গত ১৩ নভেম্বর থেকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ৭৬ বয়সী সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী হাসপাতালের ‘ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) চিকিৎসাধীন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তার অবস্থার তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। শারীরিকভাবে ভীষণ দুর্বল তিনি। বিছানায়-ই বেশির ভাগ সময় কাটাতে হচ্ছে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে। সার্বক্ষণিক চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণেই তাকে থাকতে হচ্ছে। সবসময় তার পাশে থাকছেন ছোট ছেলে মরহুম আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শর্মিলা রহমান সিঁথি। নরম খাবার খাচ্ছেন তিনি। খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য এভারকেয়ার হাসপাতালের চিকিৎসক শাহাবুদ্দিন তালুকদারের নেতৃত্বে একটি মেডিক্যাল বোর্ডও গঠন করা হয়েছে। সেই বোর্ডের অন্যতম সদস্য ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ডা: এ জেড এম জাহিদ হোসেন রয়েছেন। যিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের চিকিৎসার সার্বিক বিষয় দেখভাল করছেন। খালেদা জিয়ার মুক্তি ও সুচিকিৎসার দাবিতে লাগাতার কর্মসূচি চালু থাকবে বলে জানিয়েছে বিএনপি।
জানা গেছে, গত ১৩ নভেম্বর অসুস্থ হলে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে। সেখানে তার শারীরিক বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। এরপর ফুসফুসের বায়োপসি টেস্ট করা হয়। বর্তমানে খালেদা জিয়া এভারকেয়ার হাসপাতালের সিসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তিনি বহু বছর ধরে আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, কিডনি, ফুসফুস ও চোখের সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ভুগছেন। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সাজার পর কারাবন্দী হন খালেদা জিয়া। পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ সরকারের নির্বাহী আদেশে তার সাজা সাময়িক স্থগিত করে তাকে মুক্তি দেয়া হয়। কারাগার থেকে অসুস্থতা নিয়ে মুক্তির পর এই পর্যন্ত খালেদা জিয়া তিনবার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হলেন।
ইতোমধ্যে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ও বিদেশে উন্নত চিকিৎসার দাবিতে গত ২০ নভেম্বর ঢাকাসহ সারা দেশে ৮ ঘণ্টার গণ অনশন করেছে বিএনপি। নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় গণ অনশন দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা ছাড়াও বিরোধী রাজনৈতিক দল জেএসডি, নাগরিক ঐক্য, গণফোরামসহ ২০ দল ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দও অংশ নেন। খালেদা জিয়ার মুক্তি ও সুচিকিৎসার দাবিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতা ও প্রতিনিধিরা বিবৃতিও দিয়েছেন। খালেদা জিয়ার রোগমুক্তির লক্ষ্যে বিএনপি ও এর বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে কুরআন খতম, এতিমদের মধ্যে খাবার বিতরণ, দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের মতো সামাজিক কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে।
এ দিকে গত রোববার খালেদা জিয়ার মুক্তি ও সুচিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর দাবি জানিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের পাঁচটি রাজনৈতিক দল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে। গতকাল বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ও সুচিকিৎসার দাবিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে আইনজীবীদের ১৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল আইনমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে স্মারকলিপি দিয়েছেন। মানবিক কারণে চিকিৎসার জন্য বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের কাছে স্মারকলিপিতে আবেদন করেছেন বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা। স্মারকলিপিতে তারা বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১(১)-এর ধারা মতে সরকার যেকোনো সময় শর্তহীনভাবে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করে বা ৪০১-এর ৬ উপধারা মোতাবেক বিশেষ আদেশ দিয়ে খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারে। স্মারকলিপি পড়ে সে সময় জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘এটি তারা পরীক্ষা করবেন এবং এ নিয়ে আলোচনা করবেন। যতটুকু গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া যায়, সেভাবেই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’
এ দিকে খালেদা জিয়ার মুক্তি ও সুচিকিৎসার দাবিতে গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণভাবে লাগাতার কর্মসূচি অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। গত সোমবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি ও বিদেশে প্রেরণের দাবিতে পরবর্তী কর্মসূচি সম্পর্কে আলোচনা হয়। মহাসচিব সংশ্লিষ্ট নেতৃবৃন্দ ও অঙ্গ-সংগঠনগুলোর সাথে আলোচনা করে পরবর্তী কর্মসূচি গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়। সভায় ভার্চুয়ালি সভাপতিত্ব করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সভায় উপস্থিত ছিলেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, গয়েশ^র চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বেগম সেলিমা রহমান ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
জানতে চাইলে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ও সুচিকিৎসার দাবিতে ইতোমধ্যে গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণভাবে অনেক কর্মসূচি পালন করেছি। আমাদের কর্মসূচি অব্যাহত আছে। বিএনপি কোনো আন্ডারগ্রাউন্ড দল নয়। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ও সুচিকিৎসার দাবিতে গণতান্ত্রিকভাবে আমাদের লাগাতার কর্মসূচি থাকবে। আমরা যেসব কর্মসূচি ঘোষণা করব তা যথাসময়েই অবহিত করা হবে।
জানা যায়, বিএনপি স্থায়ী কমিটির সভায় তারেক রহমান এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বেগম খালেদা জিয়ার সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা সদস্যবৃন্দকে অবহিত করেন। সভায় দেশনেত্রীর আশু রোগমুক্তির জন্য দোয়া করা হয়। খালেদা জিয়ার মুক্তি ও বিদেশে উন্নত চিকিৎসার দাবিতে গণ-অনশন কর্মসূচি ঢাকায় সফলভাবে পালনের জন্য ঢাকা মহানগরের নেতৃবৃন্দ এবং সারা দেশে জেলা পর্যায়ের নেতা-কর্মীবৃন্দকে ধন্যবাদ জানানো হয়। এ ছাড়া কর্মসূচি পালনকালে কয়েকটি জেলায় বিশেষ করে খুলনা, পটুয়াখালী, বরগুনা, ঝালকাঠি ও সাতক্ষীরা পুলিশের বাধা প্রদান ও কর্মীদের গ্রেফতার ও হয়রানির তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ এবং অবিলম্বে গ্রেফতারকৃতদের মুক্তির দাবি জানানো হয়। একইসাথে খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে সোমবার সারা দেশে সমাবেশ কর্মসূচিতে খুলনা, নরসিংদী, ঢাকা, নাটোরসহ বিভিন্ন স্থানে হামলার তীব্র নিন্দা জানানো হয়।