একটানা দীর্ঘ ৮১ দিন রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর মহামারী করোনাভাইরাসের ঝুঁকি এড়াতে চিকিৎসকদের পরামর্শে গত মঙ্গলবার গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’য় ফেরেন বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। বাসায় ফেরার পর গত তিন দিন ফিরোজার দোতলায় নিজকক্ষে শুয়ে-বসে সময় কাটাচ্ছেন তিনি। মেডিক্যাল বোর্ডের তত্ত্বাবধানে বাসায় তার চিকিৎসা চলছে। বোর্ডের সদস্যরা নিয়মিত বাসায় গিয়ে তাকে দেখভাল করছেন। বেগম জিয়ার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, দেশে করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় হাসপাতাল থেকে ফেরার পর বাসায় রেখেই চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে বেগম খালেদা জিয়াকে। তার চিকিৎসক দলের সদস্য ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ডা: এ জেড এম জাহিদ হোসেন গতকাল বলেন, ম্যাডামকে (খালেদা জিয়া) বাসায় রেখে চিকিৎসা দিচ্ছে মেডিক্যাল বোর্ড। প্রতিদিন মেডিক্যাল বোর্ডের কোনো না কোনো সদস্য তার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। তার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে সে অনুযায়ী তাকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। মহামারী করোনার সংক্রমণ এড়াতে সম্পূর্ণ সাবধানতা অবলম্বন করেই চিকিৎসাসেবা দেয়াসহ অন্যান্য কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার যেকোনো স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্ভাবনা সব সময় রয়েছে; কারণ তার লিভার সিরোসিসের যে চিকিৎসা, সেটি কিন্তু আমরা করতে পারিনি এখনো। এ দেশে এর চিকিৎসা সম্ভব নয়।
এর আগে বেগম খালেদা জিয়া বাসায় ফেরার দিন সন্ধ্যায় তার স্বাস্থ্যের সর্বশেষ অবস্থা তুলে ধরে এভারকেয়ার হাসপাতালে সংবাদ সম্মেলন করেন তার চিকিৎসায় গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের সদস্যরা। তিনি এখনো পূর্ণ সুস্থ নন বলে জানিয়েছেন তার চিকিৎসকরা। গত ১৩ নভেম্বর ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু দেশে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় তাকে বাসায় পাঠানো হয়েছে। সেখানে রেখেই চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে বেগম খালেদা জিয়াকে। হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা: শাহাবুদ্দিন তালুকদারের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয় খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য।
বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদার জানিয়েছেন, বেগম খালেদা জিয়া এখনো পুরোপুরি সুস্থ না হলেও মহামারীর এ সময়ে আবারো কোভিড সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে তাকে বাসায় পাঠানো হয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে হাসপাতালে ফেরত আনা হবে। তার দুটো কন্ডিশন। এক নম্বর হচ্ছে- তিনি ক্লিনিক্যালি স্টেবল বাট নট কিউর। বাট সি ইজ নট ফ্রি অব ডিজিস। দুই নম্বর হচ্ছে- আমাদের কোভিড পরিস্থিতির জন্য, সেকেন্ডারি ইনফেকশনের জন্য এবং তিনি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছেন। সে জন্য আপাতত তাকে বাসায় পাঠাচ্ছি। এরপরে যদি কোনো রকম ক্রাইসিস হয়, উই আর রেডি টু রিসিভিং হার এগেইন ইন হসপিটাল। কেননা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যতগুলো পসিবল ট্রিটমেন্ট ছিল, তা আমরা দিয়েছি। আমরা হসপিটালের ডাক্তার, বাইরের কনসাল্ট্যান্ট ও অন্যান্য হাসপাতালের বিশেষজ্ঞদের সাথে আলোচনা করেছি। আমরা যুক্তরাজ্য, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ার কনসাল্ট্যান্টদের সাথে কথা বলেছি। সবারই একই মত যে, আপাতত আমরা কন্ট্রোল করেছি। কিন্তু উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে নেয়া দরকার।
জানা গেছে, খালেদা জিয়া বাসায় ফেরার আগে বাসার সবার কোভিড টেস্ট করা হয়। করোনার ঝুঁকির কারণে নেতাকর্মীদের আপাতত ফিরোজায় আসতে নিষেধ করা হয়েছে। দিনে ও রাতে দু’জন নার্স দুই শিফটে ডিউটি করছেন। বুধবার রাতে বোন সেলিমা ইসলাম বেগম খালেদা জিয়ার পছন্দের খাবার নিয়ে বাসায় এলে তিনি সে খাবার খান। একই সাথে বোনের সাথে নানা বিষয়ে কথা বলেন। এ ছাড়া ছোট ভাই শামীম এস্কান্দারের স্ত্রী কানিজ ফাতেমাও গিয়েছিলেন তাকে দেখতে। মাঝে মধ্যে লন্ডনে অবস্থানরত খালেদা জিয়ার বড় ছেলে, ছেলের স্ত্রী, ছোট ছেলে মরহুম আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী এবং নাতনিদের সাথে টেলিফোনে কথা বলে সময় কাটান। সকালে ঘুম থেকে উঠে হালকা গরম পানি পান করেন। এরপর হুইল চেয়ারে করে কিছুটা সময় বারান্দায় রোদ পোহান। এ ছাড়া টেলিভিশন দেখে, পত্রিকা ও বই পড়ে সময় কাটান। খালেদা জিয়া বাসায় আসার পর থেকে মেডিক্যাল বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক ডা: এফ এম সিদ্দিকী, অধ্যাপক ডা: জাহিদ হোসেন ও ডা: আবদুল্লাহ আল মামুন নিয়মিত তাকে দেখতে যান। বর্তমানে খালেদা জিয়ার সাথে আছেন গৃহকর্মী ফাতেমা ও রুপা। তারাই সার্বক্ষণিক তার দেখাশোনা করছেন।
খাবারের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরেছেন। প্রিয় খাবারের মধ্যে রয়েছে স্যুপ, ছোট মাছ, মুরগির গোশত ও সবজি। তবে সব খাবারই নরম করে খাচ্ছেন।
বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রেস উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান বলেন, ম্যাডামের শারীরিক অবস্থা আপাতত স্থিতিশীল। করোনার কারণে নেতাকর্মীদের সেখানে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি চিকিৎসক দলের সদস্যরা নিয়মিত খোঁজখবর রাখছেন।





