জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের দুই বছর মেয়াদি কমিটি চলছে ৯ বছর ধরে। দীর্ঘ এই সময়ে একাধিকবার উদ্যোগ নিলেও কাউন্সিল করতে পারেনি সংগঠনটি। সর্বশেষ ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর ও নভেম্বরে কাউন্সিলের নির্দেশ দিয়েছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেই নির্দেশও উপেক্ষিত। সংগঠনটির শৃঙ্খলা বজায় রাখতে দ্রুত সময়ের মধ্যে কাউন্সিল করে নতুন নেতা নির্বাচনের জন্য শ্রমিকদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে ২০১৯ সালে চিঠি দিয়েছিলেন শ্রমিকদলের উপদেষ্টা পরিষদের মহাসচিব মো: জাফরুল হাসান। তিনি ২০২০ সালে মারা গেছেন। নির্ধারিত সময়ে কাউন্সিল না হওয়ায় সংগঠনের পদপ্রত্যাশী ও তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ এবং হতাশ। শ্রমিকদলের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি নূরুল ইসলাম খান নাসিম প্রায় চার বছর ধরে অসুস্থ এবং নিষ্ক্রিয়। নেতাকর্মীরা তার সাথে যোগাযোগ করতে পারছে না। তার নাম্বারে ফোন করা হলেও অধিকাংশ সময় বন্ধ পাওয়া যায়। সভাপতি আনোয়ার হোসাইনও বয়োজ্যেষ্ঠ। ফলে শ্রমিকদলে এখন নেতৃত্বের সঙ্কট দেখা দিয়েছে। শ্রমিকদের বিভিন্ন দাবি আদায় আর উৎপাদন বৃদ্ধি ও আত্মনির্ভরশীল হিসেবে দাঁড় করানোর লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত শ্রমিকদল এখন অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর গ্রুপিংয়ে বিপর্যস্ত। বিগত দিনে বিএনপির আন্দোলন সংগ্রামে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালনে ব্যর্থ শ্রমিকদল শুধু দিবসভিত্তিক কর্মসূচি পালনেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। এমনকি শ্রমিকদের দাবি আদায়েও কার্যত কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। তবে মাঝে মধ্যে শ্রমিকদের সঙ্কটে ছুটে যান সভাপতি আনোয়ার হোসাইন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিএনপির আন্দোলনের মাঠে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা না থাকায় শ্রমিকদলের কর্মকাণ্ডে বিএনপির হাইকমান্ড নাখোশ। শ্রমিকদলের কাউন্সিল করার লক্ষ্যে দফায় দফায় সভা করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সর্বশেষ গত বছরের নভেম্বরে শ্রমিকদলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে বৈঠক করেন তিনি। কিন্তু সম্মেলন হয়নি। এরই মধ্যে গত মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শ্রমিকদলের নতুন আহ্বায়ক (আংশিক) কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে মহানগর কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে মহানগর শ্রমিকদলের বিদায়ী সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সাথে কোনো ধরনের আলোচনা করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। তৃণমূলের নেতারা জানান, ঢাকা মহানগর কমিটির আগে শ্রমিকদলের কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠন করা বেশি জরুরি ছিল। হঠাৎ করেই মহানগর কমিটিতে যাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তাদের যোগ্যতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। দলের কেন্দ্রীয় এক নেতা বলেন, বিদায়ী কমিটির সাথে আলোচনা করে নিলে ভালো হতো। নেতৃত্ব বদল হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু যোগ্য লোককে বাদ দিয়ে নতুন কাউকে পদে বসিয়ে দিলেই হয় না। এ বিষয়ে জানতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও শ্রমিকদলের প্রতিষ্ঠাতা নজরুল ইসলাম খানকে ফোন করা হলে রিসিভ করেননি।
জানা যায়, ২০১৪ সালের ১৯ ও ২০ এপ্রিল শ্রমিকদলের সর্বশেষে জাতীয় কাউন্সিল হয়। সম্মেলনে ৮০ ভাগের বেশি কাউন্সিলর নির্বাচনের মাধ্যমে কমিটি গঠনের দাবি উত্থাপন করলে গোলোযোগ হয়। ফলে সেখানে কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়নি। প্রায় পনেরো দিন পর ৫ মে আনোয়ার হোসাইনকে সভাপতি এবং নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে সাধারণ সম্পাদক করে ৩৪ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী হয়নি অভিযোগ তুলে শ্রমিকদলের বিরাট একটি অংশ বিদ্রোহ করে। তারা ওই বছরের ৭ জুন এ এম নাজিম উদ্দিনকে সভাপতি এবং আবুল খায়ের খাজাকে সাধারণ সম্পাদক করে ৩১ সদস্যবিশিষ্ট পাল্টা কমিটি ঘোষণা দেয়। পরে নাজিম উদ্দিন কমিটিতে না থাকায় আবুল হোসেনকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয়। এরপর শ্রমিকদলের দু’টি কমিটিই বৈধভাবে গঠিত হয়নি উল্লেখ করে শ্রম পরিদফতরের পরিচালক শ্রম আদালতে চিঠি দেন। ফলে শ্রমিকদলের উভয় কমিটিই অবৈধ!
এদিকে শ্রমিকদলের কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষপদে আলোচনায় আছেন বর্তমান সভাপতি মো: আনোয়ার হোসাইন, কার্যকরী সভাপতি সালাহউদ্দিন সরকার (বর্তমানে গাজীপুর মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক), কেন্দ্রীয় সহ-শ্রমবিষয়ক সম্পাদক মো: হুমায়ুন কবির খান, ফিরোজ উজ-জামান মামুন মোল্লা, সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবুল খায়ের খাজা, শ্রমিকদলের উপদেষ্টা ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদ্যসাবেক সভাপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রনেতা কাজী মো: আমীর খসরু, শ্রমিকদলের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু প্রমুখ। শ্রমিকদলে শীর্ষ পদপ্রত্যাশী হুমায়ুন কবির খান কালিয়াকৈর কলেজ সংসদের সাবেক ভিপি ও ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য। যিনি ৩০ বছর ধরে ট্রেড ইউনিয়নের সাথে জড়িত। বর্তমানে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় যুগ্মসম্পাদক এবং তার নামে দেড় শতাধিক মামলা। তিনি বলেন, আমি আজীবন দলের কর্মী হিসেবেই থাকতে চাই। দল আমার কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করে যখন যেখানে দায়িত্ব দিবে সেটা মেনেই কাজ করব। সত্যিকারার্থে শ্রমিকদলের একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় কমিটি হওয়া দরকার। যেই কমিটি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ও দেশনায়ক তারেক রহমানের দেশে ফেরা এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে।
নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নেতা কাজী আমীর খসরু বলেন, যত দ্রুত সম্ভব শ্রমিকদলের জাতীয় কাউন্সিল হওয়া উচিত। আমি আট বছর ধরে ঢাকা মহানগর দক্ষিণে শ্রমিকদলকে সংগঠিত করেছি। কারাবন্দী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীদের সাধ্যমতো খোঁজখবর নিয়েছি। দল যখন যেখানে দায়িত্ব দিবে আমি কাজ করতে প্রস্তুত। তিনি জানান, শ্রমিকদলের কেন্দ্রীয় কমিটি সভা শেষে রেজুলিউশনের মাধ্যমে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মহোদয়কে কমিটি গঠনের বিষয়ে সার্বিক দায়িত্ব প্রদান করেছে। মাননীয় চেয়ারম্যান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও শ্রমিকদলের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি নজরুল ইসলাম খান ও মহাসচিবসহ সিনিয়র নেতাদের সাথে পরামর্শ করে যাকে খুশি তাকে দিয়ে কমিটি গঠন করতে পারেন। এই ক্ষমতা তার রয়েছে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-শ্রমবিষয়ক সম্পাদক ফিরোজ উজ-জামান মামুন মোল্লা বলেন, শ্রমিকদলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদোত্তীর্ণ। আসলে মেয়াদহীন কমিটি দিয়ে সংগঠন চলে না। তৃণমূলকে চাঙ্গা রাখা ও তাদের মাঝে উদ্দীপনা তৈরি করতে হলে এখন নতুন কমিটি দরকার। এসব বিষয়ে সার্বিক দায়িত্ব বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে দেয়া হয়েছে। তিনিই কাউন্সিল বা নতুন কমিটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।
শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইন নয়া দিগন্তকে বলেন, আমাদের বর্তমান কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ। একাধিকবার উদ্যোগ নিয়েও কাউন্সিল করতে পারিনি। যেকোনো সময় সম্মেলন করতে চাই।