বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসংগঠনগুলোর অন্যতম জাতীয়তাবাদী যুবদল। আন্দোলন-সংগ্রামের অগ্রভাবে থাকা সংগঠনটির বর্তমান কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে তিন বছর আগে। ফলে যুবদলের কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। সারা দেশে থানা-পৌর কমিটি গঠনও বেশ কিছুদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। কবে নাগাদ এসব কমিটি গঠন প্রক্রিয়া শুরু হবে কেউ বলতে পারছে না। এতে যুবদলের পদপ্রত্যাশীরা ভোগান্তিতে পড়ছেন এবং নতুন নেতৃত্বও বিকশিত হচ্ছে না। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পর তৃণমূল থেকে সংগঠন শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয় বিএনপির হাইকমান্ড। সারা দেশে থানা-পৌর এমনকি ইউনিয়ন পর্যন্ত ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেয়া হয়। যোগ্য ও ত্যাগীদের দিয়ে তৃণমূলে কমিটি গঠনের জন্য সংশ্লিষ্ট সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতাদের সমন্বয়ে সারা দেশে বিভাগীয় সাংগঠনিক টিমও গঠন করা হয়। ছাত্রদলের সাংগঠনিক টিম তাদের কার্যক্রম ইতোমধ্যে শেষ করতে পারলেও যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতারা তা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। জানা গেছে, গত তিন মাস ধরে কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়ায় সম্প্রতি যুবদলের তৃণমূলে যে উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়েছিল তা অনেকটা স্তিমিত হয়ে পড়েছে।
যুবদলের দফতর সূত্র জানায়, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুবদলের তৃণমূল পুনর্গঠনের লক্ষ্যে ১১ টিম গঠন করা হয়। তৃণমূল থেকে যোগ্য ও জনপ্রিয় নেতৃত্ব তুলে আনা এবং সংগঠনকে আরো শক্তিশালী করতে এসব টিম গঠন করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। একজন সহসভাপতির নেতৃত্বে সাত সদস্যের এসব টিম গঠন করা হয়। তন্মধ্যে বরিশাল বিভাগীয় টিম প্রধানের দায়িত্ব পান সহসভাপতি কাজী আজিজুল হাকিম আরজু। খুলনাসহ অন্যান্য বিভাগীয় টিম তাদের কার্যক্রমে এগিয়ে থাকলেও শুধু বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগীয় টিমের কার্যক্রম পিছিয়ে রয়েছে। যেমন খুলনা বিভাগের ১০৩টি ইউনিট কমিটির মধ্যে ১০২টি ঘোষণা হয়েছে। খুলনা জেলা ও মহানগর কমিটি কেন্দ্রে ঘোষণার অপেক্ষায় আছে। অথচ বরিশাল বিভাগীয় টিম কোনো থানা-পৌর কমিটি ঘোষণাই করতে পারেনি। যদিও কাজী আজিজুল হাকিম আরজুকে গত বছর টিম প্রধান থেকে অব্যাহতি দিয়ে সংগঠনের আরেক সহসভাপতি মোনায়েম মুন্নাকে বরিশাল বিভাগের টিম প্রধান করা হয়। তার নেতৃত্বাধীন টিমও কোনো কমিটি গঠন করতে পারেনি। ফলে বরিশাল অঞ্চলের বিভিন্ন ইউনিটের পদপ্রত্যাশীরা হতাশ এবং ক্ষুব্ধ।
যুবদলের দফতর সম্পাদক কামরুজ্জামান দুলাল জানান, ৮২টি সাংগঠনিক ইউনিটের (জেলা সমমর্যাদা) অধিকাংশই মেয়াদোত্তীর্ণ। বেশকিছু জেলা কমিটি নতুনভাবে পুনর্গঠন হয়েছে এবং কিছু জেলা কমিটি ঘোষণার অপেক্ষায় আছে। ২০ বছর পর ময়নসিংহ উত্তর ও দক্ষিণ জেলা কমিটি হয়েছে। ৯৩৭টি উপজেলা, পৌর ও থানা শাখার মধ্যে ৭০০-এর বেশি নতুন আহ্বায়ক কমিটি হয়েছে। এখন ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি করা হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, উত্তরবঙ্গের গাইবান্ধা ছাড়া সব জেলার ইউনিয়ন-ওয়ার্ড কমিটির কাজ শেষ। অন্যান্য বিভাগেও শেষ দিকে। তবে বরিশাল দক্ষিণের ৬টা কেন্দ্রে জমা আছে আর বরিশাল উত্তরে কিছু অভ্যন্তরীণ সমস্যা থাকলেও ৯টি ইউনিটের কমিটি গঠন প্রক্রিয়াধীন। সব শেষে উপজেলা পর্যায়ে সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি হবে।
বরিশাল বিভাগের যুবদল নেতাকর্মীরা জানান, দুই বছর ধরে তাদের কমিটি হবে বলে আশ্বাস দেয়া হয়। কিন্তু এখনো কোনো কমিটি আলোর মুখ দেখেনি। এখন আবার থানা ও পৌর কমিটির পরিবর্তে নতুন করে জেলা কমিটি গঠনের তোড়জোড় শুরু করেছে বিভাগীয় টিম। ফলে এসব থানা ও পৌর কমিটি গঠন আরো দুই বছর পিছিয়ে যাবে। এমনকি এ বিভাগের কমিটি ঘোষণা না-ও হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বরিশাল জেলা যুবদলের একাধিক নেতাকর্মী জানান, দেড় বছর আগে বরিশালের প্রত্যেক থানা, পৌর যুবদলের কর্মিসভা শেষে কমিটি গঠনও প্রায় চূড়ান্ত হয়। কিন্তু জেলা যুবদলের নেতা ও কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম তসলিম উদ্দিনের কারণে এসব কমিটি ঘোষণা হচ্ছে না। তিনি কমিটিতে তার অনুসারীদের বসানোর চেষ্টার কারণে কমিটি হচ্ছে না। কিন্তু কমিটিতে তার অনুসারীদের অবস্থা সুবিধাজনক হবে না দেখে এখন বিভাগীয় টিমকে দিয়ে জেলা কমিটি গঠনের তাগিদ দিয়েছেন। যাতে তিনি জেলার আহ্বায়ক এবং বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হতে পারেন। তাহলে থানা ও পৌর কমিটি গঠনে তিনি প্রভাব বিস্তার করতে পারবেন। অতীতে জেলা ছাত্রদলের দায়িত্বে থাকাবস্থায় ছাত্রদলের কোনো কমিটি তিনি গঠন করতে দেননি বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ। কমিটি গঠনে তার অনিয়মের বিষয়ে বাবুগঞ্জ থানা যুবদলের পদপ্রত্যাশী এক নেতা জানান, এই থানায় যুবদলের সভাপতি হিসেবে দীর্ঘ ১৮ বছরের বেশি সময় আছেন আওলাদ হোসেন। মাঝখানে তিনি বাবুগঞ্জ থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদকও ছিলেন। আবারো তাকে থানা যুবদলের আহ্বায়ক করতে চান তসলিম উদ্দিন। এ থানায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান থানা যুবদলের আহ্বায়ক হিসেবে সাবেক ছাত্রনেতা রাকিবুল হাসান রাকিবের নাম প্রস্তাব করলেও তা মানা হচ্ছে না। ফলে কমিটি গঠন প্রক্রিয়া ঝুলে গেছে। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে একাধিকবার ফোন করলেও রিসিভ করেননি তসলিম উদ্দিন। এ ছাড়া অযোগ্যদের দিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে ময়মনসিংহ ও ঢাকা বিভাগীয় টিমের বিরুদ্ধেও একাধিক লিখিত অভিযোগ বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জমা পড়েছে।
বরিশাল বিভাগীয় টিমের সদস্য যুবদল নেতা মনিরুল ইসলাম লিটন বলেন, বরিশাল বিভাগে সব জেলার যুবদলের থানা/পৌর কমিটি গঠন শেষ হয়নি। শুধু পটুয়াখালী ও বরগুনায় শেষ হয়েছে। বরিশাল উত্তরে কিছু অভ্যন্তরীণ ঝামেলা থাকলেও কমিটি গঠন প্রক্রিয়াধীন বলে তিনি জানান।