দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চালিয়ে চাকরি হারানো কর্মকর্তা উপসহকারী পরিচালক শরীফ উদ্দিনের প্রশ্ন দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত নির্দেশিকা মতো কাজ না করলে বড় বড় ঘটনার তদন্তভার আমাকে কিভাবে দেয়া হলো? যদি নিয়মের ব্যত্যয় ঘটাতাম সাত বছর চাকরি করতেই তো পারতাম না।
দুদক সচিব মাহবুব হোসেন রোববার সংবাদ সম্মেলনে উপসহকারী পরিচালক শরীফ উদ্দিনকে চাকরি থেকে অপসারণের কারণ হিসেবে যে ১৩টি অভিযোগ তুলে ধরেন। সেসব অভিযোগ সত্য নয় বলে দাবি করেছেন শরীফ উদ্দিন। নয়া দিগন্তকে তিনি বলেন, প্রতিটি অভিযোগের বিরুদ্ধে তথ্য প্রমাণ রয়েছে। আমি কোনো ধরনের অনৈতিক কাজ বা অপরাধ করিনি।
শরীফ বলেন, যাদের দুর্নীতি বা অবৈধ সম্পদের তদন্ত করেছি, তারা আমাকে অনেকভাবে হুমকি ও প্রলোভন দিচ্ছিল। কানাডায় বাড়ি কিনে দেবে, নগদ কোটি টাকা দেবে, এমন সব প্রলোভনের পরেও আমি কাউকে ছাড় দিইনি। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছি, তাদের নাম তদন্ত প্রতিবেদনে অন্তভর্ুুক্ত করেছি। এ ক্ষেত্রে আমি কোনো অনিয়ম করিনি।
সচিবের অভিযোগ, তদন্তের সময় অভিযুক্তকে ডেকে এনে হয়রানি ও নির্যাতন করতেন শরীফ। এ প্রসঙ্গে চাকরিচ্যুত শরীফ বলেন, এটি কোনোভাবেই সত্য নয়। যদি এ ধরনের তথ্য প্রমাণ থাকে তা উপস্থাপনের অনুরোধ রইল। আর হয়রানি করলে তদন্ত করে আমাকে বিচারের আওতায় আনার অনুরোধ রইল। তিনি বলেন, অভিযোগকারী কিন্তু তারাই যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অনুসন্ধান করে প্রমাণ পেয়েছি ও মামলার সুপারিশ করি। আমি যদি নির্যাতন ও হয়রানি করে থাকি তাহলে তদন্তকালীন কেন অভিযোগ করা হয়নি? যখনই আমাকে রুটিন বদলি করা হলো, এরপরই একে একে দুদকে অভিযোগ দিতে শুরু করে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা।
শরীফ জানান, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ইদ্রিস নামে এক ব্যবসায়ীকে রিমান্ডে নির্যাতন করেছেন। এই অভিযোগের বিষয়ে তদন্তকারী দুদকের একজন কর্মকর্তা চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেন, যেখানে ইদ্রিসের চিকিৎসা চলছিল। সেখানের মেডিক্যাল অফিসার মো: মমিন উল্লাহ ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পক্ষ থেকে দুদককে জানানো হয় যে, ইদ্রিসকে নির্যাতনের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
দুদক সচিব অভিযোগ করেছেন, শরীফ উদ্দিন জব্দ করা টাকা নিজের কাছে রেখেছেন। এ প্রসঙ্গে শরীফ বলেন, ৯৩ লাখ ৬০ হাজার ১৫০ টাকা সরকারি কোষাগারে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগাযোগ করেছিলাম। ব্যাংক থেকে জানানো হয় জব্দ করা টাকা আসল কিনা তা যাচাই করে নিরাপত্তা জামানত কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে সিলগালা অবস্থায় জমা দিতে। এ প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হওয়ায় বদলি হওয়ার পরে টাকাগুলো যথাযথ কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দিয়ে আসি। আমার ডিডি স্যারও এটা জানতেন। আর জব্দ তালিকায় এ টাকার কথা উল্লেখ থাকায় অন্য কোনো উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের সুযোগ নেই। টাকা অফিসেই ছিল, আমার বাসায় না। দুদকের বিভিন্ন অফিসেও এটি করা হয়ে থাকে বলে জানান।
ব্যাংক হিসাব স্থগিতে নিয়ম না মানার অভিযোগ আনেন দুদক সচিব। এ বিষয়ে শরীফ বলেন, আদালতে আবেদন করার আগে দুদক থেকে অনুমতি নিতে হবে। এটি সময়সাপেক্ষ। আসামি যাতে তড়িঘড়ি করে টাকাগুলো উত্তোলন করতে না পারেন, সে জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নিতে তিনি ব্যাংক ব্যবস্থাপককে চিঠি দেন। টাকাগুলো তো আমি ব্যবহার করিনি। সরল বিশ্বাসেই তা করেছি এবং সেটি রাষ্ট্রের স্বার্থে। এটি না করলে এই টাকা তছরুপ হতো। তার প্রতিবেদনে এটি উপস্থাপন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
রোহিঙ্গাদের এনআইডি ও পাসপোর্ট প্রদান বিষয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শরীফ উদ্দিন। তার দাবি, তিনি গণমাধ্যমে এ ধরনের কথা কখনোই বলেননি। ছয় সদস্যের ওই কমিটিতে তিনি অর্পিত দায়িত্ব পালন করেন এবং সম্মিলিতভাবে জালিয়াতি উদঘাটন করেন।
কক্সবাজারে জমি অধিগ্রহণের তদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে শরীফ বলেন, ২০১৯ সালে ওই জমি অধিগ্রহণ কেলেঙ্কারিতে ১৫৫ জনের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি অভিযোগপত্র দুদকে জমা দেই। যে তিনজন কমিশনে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছেন, তাদের নাম ওই ১৫৫ জনের ভেতর আছে। দুদক ওই অভিযোগপত্রগুলো অনুমোদন না দিয়ে পুনঃতদন্তের নির্দেশ দেয়। এর কোনো কারণও দেখানো হয়নি।
চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য খাত নিয়ে অভিযোগ প্রসঙ্গে শরীফ উদ্দিন বলেন, যারা দুর্নীতি করে অর্থ উপার্জন করছিল, তারা আমাকে অনেকভাবে হুমকি ও প্রলোভন দিচ্ছিল। কানাডায় বাড়ি কিনে দেবে, নগদ কোটি টাকা দেবে, এমন সব প্রলোভনের পরেও আমি কাউকে ছাড় দিইনি। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছি, তাদের নাম তদন্ত প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করেছি।
পটুয়াখালীতে বিলম্বে যোগদানের বিষয়ে শরীফ উদ্দিন বলেন, ২০২১ সালের ১৮ ও ১৯ জুলাই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার কারণে আমি শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলাম, যা চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন প্রত্যয়ন করেছেন। তবে ১৪ জুলাই ই-মেইলের মাধ্যমে আমার যোগদানপত্র এবং আর্টিকেল ৪৭ পটুয়াখালীর অফিসে প্রেরণ করি। দুদক এসব যাচাই করে সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছে। লকডাউন ও ১৮ জুলাই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার কারণে বদলিকৃত কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারিনি। এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল না।
নথি জমাদানে সময়ক্ষেপণের অভিযোগ প্রসঙ্গে শরীফ বলেন, ২০২১ সালের ৩০ আগস্টের মধ্যে তার কাছে থাকা ৯৩ লাখ টাকা, ওই মামলা সংক্রান্ত ৫৮৯ পাতার প্রতিবেদনসহ ১২০ সিডি, সাত বস্তা আলামত, পাঁচ হাজারের অধিক মূল আবেদন ১০ হাজার পাতার অধিক রেকর্ড, রোহিঙ্গা এনআইডি ও পাসপোর্ট সিরিজের ১৮ মামলার নথি, কেজিডিসিএলের বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ৪০০ পাতার অনুসন্ধান প্রতিবেদনসহ পাঁচ হাজার পাতার অধিক রেকর্ড ও আলামত চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ সংক্রান্ত অনিয়মের জব্দ করা ১২০০ পাতার আলামতসহ বিভিন্ন নথি তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটিকে বুঝিয়ে দিয়ে এসেছেন।
শরীফ উদ্দিনের দাবি তাকে অন্যায়ভাবে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়েছে। তাকে অপসারণের ক্ষেত্রে সংবিধান লংঘন করা হয়েছে। সংবিধানের ১৩৫ ধারায় আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া হয়েছে। শরীফ দাবি করেছেন, দুদক তাকে সেই সুযোগ দেয়নি। এখন তিনি ন্যায় বিচার প্রার্থনা করে আদালতের দ্বারস্থ হবেন।
প্রসঙ্গত, একের পর এক দুর্নীতি বিরোধী অভিযান চালিয়ে আলোচনায় আসা দুদকের উপসহকারী পরিচালক মো: শরীফ উদ্দিনকে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়। দুদক কর্মচারী চাকরি বিধিমালা ২০০৮ এর ৫৪(২) বিধি অনুযায়ী দুদক চেয়ারম্যান মো: মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ, শরীফ উদ্দিনকে চাকরি থেকে অপসারণ করেন। তিনি সবশেষ দুদকের পটুয়াখালী সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন।