বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামে সামনের সারিতে থাকা জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় ভেঙে পড়েছে চেইন অব কমান্ড। বিশেষত শীর্ষ নেতৃত্বের সাংগঠনিক অদক্ষতা ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে সংগঠনের তৃণমূলে হ-য-ব-র-ল অবস্থা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলদের অসৌজন্যমূলক আচরণে সংগঠন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক কর্মীরা। ফলে নেতৃত্বের সঙ্কট বাড়ছে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন মহিলা দলে। এমতাবস্থায় দ্রুত সময়ের মধ্যে ছাত্রদলের সাবেক নেত্রীকে অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন কমিটি গঠনের দাবি জানাচ্ছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। যদিও মহিলা দলকে পুনর্গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও বেগম সেলিমা রহমানকে নতুন কমিটি গঠনের দায়িত্ব দিয়েছেন। ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর আফরোজা আব্বাসকে সভাপতি ও সুলতানা আহমেদকে সাধারণ সম্পাদক করে মহিলা দলের নতুন আংশিক কমিটি দেয় বিএনপি। এখন মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়েই চলছে সংগঠনটি। সময়ের ব্যবধানে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে সংগঠনের কার্যক্রম একেবারেই স্থবির। অন্য দিকে ছাত্রদলের সাবেক নেত্রীদের বাদ দিয়ে ও কোণঠাসা রেখে বিতর্কিতদের পদায়নের মাধ্যমে পুরো মহিলা একটি সিন্ডিকেটের কবলে আটকা পড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন তৃণমূলের একাধিক নেতাকর্মী।
জানা গেছে, ২০১৯ সালে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পরপরই বিএনপির হাইকমান্ড মহিলা দলের নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেন। কিন্তু আকস্মিকভাবে সেই প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। তিন বছর পর ২০১৯ সালের ৪ এপ্রিল সংগঠনটির ২৬৫ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। সে কমিটিরও মেয়াদ শেষ হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে- কেন্দ্রীয় কমিটির অনেক নেত্রীকে সম্পাদক পদ দেয়া হয়েছে যাদেরকে কেউ চেনেন না। তাদের অনেকেই বিগত দিনে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না। শুধু সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তাদেরকে পদ দেয়া হয়েছে। সারা দেশের জেলা কমিটি গঠনেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের কমিটি নিয়েও বিতর্ক উঠেছে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণে আহ্বায়ক করা হয়েছে রুমা আক্তারকে। যিনি স্বশিক্ষিত এবং বিএনপির প্রভাবশালী একজন নেতার পরিবারের ঘনিষ্ঠ। অথচ তার অধীনে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক শাহীনুর নার্গিস ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী। এ রকম বেশ কিছু অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সংগঠনের এসব অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে ইতোমধ্যে মহিলা দলের রাজনীতি থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী ও সাবেক এমপিদের বেশির ভাগ অংশ। এবার তাদেরকে সক্রিয় করতে নতুন উদ্যমে গুরুত্বপূর্ণ এই সংগঠনকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
জানতে চাইলে স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, মহিলা দলের কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। তবে তারা এখন জেলা কমিটিগুলো করছে। নতুন কমিটি গঠন করা হবে। এটা প্রক্রিয়ার ব্যাপার।
জানা গেছে, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে মহিলা দলে নেতৃত্ব দিয়েছে ড. আমেনা রহমান, সারোয়ারি রহমান, ঢাকার নওয়াব স্যার খাজা সলিমুল্লাহর নাতি সামসুন নাহার খাজা আহসানুল্লাহ, অধ্যাপক জাহানারা বেগম, ১৯৫৬ সালে কুমুদিনি কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক খুরশিদ জাহান হক (চকলেট), বেগম সেলিমা রহমান, নূর-এ-আরা সাফাদের মতো নেত্রী। যাদের সবাই বনেদি পরিবারের সদস্য এবং উচ্চ শিক্ষিত ও মার্জিত হিসেবে খ্যাতি ছিল। পরে নব্বই দশকের ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী শিরিন সুলতানাকেও মহিলা দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ দেয়া হয়। কিন্তু ২০১৬ সালে যাদের কাছে এই সংগঠনের দায়িত্ব দেয়া হয় তাদের অনেকেরই ছাত্ররাজনীতি করার অতীত ইতিহাস যেমন নেই তেমনি অনেকের শিক্ষাগত যোগ্যতা, সামাজিক অবস্থান নিয়েও যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের সহধর্মিণী। অন্য দিকে সুলতানা আহমেদ ২০০৪ সালে বিএনপিতে যোগদানের আগে দলের কোনো পদে ছিলেন না। ২০০৫ সালে সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি হন তিনি। ওই সময়ে তার হলফনামায় স্বশিক্ষিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তাদের নেতৃত্বাধীন কমিটিতে সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক করা হয় ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী হেলেন জেরিন খানকে। কিন্তু তাকে কৌশলে কোণঠাসা করা হয়েছে। ফলে দাপুটে নেত্রী হেলেন অভিমানে তেমন একটা কর্মসূচিতে আসেন না। ছাত্রদলের সাবেক নেত্রীদের মতে- মহিলা দলের কমিটি ঘোষণার পরই সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। দুইজনের অনুসারীদের একাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এই দ্বন্দ্ব নিরসনে একাধিকবার উদ্যোগ নেয়া হলেও তা সফল হয়নি। তারা বলেন, দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। কিন্তু এখন মহিলা দলের যে অবস্থা তাতে শিক্ষিত, মার্জিত আর সমাজের গ্রহণযোগ্য হিসেবে যারা পরিচিত তারা সবাই ঘরের মধ্যে ঢুকে গেছেন। মান-ইজ্জতের ভয়ে এখন আর তারা সক্রিয় রাজনীতি করতে চান না। গার্মেন্ট আর বস্তি থেকে উঠিয়ে এনে কমিটি দেয়া হচ্ছে। সুতরাং মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে যোগ্য ও ত্যাগী এবং নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে দ্রুত নতুন কমিটি গঠনের দাবি তাদের।
২০২১ সালের নভেম্বরে সারা দেশে মহিলা দলকে সংগঠিত করতে ১০টি সাংগঠনিক টিম করে কেন্দ্রীয় কমিটি। কিন্তু কাগজে-কলমে এসব সাংগঠনিক টিম গঠন করা হলেও সব ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক কুক্ষিগত করে রাখেন। প্রত্যেক জেলায় কর্মী সম্মেলনে তাদেরকে রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে সাংগঠনিক টিম স্বাধীনভাবে কোনো কাজ করতে পারছেন না। অভিযোগ রয়েছে- প্রত্যেক জেলায় সম্মেলন কিংবা কমিটি গঠনের নামে কেন্দ্রীয় নেতারা ওই সব এলাকায় কর্মিসভা তো নয় পিকনিক ও ভুঁরিভোজের আয়োজন করেন। সম্প্রতি ফেনীতে এ রকম একটি ঘটনায় যথেষ্ট বিতর্কের জš§ দেয়। কমিটি গঠনেও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ রয়েছে বিএনপির কেন্দ্রীয় দফতরে। প্রায় প্রত্যেক দিনই বিভিন্ন জেলা কিংবা সাংগঠনিক ইউনিটের ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীরা কার্যালয়ে এসে অভিযোগ জানান। কিন্তু মহিলা দলের শীর্ষ দুই নেত্রীর রোষানলে পড়ার ভয়ে কেউ মুখ খুলতে নারাজ।
এসব বিষয়ে জানতে মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাসকে একাধিকবার ফোন করলেও রিসিভ করেননি। তবে সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহম্মেদ দুই একটি অভিযোগের কথা স্বীকার করে নয়া দিগন্তকে বলেন, কমিটির মেয়াদ তিন বছর। বর্তমানে মেয়াদোত্তীর্ণ। বড় সংগঠনে কিছু এ দিক সে দিক হতেই পারে। আর নতুন কমিটির আলোচনা তিনি জানেন না।
নতুন কমিটিতে আলোচনায় যারা : আগামীতে মহিলা দলের নতুন কমিটিতে আলোচনায় আছেন বর্তমান সেক্রেটারি সুলতানা আহম্মেদ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা, সাবেক এমপি রেহানা আক্তার রানু, নাজমুন্নাহার বেবি, হেলেন জেরিন খান, নিলোফার চৌধুরী মনি, নেওয়াজ হালিমা আর্লি, বিলকিস ইসলাম, রোখসানা খানম মিতু, শাম্মী আক্তার, ঢাকা মহানগরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফরিদ ইয়াসমিন, আয়েশা সিদ্দিকা মানি, মমতাজ হোসেন লিপি প্রমুখ।