দেশে গত কয়েক মাস আগে হঠাৎ করেই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। সব দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে সারা দেশে বিএনপি ২০ দিন ধরে নানা কর্মসূচি পালন করেছে। সম্প্রতি জ্বালানি তথা কেরোসিন, ডিজেল, এলপি গ্যাস ও যানবাহনের ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে জনস্বার্থে ৪১ দিনের কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নেমেছে দলটি। বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন পৃথকভাবে এসব কর্মসূচি পালন করবে; যা গতকাল সোমবার থেকে শুরু হয়েছে, চলবে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। দেশের সব ইউনিয়ন থেকে জেলা পর্যন্ত এ নিয়ে লিফলেট বিতরণ করা হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে ছয় কোটি লিফলেট বিতরণ করা হবে। পরবর্তীতে বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে বিএনপির। গত সপ্তাহে বিএনপির এক যৌথসভায় এ সিদ্ধান্ত হয় বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। লিফলেটে ‘গণদুশমন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান’ শিরোনামে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি লুটপাট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্র্ধ্বগতি রোধ, ডিজেল-কেরোসিন, পানি-বিদ্যুৎ, সুতা-রঙের দাম কমানোসহ ১২ দফা দাবি রয়েছে।
বিএনপির সিনিয়র নেতারা মনে করেন, ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আন্দোলনে যাওয়ার আগে জনস্বার্থে এ ধরনের কর্মসূচি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক; যা সফল করতে ইতোমধ্যে তৃণমূলে বিশেষ করে জেলার নেতাদের কঠোরভাবে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কেননা এবার এ ধরনের জনসম্পৃক্ত কর্মসূচিতে জেলা নেতাদের সক্রিয় ভূমিকা দেখতে চায় হাইকমান্ড। এ জন্য তাদের ঢাকায় না থেকে নিজ জেলার মূল দলসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন নেতাকর্মীদের সংগঠিত করে জনমত গড়ে তুলতে বলা হয়েছে। একইভাবে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতাদেরকেও। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এ প্রসঙ্গে বলেন, ৪১ দিন এই কর্মসূচি চলবে আমাদের। ডিজেল, কেরোসিন ও দ্রব্যমূল্য কমানোর জন্য এই লিফলেট বিতরণের কর্মসূচি। গ্রামে-গঞ্জে, উপজেলা-থানা, ইউনিয়ন-ওয়ার্ডের প্রত্যেকটি জায়গায় এবং রেলস্টেশনে সর্বত্র লিফলেট বিতরণ শুরু হলো।
জানা গেছে, দেশের ও দলের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গত বৃহস্পতিবার দলের নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক যৌথসভা করে বিএনপি। সভায় লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি সভাপতিত্ব করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সভায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ সাংগঠনিক ও সহসাংগঠনিক সম্পাদক, ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব এবং সব অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের দুই শীর্ষ নেতা উপস্থিত ছিলেন। সম্প্রতি কেরোসিন, ডিজেল, এলপি গ্যাস ও যানবাহনের ভাড়া বৃদ্ধিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের সীমাহীন ঊর্ধ্বগতির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে দেশের সব ইউনিয়ন, পৌর, থানা, উপজেলা ও মহানগরে লিফলেট বিতরণের সিদ্ধান্ত হয় ওই সভায়।
এরপরই গতকাল থেকে দেশব্যাপী লিফলেট বিতরণের ৪১ দিনের কর্মসূচি শুরু করেছে বিএনপি। বিএনপি ছাড়াও বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে পৃথকভাবে লিফলেট বিতরণ করা হবে। সব মিলিয়ে ৪১ দিনব্যাপী লিফলেট বিতরণ করা হবে। এর মধ্যে বিএনপির উদ্যোগে ১৫-১৯ নভেম্বর, যুবদলের উদ্যোগে ২৩-২৫ নভেম্বর, কৃষক দলের উদ্যোগে ২৬-২৮ নভেম্বর, স্বেচ্ছাসেবক দলের উদ্যোগে ২৯-৩০ নভেম্বর এবং ১ ডিসেম্বর, ছাত্রদলের উদ্যোগে ২-৪ ডিসেম্বর, ওলামা দলের উদ্যোগে ৮-১০ ডিসেম্বর, জাসাসের উদ্যোগে ১৭-১৯ ডিসেম্বর, তাঁতী দলের উদ্যোগে ২০-২২ ডিসেম্বর, মহিলা দলের উদ্যোগে ২৩-২৫ ডিসেম্বর, শ্রমিক দলের উদ্যোগে ২৬-২৮ ডিসেম্বর। জাতীয়তাবাদী টেক্সটাইল অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (জেটেব) উদ্যোগেও লিফলেট বিতরণ করা হবে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল নয়া দিগন্তকে বলেন, বিএনপি গণমানুষের দল, অতীতেও বিএনপি জনস্বার্থে রাজপথে ছিল। এখনো আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। মৎস্যজীবী দলের সদস্যসচিব মো: আব্দুর রহিম বলেন, এই সরকার জনভোগান্তিতে রেকর্ড ছাড়িয়েছে। আমরা জনগণের জন্য রাজনীতি করি। তাই জনগণকে সাথে নিয়ে জ্বালানিসহ দ্রব্যমূল্য কমানোর দাবিতে অবৈধ সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলব সে জন্য লিফলেট বিতরণ।
নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে গতকাল বেলা ১১টায় মহানগর উত্তর-দক্ষিণ বিএনপির উদ্যোগে পথচারীদের মধ্যে লিফলেট বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। এ সময় সাংবাদিকদের কাছে মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আমান উল্লাহ আমান বলেন, প্রায় ৪১ দিনব্যাপী লিফলেট বিতরণ কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। মহানগর উত্তর-দক্ষিণ কেন্দ্রীয়ভাবে এই কর্মসূচির উদ্বোধন হলো। প্রতিটা অঙ্গসংগঠন তিন দিন লিফলেট বিতরণ করবে। বাসভাড়া বৃদ্ধিকে সরকারের ‘সাজানো নাটক’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, দেখানো হয়েছে পরিবহন স্ট্রাইক হয়েছে সে জন্য বাস-লঞ্চসহ পরিবহনে ভাড়া বৃদ্ধি করতে হবে। এ জন্যই তারা (সরকার) ভাড়া বৃদ্ধি করেছে। আমাদের দাবি অবিলম্বে ডিজেল- কেরোসিনের দাম কমাতে হবে, দ্রব্যমূল্য কমাতে হবে। এই সরকার জনগণের নির্বাচিত নয়, তারা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ নয়। এদেরকে অবশ্যই পদত্যাগ করে চলে যেতে হবে। নির্দলীয় সরকারের অধীনে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা হলে জনগণের সমস্যার সমাধান হবে।
মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আবদুস সালাম বলেন, আমরা জনগণকে বলব, এই সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হন; তা না করলে তারা এভাবে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করবে, জনগণের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন চালাবে। যেভাবে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমান ও বিএনপির ওপর করেছে, ঠিক একইভাবে জনগণের ওপর করবে। শুধু তাই নয়, সাংবাদিকসহ সব পেশাজীবীর ওপর সরকারের নিপীড়ন-নির্যাতন বাড়বে। কাজেই এর বিরুদ্ধে সর্বস্তরের জনগণকে সাথে নিয়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে আমরা কর্মসূচি শুরু করেছি। গতকাল লিফলেট বিতরণকালে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আবদুস সালাম আজাদ, মহানগর দক্ষিণের সদস্যসচিব রফিকুল আলম মজনু, উত্তরের সদস্যসচিব আমিনুল হক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
বিভিন্ন জেলায় লিফলেট বিতরণ
খুলনা ব্যুরো জানায়, কেন্দ্রীয় কর্মসূচি অনুযায়ী গতকাল দুপুরে বিএনপি কার্যালয়ে খুলনা মহানগর ও জেলার উদ্যোগে লিফলেট বিতরণ কর্মসূচি শুরু করা হয়। কর্মসূচি উদ্বোধনকালে খুলনা মহানগর সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেছেন, দীর্ঘ একযুগ ধরে দেশে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। দেশের গণতন্ত্র, আইনের শাসন আজ ভূলুণ্ঠিত, গণতন্ত্র নির্বাসিত ও মানবাধিকার বিপন্ন। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে আমির এজাজ খান, শেখ মোশাররফ হোসেন, জাফরুল্লাহ খান সাচ্চু, শাহ জালাল বাবলু, অধ্যক্ষ তারিকুল ইসলাম, শেখ আব্দুর রশিদ, আব্দুল রাকিব মল্লিক, অধ্যাপক মনিরুল হক বাবুল, সিরাজুল হক নান্নু, আসাদুজ্জামান মুরাদ বক্তৃতা দেন। পরে কেডি ঘোষ রোড, স্যার ইকবাল রোড, হেলাতলা রোডে পথচারী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে লিফলেট বিতরণ করা হয়।
রাজশাহী ব্যুরো জানায়, রাজশাহীতে প্রচারপত্র বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেছে বিএনপি। গতকাল দুপুরে মহানগর বিএনপির উদ্যোগে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। পরে নগরীর সাহেব বাজার জিরো পয়েন্ট, আরডি মার্কেট, সোনাদীঘি মোড় ও সমবায় মার্কেট সংলগ্ন রাস্তায় প্রচারপত্র বিতরণ করা হয়। কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু, রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি ও সাবেক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল হক মিলন, যুগ্ম সম্পাদক ওয়ালিউল হক রানা, মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক আব্দুল কাদের বকুল, সদস্য সচিব রফিকুল ইসলাম রবি প্রমুখ।
গাজীপুর সংবাদদাতা জানান, গতকাল রাজবাড়ী রোডস্থ দলের জেলা কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফজলুল মিলন। জেলা বিএনপি নেতা সাখাওয়াৎ হোসেন সবুজের সঞ্চালনায় আরো বক্তব্য রাখেন, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, গাজীপুর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব কাজী সাইয়েদুল আলম বাবুল, কাপাসিয়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক শাহ রিয়াজুল হান্নান, কালীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক হুমায়ুন কবির মাস্টার, গাজীপুর সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু তাহের মুসল্লি, শ্রীপুর উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আক্তারুল আলম মাস্টার প্রমুখ। সমাবেশ শেষে শহরে জনসচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করা হয়।
জ্বালানি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদ
৪১ দিনের কর্মসূচি নিয়ে মাঠে বিএনপি
দেশে গত কয়েক মাস আগে হঠাৎ করেই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। সব দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে সারা দেশে বিএনপি ২০ দিন ধরে নানা কর্মসূচি...





