যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম তথ্য ও প্রযুক্তি খাতে সফলতার মধ্য দিয়ে আরো একটি বছর পার করল বাংলাদেশ। বেশ কিছু কারণে সদ্যবিদায়ী বছরটি প্রযুক্তি খাতে বেশ আলোচিত ছিল। নানামুখী সফলতা থাকলেও প্রযুক্তি খাতের বেশ কিছু সমস্যা নিয়ে মানুষের খারাপ অভিজ্ঞতাও হয়েছে। কলড্রপ, ইন্টারনেটে কাক্সিক্ষত গতি না পাওয়াসহ নানা সঙ্কটে দিন পার হয়েছে সেবাগ্রহীতাদের। এমনকি বৈশ্বিক সব রিপোর্টেও বাংলাদেশের ইন্টারনেটের গতি নিয়ে নেতিবাচক ফল এসেছে। নতুন বছরে এসব চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে সামনে এগোতে হবে। শুধু এসবই নয় প্রযুুক্তিসেবার আওতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সাইবার অপরাধও মারাত্মকভাবে বাড়ছে। এটাও নতুন বছরের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। দেশে সরকারি-বেসরকারি সব সেবা এখন অনলাইনে। আর্থিক খাতকে সুরক্ষিত রাখতে মনোযোগী হতে হবে সাইবার নিরাপত্তায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে বড় ধরনের সঙ্কটে পড়তে হতে পারে আমাদের।
২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনী ইশতেহারে যে ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপরেখা ঘোষণা করেছিলেন, সেটার ইতি হলো বিদায়ী বছরে। এখন ২০৪১ সালের ভিশন নিয়ে কাজ চলছে। গত বছরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য ছিল ফাইভজি চালু। গত ১২ ডিসেম্বর ফাইভজির যুগে প্রবেশ করে বাংলাদেশ। টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেছেন, বাংলাদেশ যে প্রযুক্তি খাতে বহুদূর এগিয়েছে সেটা আমরা করোনা মহামারীর মধ্যে বুঝতে পেরেছি। মোবাইল অপারেটরদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের পরও তারা কিন্তু করোনার মধ্যে মানুষকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছে। এখন সেবাগুলো নির্বিঘœ করতে আমাদের কাজ করে যেতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের তত্ত্বাবধানে ডিজিটাল বাংলাদেশে দিনবদলের যাত্রা শুরু হয় ২০০৯ সাল থেকেই। প্রতি বছরই কিছু না কিছু অগ্রগতি হয়েছে। যদিও তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ভিশন ২০২১-এর মধ্যেই দেশে ফাইভজি চালু হবে। বছরের শেষ দিকে তিনি সেই কথা রেখেছেন। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন মোবাইল অপারেটর কোম্পানি টেলিটকের মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে ফাইভজি কার্যক্রম শুরু হলেও নতুন বছরে পুরোদমে দেশে ফাইভজি চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। এর মধ্যে ফাইভজির স্পেকট্রাম বরাদ্দ থেকে শুরু করে সবকিছু নিয়েই কাজ চলছে। আগামীতে এই অর্জন ধরে রেখে আরো কিছু নতুন পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ জানিয়েছেন, মানুষকে যে ভিশন দেখিয়েছিলাম, সেটা এখন বাস্তব। সামনের দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমরা সর্বোচ্চ প্রস্তুত। আইসিটি বিভাগের ডিজিটাল নিরাপত্তা এজেন্সিকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। সাইবার হামলা ঠেকাতে তাদের প্রস্তুত করা হচ্ছে।
বলা হচ্ছে, ৫জি নেটওয়ার্ক সেবা চালু হওয়ায় দেশের চিকিৎসা ও শিক্ষা খাতে উন্নয়ন ঘটবে। পাওয়া যাবে উন্নত টেলিমেডিসিন সেবা। এতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও সহজেই উন্নত চিকিৎসাসেবার সুযোগ এমনকি দেশ-বিদেশের অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সাথে পরামর্শ করতে পারবে। ৫জির ব্যবহারে দেশের প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীরাও অনলাইনে ক্লাস করতে পারবে। অর্থাৎ হাতের মুঠোয় চলে আসবে বিশ্বের নামীদামি সব কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্লাস। দূর হবে প্রযুক্তিগত বৈষম্য। ৫জি নেটওয়ার্কে মোবাইল গেমিং হবে উন্নত এবং বাফারিং ছাড়াই হাই রেজুলেশন বা উন্নত ভিডিও চিত্র দেখার পাশাপাশি ডিস্টার্ব ছাড়াই আরো স্বচ্ছভাবে ভিডিও কল করা যাবে। এ ছাড়া চালকবিহীন গাড়ি, লাইভ ম্যাপ এবং ট্রাফিক তথ্য জানার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এই ৫জি নেটওয়ার্ক সেবা।
দেশে প্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়ছে, সাইবার হামলা এবং অপরাধপ্রবণতাও বাড়ছে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেছেন, আমরা তো এখন সবকিছুই ডিজিটালাইজেশন করে ফেলেছি। ফলে আমাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঝুঁকি যে আছে, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। যে কেউ এটা হ্যাক করতে পারলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ওলট-পালট করে ফেলতে পারে। এমনকি টাকাও চুরি করে নিয়ে যেতে পারে। আসলে সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিকমাধ্যম নিয়ে আমরা অনেক বেশি ব্যস্ত সময় পার করছি, আসলে সাইবার নিরাপত্তার বিষয়েও অনেক বেশি মনোযোগ দেয়া দরকার। সরকার এখন সেদিকে নজর দিচ্ছে। নতুন বছরে সেটা হবে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিকিউরিটি সচেতনতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিশেষত আমাদের আর্থিক ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে পরিমাণ প্রস্তুতি প্রয়োজন ছিল সেখানে একটা বড় ধরনের ঘাটতি আছে। এটা নিয়ে কাজ করতে হবে।
সরকারি সব সেবাও মিলছে অনলাইনে। কেনাকাটা থেকে শুরু করে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হতো যে কাজে সেই জমির পর্চাও মিলছে অনলাইনে। জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, ই-নামজারি, পাসপোর্টের আবেদন থেকে শুরু করে সবকিছুই মিলছে সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা ডিজিটাল সেন্টারগুলোতে। ঢাকার বাইরে তিন হাজার ৮০০ ইউনিয়নে ফাইবার অপটিক্যাল ক্যাবল দিয়ে ইন্টারনেট সংযোগ দেয়া হয়েছে। সেখানে তৈরি করা হয়েছে ডিজিটাল উদ্যোক্তা সেন্টার। সেখানে ২৭০টির বেশি সেবা পাওয়া যাচ্ছে। দেশে এখন ১০ কোটি মানুষ মোবাইল ফোনে আর্থিক লেনদেন করছে। দেশের এমএফএসে এখন সক্রিয় অ্যাকাউন্টের সংখ্যা পাঁচ কোটির বেশি।





