করোনাকালীন বাংলাদেশ রেলওয়ে বিভাগে স্বাস্থ্য সুরক্ষা বা করোনা নিরাপত্তা সামগ্রী কেনাকাটা নিয়ে দুর্নীতির যে অভিযোগ উঠেছিল, তার সত্যতা পায়নি তদন্ত কমিটি। তবে সতর্ক করা হয়েছে ক্রয় কমিটিকে। একই সাথে অভিযোগ ওঠার কারণে ২১ কর্মকর্তাকে ক্রয় কমিটি থেকেও অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে রেলপথ মন্ত্রী মো: নূরুল ইসলাম সুজন সাংবাদিকদের বলেছেন, করোনাকালীন মালবাহী ট্রেন চালিয়ে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা সচল রাখাটাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ক্রয়সংক্রান্ত যে নীতিমালা মানতে হয় তাতে অনেক সময় লাগে। করোনার মহামারীর সময় অনেক ক্ষেত্রে তা মানা সম্ভব হয়নি। কিন্তু নীতিমালা মানার চেয়ে মানুষের জীবন রক্ষার দিকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে সবচেয়ে বেশি।
ক্রয়সংক্রান্ত অনিয়মের বিষয় জানতে চাইলে তিনি আরো বলেন, করোনার সময় জীবন রক্ষকারী সামগ্রী পাওয়াটাই ছিল দুষ্কর। মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজারসহ করোনা প্রতিরোধের সামগ্রীর দাম ছিল আকাশ ছোঁয়া। সে ক্ষেত্রে করোনা নিরাপত্তা সামগ্রী কেনাকাটার অনিয়মের বিষয় তদন্ত কমিটি যে প্রতিবেদন দিয়েছে তাতে কাউকে অভিযুক্ত করা হয়নি। যেহেতু অভিযোগ এসেছে তাই সতর্ক করা হয়েছে। একই সাথে মন্ত্রণালয় তাদেরকে ক্রয় কমিটি থেকেও অব্যাহতি দিয়েছে। দুদকের তদন্ত প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, তাদের মতো তারা তদন্ত করতে পারে। এ ক্ষেত্রে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কোনো আপত্তি নেই।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, করোনাকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা বা করোনা নিরাপত্তা সামগ্রী কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগের বিষয় গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের তদন্তে ২১ জনের বিরুদ্ধে কেনাকাটা নিয়ে কোনো দুর্নীতির প্রমাণ পায়নি। রেলওয়ে বিভাগ ২১ জনকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি প্রদান করেছে।
রেলওয়ে অধিদফতর সূত্র জানায়, কোভিড-১৯ চলমান থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভিন্ন দফতর কর্তৃক যেসব সুরক্ষা সামগ্রী ক্রয় করে, তা নিয়ে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে বিষয়টি তদন্তের জন্য তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদনে কর্মকর্তাদের কেনাকাটা নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়। তবে প্রতিবেদনে কর্মকর্তাদের দায়িত্বে অবহেলার জন্য সতর্ক করার সুপারিশ করা হয়।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, বৈশি^ক মহামারী করোনার প্রাদুর্ভাব একটি অনাকাক্সিক্ষত এবং অপ্রত্যাশিত মরণব্যাধি হিসেবে আবির্ভূত হয়। বিশে^র অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও সাধারণ ছুটি, লকডাউনসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গৃহীত হয়। সব ধরনের যানবাহন চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় (জরুরি সেবা ব্যতীত)। এই অবস্থায় প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশ রেলওয়েতে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ করা হলেও দেশব্যাপী পণ্য সরবরাহ ও পণ্যের বাজার মূল্য স্থিতিশীল রাখতে কনটেইনার, পার্সেল ট্রেন, ক্যাটল ট্রেন, ম্যাংগো ট্রেন, জ¦ালানি তেলসহ সব ধরনের মালবাহী ট্রেন চালানো হয়। তদুপরি অল্প কিছুদিন পরেই কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনা করে বাংলাদেশ রেলযাত্রী সাধারণের জরুরি চলাচল নিশ্চিত করে।
এ অবস্থায় মরণব্যাধি করোনা মোকাবেলায় জরুরি ভিত্তিতে বাংলাদেশ রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট সব দফতর হতে চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক, চট্টগ্রামের দফতর থেকে সুরক্ষা সামগ্রী সংগ্রহের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। সুরক্ষা সামগ্রী ক্রয়ের ক্ষেত্রে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন-২০০৬ ও পিপিআর বিধিমালা-২০০৮ যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়। এ ক্ষেত্রে পিপিআরের কোনো বিধির ব্যত্যয় ঘটানো হয়নি।
সুরক্ষা সামগ্রী কেনাকাটা নিয়ে ওঠা অনিয়মের অভিযোগটি ভিত্তিহীন মনে করছেন রেলওয়ের সংশ্লিষ্টরা। তারা এটাকে ষড়যন্ত্র মনে করছেন। এ ব্যাপারে রেলওয়ের পরিচালক (ইনভেনট্রি কন্ট্রোল) আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, করোনাকালীন মহামারীতে তখনকার প্রেক্ষাপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। মানুষ জীবনের ভয়ে ঘর থেকে বের হয়নি। এই পরিস্থিতে রেলওয়ে বিভাগ ছিল তৎপর। নিরাপত্তা সামগ্রী কেনাকাটা নিয়ে যে অভিযোগ তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কেননা তখন করোনা নিরাপত্তা সামগ্রীর সঙ্কট ছিল। দামও ছিল নাগালের বাইরে। এই পরিস্থতির মধ্যেও ক্রয় কমিটি যাচাই বাছাই এবং যতটা সম্ভব নিয়ম মেনেই সারা দেশে রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য দেড় কোটি টাকার নিরাপত্তা সামগ্রী ক্রয় করা হয়েছে। তখনকার পরিস্থিতিতে করোনা সামগ্রীর দামের সঙ্গে এখনকার দাম তুলনা করাটা যুক্তিসঙ্গত নয়। কোনো ক্রমেই দাম বেশি বা কেনা কাটায় অনিয়ম হয়েছে বলার সুযোগ নেই।
সূত্র জানায়, কেনাকাটা নিয়ে অনিয়মের বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে অধস্তন কর্মকর্তার অনুমোদনের এখতিয়ারভুক্ত বাজার দর অধস্তন কর্মকর্তা কর্তৃক সুপারিশে অনুমোদন করা হয়েছে। কিন্তু আর্থিক বিষয়ক ক্ষমতা অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে এ অনুমোদন দেয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ক্ষমতাবহির্ভূত কোনো অনুমোদন দেয়া হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, মূলত করোনা মহামারীর ভিতর সুরক্ষা সামগ্রীর আপৎকালীন কেনাকাটার জন্য চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় বিশেষ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থায় আগত ওই সব ক্রয় প্রস্তাবের নথি তাৎক্ষণিকভাবে অনুমোদন না দিয়ে চট্টগ্রামে ফেরৎ পাঠানো হলে সুরক্ষা সামগ্রী ক্রয় ব্যাহত হতো এবং রেলকর্মচারী ও যাত্রী সাধারণের জীবন হুমকির মধ্যে পড়তো ভেবেই দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসেবে নথিগুলোর ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। অন্য কোনো উদ্দেশ্যে করা হয়নি।
কর্মকর্তা আরো বলেন, করোনা সুরক্ষা সামগ্রীগুলোর ক্রয়ের সব কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে চট্টগ্রামস্থ প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে। অতিরিক্ত মহাপরিচালক (আরএস) পিপিআর-২০০৮ এর প্রদত্ত ক্ষমতা বলে প্রস্তাবিত ক্রয়কার্যের ক্রয় পরিকল্পনা (এপিপি) অনুমোদন দিয়েছেন এবং এর অংশ হিসেবে বাজার দর কমিটির প্রস্তাবিত ও প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক কর্তৃক সুপারিশকৃত বাজার দর অনুমোদন দিয়েছেন মাত্র। তাছাড়া ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন ক্রয় কাজের বাধ্যবাধকতা প্রদান করে না। দরপত্র আহ্বান থেকে শুরু করে ঠিকাদারকে অনুমোদন দেয়া বা মালামাল সংগ্রহ করা পর্যন্ত কোনো কার্যক্রমে অংশ গ্রহণ করেননি।
কর্মকর্তা বলেন, করোনাকালীন দেশব্যাপী করোনা মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সামগ্রীর মাত্রাতিরিক্ত চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়া ও সরবরাহ সীমিত থাকায় মালামালের মূল্য অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পায়। সুষ্ঠু ও নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ট্রেন চলাচলের স্বার্থে জরুরিভাবে সুরক্ষা সামগ্রী ক্রয় করতে হয়। এ ক্ষেত্রে সুরক্ষা সামগ্রীর মূল্য স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে অতিরিক্ত ঊর্ধ্বমুখী বলে মনে হলেও জরুরি প্রয়োজন বিবেচনায় তা সংগ্রহ করার কোনো বিকল্প ছিল না। করোনাকালে বাংলাদেশ রেলওয়ের সুরক্ষা কার্যক্রম ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। করোনাকালীন দুর্যোগ মুহূর্তে উল্লিখিত সুরক্ষা সামগ্রী ক্রয় করা সম্ভব হয়েছিল বলেই বাংলাদেশ রেলওয়ে লকডাউনের মধ্যেও যাত্রী সাধারণ ও রেলকর্মীদের জীবন সুরক্ষা রেখে যাত্রীবাহী ও মালবাহী ট্রেন পরিচালনা করতে পেরেছে।