সমগ্র বিশ্বেই এখন সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শক্তিশালী হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ফেসবুক ও ইউটিউব এবং মাল্টিমিডিয়া বাংলাদেশের মূলধারার গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার যুগে নিত্যনতুন আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে মাল্টিমিডিয়া জনপ্রিয় হচ্ছে। অবশ্য সোশ্যাল মিডিয়া বলতে ‘সিটিজেন জার্নালিজম’কেও বুঝানো হয়ে থাকে। মূলধারার গণমাধ্যম অনেক সময় কোনো সংবাদ বা ঘটনাকে এড়িয়ে গেলেও ফেসবুক বা ইউটিউবে আলোচনার কারণে বিকল্প সোর্স হিসেবে সেটি পরবর্তীতে গণমাধ্যমে স্থান পায়।
বাংলাদেশের মূলধারার গণমাধ্যমে যারা কাজ করেন তারা সরকারের দিক থেকে চাপকে একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন। ফলে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মাল্টিমিডিয়া। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিবাদ-আন্দোলন সংগঠিত করতেও এটি অন্যতম প্ল্যাটফর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক সময় ফেসবুক, ইউটিউব বা টুইটারের মতো মাধ্যমগুলোই হয়ে উঠছে খবর প্রচার ও প্রকাশের উৎস। ইদানীং সোশ্যাল মিডিয়ার শক্তিমত্তা ও প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা লক্ষণীয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় তথ্য সরবরাহের জন্য সাধারণ মানুষের হাতে হাতে স্মার্টফোন রয়েছে। যেখানে কেউ একটি তথ্য দিলে মুহূর্তেই তা শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে ভাইরাল হচ্ছে।
তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সামাজিক মাধ্যম বিকল্প মাধ্যম হিসেবেই বিকশিত হচ্ছে নাকি গণমাধ্যমের সমান্তরালে দৌড়াচ্ছে? এমন প্রশ্নের জবাবে বিশ্লেষকরা বলছেন- ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার, ইনস্টাগ্রামসহ কয়েকটি মাধ্যম সমগ্র বিশ্বে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হিসেবে ব্যাপক পরিচিত। সরকারি কিংবা বিভিন্ন পক্ষের চাপের কারণে মূলধারার গণমাধ্যম যখন কোনো সংবাদ পরিবেশন করতে পারে না তখন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে ওঠে প্রধান বাহন। অবশ্য কখনো কখনো ফেসবুকে শেয়ার করা খবরের কোনো ভিত্তি না থাকায় তা নিয়েও বিতর্ক হয়। এতে করে সামাজিক মাধ্যমের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে ফেসবুক একটি সামাজিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষত সাইবার জগতে ফেসবুক যেমন ভালো কাজের জন্য ব্যবহার হচ্ছে, তেমনই এটি অপরাধীদের অপরাধ সংঘটনের উৎসও বটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা মাল্টিমিডিয়া কখনো কখনো মূলধারার গণমাধ্যমের চেয়েও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করছে। কেননা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনেক সময় সরকার চাইলেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। যার কয়েকটি জ্বলন্ত উদাহরণ হলো- গত বছর ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের একলাশপুরে গৃহবধূকে ধর্ষণ চেষ্টা ও নির্যাতনের ঘটনা। যা ঘটে যাওয়ার এক মাসের মাথায় ফেসবুকে ভাইরাল হয়। এটিকে কেন্দ্র করে তোলপাড় শুরু হয়, বিক্ষোভ ও প্রতিবাদে নামে দেশের বিভিন্ন স্থানের মানুষ। এরপরই বিষয়টি দেশের সব গণমাধ্যমসহ প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্তাদের নজরে আসে। প্রবল প্রতিবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে ধর্ষণের আইনে সংশোধনী আনে সরকার। এ ছাড়া ২০১৬ সালে কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে কলেজছাত্রী তনু হত্যাকাণ্ড ও ২০১৫ সালে সিলেটে শিশু সামিউল আলম রাজন হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছিল। কোনোটিই মূলধারার গণমাধ্যমে আগে প্রকাশিত হয়নি। ফেসবুকে ব্যাপক লেখালেখির কারণে শেষ পর্যন্ত মূলধারার গণমাধ্যম সেটিকে তাদের এজেন্ডায় নিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। দেশে ঘটে যাওয়া এমন অনেক ঘটনাই রয়েছে যা গণমাধ্যমের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জনগণের সামনে তুলে ধরেছে।
বর্তমানে পরিস্থিতি এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, মানুষ এখন গণমাধ্যমের চেয়েও সোশ্যাল মিডিয়ার ওপরই বেশি ঝুঁকছে। আগে সময় পেলেই মানুষ পত্রিকার পাতায় চোখ বুলাতো, টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখত কিংবা নির্দিষ্ট সময়ে রেডিওর খবরের জন্য অপেক্ষা করত। কিন্তু সেই পরিস্থিতি আর নেই। বেশির ভাগ মানুষ এখন মাল্টিমিডিয়া অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন। ফলে মানুষের জানার মাধ্যমও বদলাচ্ছে। অধিকাংশ মানুষ সামাজিক মাধ্যম হিসেবে ফেসবুক ও ইউটিউব বেশি ব্যবহার করেন। ফেসবুক এখন তথ্য পাওয়ার অন্যতম উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোথাও কোনো ঘটনা ঘটলে তা ফেসবুকে শেয়ারের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ইউটিউবের মতোই ফেসবুকে রয়েছে ভিডিও লাইভ ও আলাদা ভিডিও শেয়ারিংয়ের অপশন। ফলে সব টেলিভিশন চ্যানেল, রেডিও স্টেশন তাদের খবর কিংবা গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান ফেসবুক ও ইউটিউব চ্যানেলে লাইভ প্রচার করে থাকে। মূলধারার দৈনিক পত্রিকাগুলোও অনলাইনে (ফেসবুক ও ইউটিউব) সংবাদ আপডেট করছে। প্রায় সব গণমাধ্যমই এখন ফেসবুক পেইজ ও ইউটিউব চ্যানেল খুলেছে। ফলে এক মোবাইল ফোনেই মানুষ সবকিছুই দ্রুত পেয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ মূলধারার গণমাধ্যমে মাল্টিমিডিয়ার ব্যবহার ও প্রভাব বাড়ছে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, গণমাধ্যম আর সামাজিক মাধ্যম দুইটা দুই জিনিস। গণমাধ্যম হচ্ছে গণমানুষের মাধ্যম। আর সামাজিক মাধ্যম হলো ব্যক্তি টু ব্যক্তি। এ ক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যম থেকে তথ্য নিয়ে গণমাধ্যম উপকৃত হচ্ছে। ফলে গণমাধ্যমের কাজ ও গণমাধ্যমের চাহিদা কখনোই কমবে না। কেননা সামাজিক মাধ্যম অনেক সময় ভুল বা অপতথ্য দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ায় বা বিশ্বস্ততা হারায়। আর গণমাধ্যমের আস্থা বা জনপ্রিয়তার কারণ হলো সত্য প্রকাশ করা। এটা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সোর্স হিসেবে সামাজিক মাধ্যমের তথ্য ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গণমাধ্যমের সার্কুলেশন বা তথ্যের চাহিদা কখনো কমবে না। কারণ মানুষ হয়তো প্রিন্ট কপি কিনছে না। কিন্তু ঠিকই অনলাইনে, ফেসবুকে বা ইউটিউবে গিয়ে খবর দেখছে ও পড়ছে। তথ্য সম্প্রচারের বৈচিত্র্য থাকলেও তথ্যের চাহিদা থাকবে। একটা সময় আসবে যখন মোবাইল বা কম্পিউটারের স্ক্রিন হবে সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু।
ঢাকা ট্যুরিস্টের প্রধান নির্বাহী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কোনো তথ্য দ্রুত প্রচারের বাহন হিসেবে সামাজিক মাধ্যম বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করছে। কেননা মূলধারার গণমাধ্যম কোনো তথ্য প্রচারের আগে তার নিজস্ব নীতি মেনে তা যাচাই করে। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে সেটা হয় না। ফলে অনেক সময় সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া খবর মূলধারার গণমাধ্যমে স্থান পায়। এমনকি কখনো কোনো সংবাদ সরকারি বা কোনো বিশেষ মহলের চাপে মূলধারার গণমাধ্যম প্রচার করতে না পারলে তা সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে মানুষ জানতে পারে। যে কারণে অনেক ক্ষেত্রে মূলধারার গণমাধ্যমের চেয়ে সামাজিক মাধ্যম বেশি প্রাধান্য পায়। শুধু বিশেষ গোষ্ঠীর লোকের কাছে বিশেষ কোনো তথ্য পৌঁছানোর ক্ষেত্রে মূল ধারার গণমাধ্যম তা পারে না। এ ক্ষেত্রে সামাজিক গণমাধ্যমকেই ভরসা করা যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশ্লেষক মো: কদরুদ্দিন শিশির বলেন, পাঠক বা দর্শকের বিশ্বাস এবং আস্থার জায়গাটা কতটা তৈরি করে তার ওপর নির্ভর করে গণমাধ্যমের মূল্যায়ন। আমরা দেখতে পাই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য মানুষকে বেশি প্রভাবিত করছে। এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের শক্তিকে কিভাবে মেইন স্ট্রিমের সংবাদমাধ্যমগুলো কাজে লাগাতে পারে সেই বিষয়ে ভাবতে হবে। যদিও ইতোমধ্যে মূলধারার গণমাধ্যমগুলো তাদের ইন্টারনেটে অনলাইন সাইট পরিচালনা করছে এবং সেসব নিউজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করে সঠিক তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। গণমাধ্যম যত পেশাদারিত্ব বজায় রাখবে, তার বিশ্বাসযোগ্যতা ততই বাড়বে। মূলধারার গণমাধ্যমের দায়বদ্ধতা যত বেশি সোশ্যাল মিডিয়ার ততটা নেই। সোশ্যাল মিডিয়া গণমাধ্যমের জন্য ঠিক চ্যালেঞ্জ নয়। বাহ্যিকভাবে দেখলে মনে হবে সোশ্যাল মিডিয়া এগিয়ে রয়েছে। তবে বিশ্বাসযোগ্যতা ও নির্ভরশীলতার বিষয়ে গণমাধ্যমের জুড়ি নেই।
মূলধারার গণমাধ্যমে বাড়ছে মাল্টিমিডিয়ার প্রভাব
সমগ্র বিশ্বেই এখন সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শক্তিশালী হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ফেসবুক ও ইউটিউব এবং মাল্টিমিডিয়া বাংলাদেশের মূলধারার গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। বিজ্ঞানের...





