কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও সাংগঠনিক টিমের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগের কারণে স্বেচ্ছাসেবক দলে গতিহীন অবস্থা বিরাজ করছে। আজ থেকে প্রায় পাঁচ বছর আগে ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর সংগঠনটির সাত সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় আংশিক কমিটি গঠন করা হয়। গঠনতন্ত্র মোতাবেক যার মেয়াদ দুই বছর। কিন্তু তিন বছর আগে মেয়াদ ফুরিয়ে গেলেও পূর্ণাঙ্গ বা নতুন কমিটি আলোর মুখ দেখেনি। সাত সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণার চার বছর পর ২০২০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ১৪৯ সদস্যবিশিষ্ট আংশিক কমিটি গঠন করা হয়। উপদেষ্টাসহ মোট ১৮৬ জন নেতার মধ্যে বিভিন্ন কর্মসূচিতে ঘুরে ফিরে হাতেগোনা মাত্র ২০ থেকে ২৫ জনকে দেখা যায়। তবে কমিটিতে পদ না পেলেও দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় পদপ্রত্যাশীরাই স্বেচ্ছাসেবক দলের প্রতিটি কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন।
জানা যায়, সারা দেশে তৃণমূল পর্যায়ে সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি গঠনের দ্বারা সংগঠনকে গতিশীল করার জন্য ২৮ সেপ্টেম্বর ১১টি সাংগঠনিক টিম গঠন করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সে সময় সাংগঠনিক টিমকে ছয় মাস সময় বেঁধে দেন তিনি। কিন্তু এক বছর অতিবাহিত হলেও সংগঠন গোছানোর কাজ শেষ করতে পারেনি স্বেচ্ছাসেবক দল। এর পেছনে করোনাকালীন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকার অজুহাত দেখিয়ে আবারো সময় নেন টিম প্রধানেরা। ফলে এক মাস সময় বৃদ্ধির পর তিন মাস পার হলেও এখনো তৃণমূল পুনর্গঠন সম্পন্ন হয়নি। এ ক্ষেত্রে টিমের সদস্যদের বিরুদ্ধে কমিটি গঠনের আর্থিক লেনদেন এবং কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগও ওঠে। মাঠ পর্যায়ের বাদ পড়া ত্যাগী নেতারা মনে করেন সংগঠনের শীর্ষ দুই নেতা বর্তমান কমিটির মেয়াদ আরো প্রলম্বিত করার জন্য ধীরে চলো নীতি গ্রহণ করেছেন। এতে সংগঠন গোছানোর কাজ অসমাপ্তই থেকে যাচ্ছে। কেননা টিম নেতারা তৃণমূলের কমিটির খসড়া দফতরে জমা দিলেও সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক তা নিজের মতো দেখে কমিটি অনুমোদন দেন। এ নিয়ে অনেকেই ক্ষুব্ধ, এমনকি একাধিক উপজেলা কমিটি ঘোষণার পরও পছন্দের লোক না থাকায় বহু কমিটি স্থগিত করার ঘটনার ঘটেছে। ফলে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে দিয়ে অবিলম্বে স্বেচ্ছসেবক দলের নয়া কমিটি গঠনের দাবি সংগঠনের তৃণমূল এবং পদবঞ্চিত নেতাকর্মীদের।
এ দিকে অনেক ত্যাগী ও জেল-জুলুমের শিকার, পদবঞ্চিত এমনকি যারা সোহেল-সপু কমিটিতে ছিল তাদেরকে আংশিক কমিটিতে জায়গা না দিয়ে শীর্ষ দুই নেতা তাদের অনুসারী যারা কোনো ইউনিট পর্যায়ের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিল না তাদের বন্ধু ও স্বজন পরিচয়ে কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে স্থান দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পদবঞ্চিতরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ত্যাগী ও পরীক্ষিত কর্মীদের বাদ দিয়ে যাদেরকে পদায়ন করা হয়েছে তারা মিছিল মিটিং দূরে থাক কারো মৃত্যুর পর পার্টি অফিসে দোয়া মাহফিলেও অংশগ্রহণ করে না। অথচ পদবঞ্চিতরা এখনো একটি পদের আশায় দলীয় প্রায় সব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। তারা দীর্ঘদিন দলের শীর্ষ নেতাদের কাছে কাকুতি মিনতি করেও বর্তমান আংশিক কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার বিষয়ে আশ্বাস পাননি। তবুও কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার মুলা ঝুলিয়ে নিজেদের মেয়াদ কৌশলে প্রলম্বিত করতে চাইছেন শীর্ষ দুই নেতা। তবে আগামীতে আন্দোলন সংগ্রাম জোরদার করার লক্ষ্যে তৃণমূল নেতাকর্মীদের দাবি অবিলম্বে স্বেচ্ছাসেবক দলের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন কমিটি গঠন করা। তাহলে পদবঞ্চিত ত্যাগী নেতাকর্মীরা পদায়িত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। বর্তমান আংশিক কমিটির নেতাদের দিয়ে আগামীতে আন্দোলন ত্বরান্বিত করা সম্ভব হবে না বলে তারা মনে করেন। স্বেচ্ছাসেবক দলের সহ-দফতর সম্পাদক মো: নাজমুল হাসান বলেন, সারা দেশে ৮১টি জেলা শাখার মধ্যে ১০ জেলায় নতুনভাবে কমিটি হয়েছে। আর ৯৪৯টি থানা বা পৌর শাখার মধ্যে প্রায় ৭০০টি পুনর্গঠন সম্পন্ন হয়েছে।
জানা যায়, স্বেচ্ছাসেবক দলের পূর্ণাঙ্গ বা আহ্বায়ক কমিটি হলে শীর্ষ দুই পদের যেকোনো একটির জন্য চেষ্টা চালাচ্ছেন অনেকেই। এ ক্ষেত্রে বর্তমান সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক না থাকার সম্ভাবনা বেশি। কেননা বিএনপির হাইকমান্ড নতুন নেতৃত্ব বিকাশে বদ্ধপরিকর। শীর্ষপদে সম্ভাব্য আলোচনায় আছেন- সিনিয়র সহসভাপতি মো: গোলাম সারোয়ার, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ, সহ-সভাপতি আনু মোহাম্মদ শামীম, ছাত্রদলের সাবেক সেক্রেটারি আমিরুল ইসলাম খান আলিম, সাবেক সহ-সভাপতি বজলুল করিম চৌধুরী আবেদ, স্বেচ্ছাসেবক দলের বর্তমান সহ-সাধারণ সম্পাদক সর্দার মো: নূরুজ্জামান, সহ-দফতর সম্পাদক মো: নাজমুল হাসান, সাংগঠনিক সম্পাদক ইয়াসিন আলী, ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি ফখরুল ইসলাম রবিন। এর বাইরে নতুন হিসেবে ছাত্রদলের সাবেক সেক্রেটারি হাবিবুর রশিদ হাবিব ও সাবেক সভাপতি রাজীব আহসানও আলোচনায় আছেন।
এ বিষয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সেক্রেটারি মীর সরফত আলী সপু নয়া দিগন্তকে বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে দল চলে না। স্বেচ্ছাসেবক দলের বর্তমান মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে দিয়ে ত্যাগী, পদবঞ্চিত এবং হামলা-মামলার নেতাদের সমন্বয়ে দ্রুত নতুন কমিটি করা উচিত। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, সে¦চ্ছাসেবক দলের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার আমাদের দলের চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমাদের ডেকে পরামর্শ নিতেন। কিন্তু বর্তমানে আমি স্বেচ্ছাসেবকবিষয়ক সম্পাদক হয়েও কোনো নেতা পরামর্শ করেন না।