নেভানোর ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দেয়া হয় না।
সাত মাসের মাথায় মহাখালীর সাততলা বস্তিতে আগুন লাগে সোমবার ভোররাত ৪টার দিকে। ফায়ার সার্ভিসের ১৮টি ইউনিট চেষ্টা চালিয়ে সকাল ৭টার দিকে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুনে কেউ মারা না গেলেও পুড়ে ছাই হয়ে গেছে পাঁচ শতাধিক ঘর। সাততলা বস্তির আরো বহু মানুষ তিন ঘণ্টার ব্যবধানে পথে বসে গেছেন। আগুন থেকে বাঁচতে যে যেভাবে পেরেছেন ঘর ছেড়ে নিরাপদ দূরত্বে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। কয়েক গজ দূর থেকে ঘর পুড়তে দেখে চলছিল শুধু আহাজারি। তবে, স্থানীয়দের কেউ কেউ ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা দাবি করেছেন, অবৈধভাবে সংযোগ দেয়া গ্যাসের চুলা কিংবা বিদ্যুৎ লাইন থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে।
এ দিকে অগ্নিকাে র কারণ খতিয়ে দেখতে যথারীতি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস। ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক নূর হাসান আহম্মেদকে সভাপতি করে চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানে আগুনের প্রকৃত কারণ বেরিয়ে আসবে বলে মনে করেন ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসেন।
আগুনে নিঃস্ব মানুষের আহাজারি : দিনের পর দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রমের টাকায় সাজানো ঘর হারিয়ে রফিকুল, শহিদুল, আমেনা, নাসরিনসহ পুড়ে যাওয়া বস্তির মানুষগুলো এখন নির্বাক। কোথায় থাকবেন, সন্তানদের মুখে কিভাবে খাবার তুলে দেবেন, এমন সব চিন্তা তাদের ঘিরে ধরেছে। কান্নায় ভেঙে পড়ে রফিকুল বলেন, আমার ঘরের একটা জিনিসও নিতে পারিনি। গায়ে একটা গেঞ্জি ছিল। সে অবস্থায় বেরিয়ে গেছি। আমি রিকশা চালাই। রিকশা চালিয়ে যা জিনিস কিনছিলাম, সব পুড়ে গেছে। এমনভাবে পুড়েছে নিজের ঘরটাও চেনা যাচ্ছে না।
শহিদুল বলেন, আগুন নেভানোর পর এসে দেখেন, সব পুড়ে গেছে। ঘরে ছিল স্ত্রীর কানের দুল, হাতের বালা। পোড়া ঘরের জিনিসপত্রের ভেতর সেগুলো খুঁজছিলেন। পোশাককর্মী নাসরিন জানান, আগুনে তার কষ্ট করে জমানো ১৫ হাজার টাকা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আমেনারও সব পুড়ে ছাই হয়েছে বলে জানান। অসহায় এই নারী দু’জন বলেন, সব পুড়ে গেছে। শুধু গায়ের কাপড়টুকু পোড়া বাকি ছিল।
এ দিকে আগুনে নিঃস্ব বস্তির শত শত মানুষের ঠাঁই হয়েছে বস্তির পাশে খোলা স্থানে ও একটি স্কুলে। গতকাল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম আগুনে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের ঘর করার জন্য টিন ও পাঁচ হাজার করে টাকা দেয়ার আশ্বাস দেন।





