আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এখনো ঢের বাকি। তার আগে বর্তমান কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে। গত বছরের ২০ ডিসেম্বর থেকে নতুন ইসি গঠনের লক্ষ্যে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপ শুরু করেছেন রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ। অবশ্য রাষ্ট্রপতির চলমান সংলাপে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেÑ বিএনপি, বাসদ, সিপিবি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, এলডিপিসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। এসব বিরোধী দল আগামী নির্বাচন সামনে রেখে ইসি গঠনের চেয়ে জাতীয় সরকার গঠনের বিষয়টিকে মূল ইস্যু ভাবছে। এই দাবিতে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবী সংগঠনও সোচ্চার। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি দলের পক্ষে জাতীয় সরকারের প্রস্তাবনা বা রূপরেখা ঘোষণা করা হয়েছে।
মাঠের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিও ইসি গঠনে সংলাপের চেয়ে নির্বাচনকালীন সরকারকে প্রাধান্য দিচ্ছে। দলটির নেতারা ইসি গঠন নিয়ে কথা বলতে চান না। তারা মনে করেন আলোচনা বা সংলাপ যা-ই হোক প্রধানমন্ত্রী যাদের চাইবেন তাদেরকেই ইসিতে বসানো হবে। এমতাবস্থায় বিদ্যমান সঙ্কট নিরসনে সবার আগে দরকার একটি নির্বাচনকালীন সরকার। জাতীয় সরকারের দাবিতে সোচ্চার একাধিক রাজনৈতিক দলের কয়েকজন নীতিনির্ধারক আলাপকালে জানান, দেশের মানুষ মনে করে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিকভাবে দেশের পরিস্থিতি অনেকটা জটিল। বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক সম্প্রতি র্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং এর প্রভাব সম্পর্কে রাজনীতিকরা স্পষ্ট ধারণা না পেলেও তারা পরবর্তী পরিস্থিতি জানতে উদগ্রীব। তবে জাতীয় সরকারের ইস্যুটি এখনো বিক্ষিপ্তভাবেই আলোচিত হচ্ছে। এই দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সংবাদ সম্মেলনও করেছে বিভিন্ন দল।
সংশ্লিষ্টরা জানান, জাতীয় সরকার হলে সেখানে সব দলের অংশগ্রহণের পাশাপাশি পেশাজীবী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিত্বও থাকবে। কেননা পরিস্থিতি দিনে দিনে অস্বাভাবিক পর্যায়ে যাচ্ছে। শুধু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা বদল বা তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি প্রবর্তন হলেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না। এ ক্ষেত্রে নির্বাচনী প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করার বিষয় রয়েছে। এসব কিছুই ঐকমত্যের মাধ্যমে সম্ভব। জানা গেছে, ‘জাতীয় সরকার’ ইস্যুতে ইতোমধ্যে নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলন, মওলানা ভাসানী অনুসারী পরিষদ, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন আলোচনা করেছে। দুই দফা বৈঠকও করেছেন সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতারা। এই প্রক্রিয়ায় জেএসডি, গণ অধিকার পরিষদসহ অন্যান্য সংগঠনও যুক্ত হবে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা জানান, আগামী নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে করার চেষ্টা হলেও তাতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা কাটবে না। কেননা বিরোধী রাজনৈতিক দল ও আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠী এবং পর্যবেক্ষক দেশগুলো সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পক্ষে কঠোর অবস্থানে থাকবে। সে ক্ষেত্রে সাংবিধানিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হওয়ায় একমাত্র পথ-সমঝোতাভিত্তিক সরকার। যেটাকে তারা ‘জাতীয় সরকার’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
জানা গেছে, মূলত জাতীয় সরকারের ইস্যুটি আলোচনায় আসে বিগত এক-এগারো সরকারের আমলে। এরপর ২০১৪ সালে নির্বাচনের আগেও বিষয়টি আলোচিত হয়। তবে দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে হওয়ায় তখন এ আলোচনা অনেকটা চাপা পড়ে। আবারো গত এক বছর ধরে ড. কামাল হোসেন, আ স ম আব্দুর রব, ড. অলি আহমদ, ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী, মাহমুদুর রহমান মান্না, সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম এবং জোনায়েদ সাকিসহ তরুণ রাজনীতিকরা বিভিন্ন সভা-সেমিনারে ‘জাতীয় সরকার’ পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করছেন। ২০১৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের দাবিতে গণফোরামের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়া স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তিনটি দাবি জানিয়েছিল। সেই দাবিগুলোর মধ্যে বর্তমান সরকারকে পদত্যাগ করে জাতীয় সরকার ঘোষণা করা এবং খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি ছিল উল্লেখযোগ্য।
গত ২৭ ডিসেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় সরকারের রূপরেখা উপস্থাপন করেছেন জেএসডির সভাপতি আ স ম আব্দুর রব। তিনি এই রূপরেখায় বলেছেনÑ শাসন প্রক্রিয়া ও সমাজদেহে যে গভীর ক্ষত এবং নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে তা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হচ্ছেÑ গণজাগরণ ও গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জাতীয় নৈতিক শক্তির পুনরুজ্জীবন করে ‘জাতীয় সরকার’ গঠন করা। দেশের বর্তমান সঙ্কট নিরসনে ১৯৭১ সালের মতো সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সবাই একসাথে মাঠে না নামলে এই দখলদার সরকারকে সরানো যাবে না। ফলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক একটি নৈতিক ও মানবিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের লক্ষ্যে ‘জাতীয় সরকার’ গঠন করতে হবে। যার গঠন, রূপরেখা ও মেয়াদকাল ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে।
গত ৫ জানুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে এলডিপির চেয়ারম্যান ড. অলি আহমদ বলেন, জনগণের পয়সায় আমরা কোনো চা চক্রে যেতে রাজি নই। অনিবন্ধিত কিছু দল আছে এবং যেসব দলের সাথে সরকারের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক, সেসব দলই মিডিয়া কাভারেজের জন্য সংলাপে অংশে নিতে যাচ্ছে। অনেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলছেন; কিন্তু তিন মাসের এই সরকার কোনো সমস্যাই সমাধানের জন্য যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রপতির সাথে কথা বলে কোনো লাভ হয় না। কারণ প্রধানমন্ত্রী যা করতে চান, তাই করবেন। আওয়ামী লীগের আমলে কখনো কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি।
গণফোরাম একাংশের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, দেশ ও জাতি এক গভীর সঙ্কটের মধ্যদিয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠীর সীমাহীন দুর্নীতির কারণে বিভিন্ন দফতর অধিদফতর সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত। গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও ন্যায় বিচার লঙ্ঘিত হওয়ায় বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ হচ্ছে। এই দুর্বিষহ অবস্থা থেকে দেশকে মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার তথা সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠায় দরকার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অবাধ নির্বাচন। আর এই মুহূর্তে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য জাতীয় ঐকমত্যের সরকারের বিকল্প নেই। বর্তমান কর্তৃত্ববাদী সরকারের বিরুদ্ধে সর্বস্তরের জনতাকে ঐক্যবদ্ধ করার আহ্বান জানান তিনি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল লতিফ মাসুম বলেন, জাতীয় সরকার গণতন্ত্রের অনেক পুরনো ধারণা। ব্রিটেন, চীন ও ভুটানে জাতীয় সরকার হয়েছে। আসলে কোনো জাতি যখন চরম সঙ্কট ও দুর্যোগে পড়ে তখনই জাতীয় সরকারের বিষয়টি অনুভূত হয়। বাংলাদেশ ৫০ বছর পরও সঙ্কটমুক্ত হতে পারেনি। বর্তমান শাসকগোষ্ঠী দেশকে তাদের সম্পত্তি মনে করে বলেই এই সমস্যা। সুতরাং এই মুহূর্তে প্রয়োজন জাতীয় সরকার।
বিশদলীয় জোটের শরিক ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ মনে করেন, সুষ্ঠু নির্বাচন করতে হলে বর্তমান সরকারকে অবশ্যই পদত্যাগ এবং নির্বাচকালীন ঐকমত্যের সরকার গঠন করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকির অভিমতÑ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন হবে না। সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে সরকারকে পদত্যাগ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হাতে ক্ষমতা ন্যস্ত করতে হবে। সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে এই সরকার গঠিত হবে। এটিকে কী নামে ডাকা হবে, সেটি বিবেচ্য না। গণ অধিকার পরিষদের সদস্যসচিব ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর বলেন, বর্তমান সরকার ও তাদের পার্লামেন্ট বৈধ নয়। আজকে র্যাব ও সংস্থাটির কর্মকর্তাদের ওপর যে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সেটি তাদের অন্যায়ের প্রতিফল। তাই বর্তমান সঙ্কট নিরসনে সবার মতামতের ভিত্তিতে কমপক্ষে দুই বছরের জন্য একটি জাতীয় সরকার হতে পারে।
রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়াচ্ছে জাতীয় সরকার ইস্যু
আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এখনো ঢের বাকি। তার আগে বর্তমান কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে।...





