দলের চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং বিদেশে সুচিকিৎসার দাবিতে লাগাতার কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে বিএনপি। দলীয় প্রধানের চিকিৎসা ইস্যুতে একাধিক কৌশল অবলম্বন করছে বিএনপির হাইকমান্ড। এ ক্ষেত্রে রাজপথের কর্মসূচি ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক ও পেশাজীবী মহল থেকে সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। সেই সাথে খালেদা জিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকেও সরকারের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা হচ্ছে। বিএনপির নীতিনির্ধারকরা জানান, বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতা তাদের কাছে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সঙ্কট। দলটির নেতাকর্মীরা তাদের নেত্রীর এই অসুস্থতাকে অস্তিত্বের সঙ্কট হিসেবে মনে করছেন। খালেদা জিয়ার পরিবার, মেডিক্যাল বোর্ড এবং দল বলছে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে অবিলম্বে বিদেশে নেয়া জরুরি। তবে দলটির নেতারা যেভাবেই হোক খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসার অনুমতির জন্য তারা সরকারের ওপরই নির্ভর করছেন। এ দিকে দলের চেয়ারপারসনের মুক্তি ও বিদেশে চিকিৎসার দাবি আদায়ে লাগাতার কর্মসূচি দিয়ে মাঠে রয়েছে বিএনপি। তারই ধারাবাহিকতায় আগামীকাল ঢাকাসহ দেশের সব বিভাগীয় সদরে সমাবেশ কর্মসূচি পালন করবে দলটি। ইতোমধ্যে কর্মসূচি সফলের লক্ষ্যে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য, ভাইস চেয়ারম্যান, যুগ্ম মহাসচিব ও সাংগঠনিক এবং সহসাংগঠনিক সম্পাদকদের নিয়ে বিভাগভিত্তিক কমিটি গঠন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগের নেতারা সমাবেশ সফল করতে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছেন। বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের জেলার শীর্ষ নেতাদের সাথে মতবিনিময় করছেন বিএনপির সিনিয়র নেতারা। গতকাল ঢাকা মহানগর দক্ষিণ-উত্তর এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র সহসভাপতি গোলাম সারোয়ারের সভাপতিত্বে সংগঠনের মতবিনিময় সভা হয়েছে।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী নয়া দিগন্তকে বলেন, দেশের তিনবারের নির্বাচিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ হয়ে এখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। অথচ বিনা ভোটের সরকার তাকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য যেতে দিচ্ছে না। বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ও বিদেশে চিকিৎসার দাবি এখন শুধু বিএনপির নয়, এটা দেশের সব শ্রেণিপেশার মানুষের দাবি। ইতোমধ্যে আমাদের দলীয় কর্মসূচিগুলোতে বিভিন্ন দল ও মতের লোকদের অংশগ্রহণ তাই প্রমাণ করে। তিনি বলেন, আমরা দেশনেত্রীর মুক্তি ও বিদেশে সুচিকিৎসার দাবিতে আগামী সোমবার ঢাকাসহ সারা দেশের বিভাগীয় শহরে সমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করেছি। সে মোতাবেক প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। ঢাকায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বা নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এই সমাবেশ করার অনুমতি চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়া হয়েছে।
জানা যায়, ইতোমধ্যে খালেদা জিয়ার মুক্তি ও বিদেশে চিকিৎসার দাবিতে অনেকগুলো কর্মসূচি পালন করেছে বিএনপি। সম্প্রতি ঢাকায় গণ-অনশন, সমাবেশ, ডিসিদের স্মারকলিপি প্রদান, দোয়া দিবসসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে দলটি। আগামীকাল ঢাকাসহ দেশের সব বিভাগে সমাবেশ হবে। এ ছাড়া ১ ডিসেম্বর মহিলা দলের উদ্যোগে মৌন মিছিল, ২ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধা দলের উদ্যোগে মানববন্ধন, ৩ ডিসেম্বর (শুক্রবার) কৃষক দলের উদ্যোগে রাজধানীসহ সারা দেশে সমাবেশ এবং ৪ ডিসেম্বর জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের উদ্যোগে সমাবেশ হবে। এরই মধ্যে অবশ্য বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের পাঁচটি দলের শীর্ষ নেতারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে দেখা করে খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসার অনুমতির জন্য একটি আবেদন করেছেন। বিএনপির বেশির ভাগ নেতাকর্মী খালেদা জিয়ার অসুস্থতাকে দলের অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে ভাবছেন। স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র সহসভাপতি গোলাম সরোয়ার বলেন, খালেদা জিয়া এখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। তিনি সিসিইউতে মানে পুরো বাংলাদেশ সিসিইউতে। তিনি আর বাংলাদেশ সমার্থক। আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। খালেদা জিয়াকে বিদেশ পাঠাতে সরকারকে আন্দোলনের মাধ্যমে বাধ্য করতে যেকোনো কর্মসূচি পালনে সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত।
বিএনপির ঢাকা বিভাগের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদ ও ঢাকা মহানগর উত্তরের সদস্যসচিব আমিনুল হক জানান, ৩০ নভেম্বর বেলা ২টায় সমাবেশ সফল করতে এবং সর্বোচ্চ গণজমায়েতের লক্ষ্যে তারা ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছেন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বা নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করার জন্য তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছেন। তাদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদেরকে সমাবেশের অনুমিত দেবে। এ দিকে ময়মনসিংহ বিভাগের সমাবেশ সফলের লক্ষ্যে বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্সের নেতৃত্বে ময়মনসিংহ মহানগর এবং উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে শহরের বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ ও প্রচারপত্র বিতরণ করা হয়।
ঢাকা দক্ষিণ বিএনপির জরুরি সভা : এ দিকে আগামীকালের সমাবেশ সফলের লক্ষ্যে জরুরি সভা করেছে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি। ঢাকা দক্ষিণের আহ্বায়ক মো: আব্দুস সালাম বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে সরকার তাকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। অবিলম্বে তাকে বিদেশে যাওয়ার অনুমতির দাবি জানান তিনি। ঢাকা দক্ষিণ বিএনপির সদস্যসচিব রফিকুল আলম মজনুর সঞ্চালনায় সভায় বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক, সদস্যবৃন্দ এবং থানা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা উপস্থিত ছিলেন। আগামীকালের সমাবেশ সফল করতে সবাইকে আহ্বান জানান তারা।
স্বেচ্ছাসেবক দলের মতবিনিময় সভা : এ ছাড়া খালেদা জিয়ার মুক্তি ও বিদেশে চিকিৎসার দাবিতে আগামীকালের সমাবেশ সফল করার লক্ষ্যে গতকাল স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাথে ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ এবং ঢাকার পাশের ছয়টি মহানগর ও জেলার নেতৃবৃন্দের মতবিনিময় সভা হয়। স্বেচ্ছাসেবক দলের সহসভাপতি গোলাম সরোয়ারের সভাপতিত্বে সভায় সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাদরেজজামান, ঢাকা দক্ষিণের এস এম জিলানী, উত্তরের ফখরুল ইসলাম রবিন, সহ-দফতর সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।