আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আদায়ের লক্ষ্যে নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছে বিএনপি। বিশেষ করে সরকার নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে সমঝোতায় না এলে একটি জোরদার আন্দোলনকে গুরুত্ব দিচ্ছে দলটির হাইকমান্ড। সেইসাথে কেন্দ্রসহ তৃণমূল সংগঠনকে গুছিয়ে সুসংগঠিত করছে দলটি। বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে নতুনভাবে দ্রুত পুনর্গঠন করা হচ্ছে। জানা গেছে বিএনপির ৮১টি সাংগঠনিক জেলা ইউনিটের কমিটি হালনাগাদকার্যক্রম চলমান আছে। বেশির ভাগ জেলায় মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে নতুনভাবে কমিটি দেয়া হচ্ছে। একইভাবে যেসব উপজেলা কমিটিও মেয়াদোত্তীর্ণ সেগুলোও ভেঙে নতুনভাবে পুনর্গঠনপ্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে সারা দেশেই সিরিজ কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি ও এর বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন। প্রায় ১০ লাখ লিফলেট ছাপিয়ে তা বিতরণ করা হচ্ছে। জানা গেছে, সারা দেশে বিএনপির ৮১টি সাংগঠনিক জেলা শাখা রয়েছে। এসবের মধ্যে অন্তত ৩০টির বেশি জেলার কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ। বাকি শাখাগুলোতে আহ্বায়ক কমিটি দেয়া হচ্ছে। যেসব জেলায় আহ্বায়ক কমিটির পর সম্মেলনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়েছে সেগুলো বাদ থাকছে। বিএনপির কেন্দ্রীয় দফতরের তথ্য মতে- সারা দেশে ৮১টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে নতুন করে আহ্বায়ক কমিটি দেয়া হয়েছে প্রায় ৪৫টিতে। আংশিক কমিটি আছে ১২ জেলায়। পূর্ণাঙ্গ কমিটি আছে ৩০টিরও বেশি জেলায়। দলের শৃঙ্খলা ফেরাতে কাউন্সিলের মাধ্যমে সব সাংগঠনিক জেলায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে চায় বিএনপি। একইভাবে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও নেতৃত্ব নির্বাচিত করতে চায় দলটি।
মূলত ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পর দল গোছানোর কার্যক্রম শুরু করে বিএনপি। গত তিন বছরে ৪৫টি জেলায় আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। এর মধ্যে ৩০টির বেশি জেলার কমিটির নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলেও এখন পর্যন্ত সব পর্যায়ের কমিটি গঠন করতে পারেনি। জেলা পর্যায়ে আহ্বায়ক কমিটি নিয়ে চিন্তিত দলটি। নির্ধারিত সময়ে প্রায় সব সাংগঠনিক জেলা পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিতে পারেনি। নির্ধারিত সময়ে থানা-উপজেলার সব পর্যায়ের কমিটি দিতেও ব্যর্থ দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। আবার যেসব জেলা তৃণমূল পুনর্গঠনের কাজে হাত দিয়েছে, তাদের বেশ কয়েকটির বিরুদ্ধেই নানা অভিযোগ পড়েছে কেন্দ্রে।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী গতকাল সন্ধ্যায় নয়া দিগন্তকে বলেন, দলের কমিটি গঠন বা হালনাগাদ একটি চলমানপ্রক্রিয়া। সারা দেশে পুরোদমে দল পুনর্গঠনকার্যক্রম চলছে। অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোও পুনর্গঠন হচ্ছে। সেই সাথে আগামীতে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনের প্রস্তুতিও নেয়া হচ্ছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব ইনশাআল্লাহ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিভিন্ন মহানগর ও জেলায় কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে ছাত্রদলের সাবেক নেতা- নেত্রীদেরকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। যার প্রমাণ মিলেছে কৃষক দল, ঢাকা মহানগর মহিলা দলসহ বেশ কয়েকটি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে। দল গঠন-পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে গত ১১ ফেব্রুয়ারি জাতীয়তাবাদী মহিলা দল ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের ১০ সদস্যবিশিষ্ট আংশিক কমিটি ঘোষণা করেছে বিএনপি। গত ৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারপর খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই তা পূর্ণাঙ্গ করা হয়েছে। এ ছাড়া গত ২৮ ফেব্রুয়ারি খুলনা মহানগর বিএনপির ৭১ সদস্যবিশিষ্ট আংশিক কমিটি দেয়া হয়েছে। তা ছাড়া বরিশাল মহানগর বিএনপির কমিটিও নতুনভাবে ঘোষণা করা হয়েছে।
দলটির নেতাকর্মীরা জানান, দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি এখন সংগঠন গোছানোয় ব্যস্ত। আগামীতে নির্দলীয় নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে সম্ভাব্য আন্দোলন সংগ্রামকে বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো কাউন্সিলের মাধ্যম পুনর্গঠন করে শক্তিশালী ও সুসংহত করা হচ্ছে। এই মুহূর্তে সরকারবিরোধী কঠিন আন্দোলনে না নামলেও সুবিধামতো সময়ে বিএনপি ফের ঐক্যবদ্ধভাবে চূড়ান্ত আন্দোলনে যাবে বলে দলটির সিনিয়র নেতারা জানিয়েছেন। সেই লক্ষ্যেই গত বছরের শেষ দিকে দলের নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টা, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, যুগ্ম মহাসচিব, সম্পাদকমণ্ডলীর মতামত নিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
২০১৬ সালের ১৯ মার্চ ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের পর দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি ঘোষণা করা হয় ওই বছরই ৬ আগস্ট। এরপর ধাপে ধাপে বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগরীর কমিটি ঘোষণা করা হয়। ইতোমধ্যে ঢাকা মহানগর বিএনপি, যুবদল ও কৃষক দলের কেন্দ্রীয় নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। তবে অন্যতম অঙ্গসংগঠন যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, শ্রমিক দল, তাঁতীদল, মৎস্যজীবী দল এবং ওলামা দলের কমিটিও মেয়াদোত্তীর্ণ। যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটি যেকোনো সময় বিলুপ্ত করা হতে পারে। আর ছাত্রদলও গত ১৯ সেপ্টেম্বর দুই বছর মেয়াদ পূর্ণ করেছে। দীর্ঘ ২৩ বছর পর গত বছর ২০ সেপ্টেম্বর কৃষক দলের সাত সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় আংশিক ও পরে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া গত বছর ১২ আগস্ট জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি বিলুপ্তির পর নতুন কমিটি করেছে বিএনপি। এখন জেলা কমিটি গঠন করছে জাসাস।
যুবদল : ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি রাতে সাইফুল আলম নীরবকে সভাপতি ও সুলতান সালাউদ্দিন টুকুকে সাধারণ সম্পাদক করে যুবদলের পাঁচ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়। এই কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ। এরই মধ্যে ২০২০ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি আবারো ১১৪ সদস্যের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি (আংশিক) ঘোষণা করা হয়।
স্বেচ্ছাসেবক দল : ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর শফিউল বারী বাবুকে সভাপতি এবং আবদুল কাদির ভুঁইয়া জুয়েলকে সাধারণ সম্পাদক করে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাত সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি (আংশিক) ঘোষণা করা হয়। ২০১৯ সালের অক্টোবরের মধ্যেই সব পর্যায়ে কমিটি গঠন করে নতুন কমিটির হাতে দায়িত্ব হস্তান্তরের নির্দেশনা ছিল। মেয়াদ শেষের এক বছর পর ২০২০ সালে ১৯ সেপ্টেম্বর ফের ১৮৬ সদস্যের আংশিক কমিটি দেয়া হয়। সর্বশেষ গত ১৫ ফেব্রুয়ারি স্বেচ্ছাসেবক দলের তৃণমূল পুনর্গঠনের সময় বেঁধে দেন তারেক রহমান। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদির ভুঁইয়া জুয়েল বলেন, তৃণমূলের প্রায় সব কমিটি দেয়া হয়েছে। মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি বাকি আছে। তারা খুব দ্রুত সেগুলো ঘোষণা করবেন।
মহিলা দল : ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর আফরোজা আব্বাসকে সভাপতি ও সুলতানা আহমেদকে সাধারণ সম্পাদক করে পাঁচ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর আর কাউন্সিল করতে পারেনি। ২০১৯ সালের ৪ এপ্রিল সংগঠনটির ২৬৫ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়।
শ্রমিক দল : ২০১৪ সালের ১৯ ও ২০ এপ্রিল জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের জাতীয় কাউন্সিল হয়। এই কমিটিও মেয়াদোত্তীর্ণ। খুব দ্রুত কেন্দ্রীয় কমিটি দেয়া হবে। এ ক্ষেত্রে শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় নেতা হুমায়ুন কবির, কাজী আমীর খসরু, মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু নতুন কমিটিতে থাকার সম্ভাবনা প্রবল।
তাঁতী দল : ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল আবুল কালাম আজাদকে আহ্বায়ক, মো: মজিবুর রহমানকে সদস্যসচিব করে ১২৮ সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়।
মৎস্যজীবী দল : ২০১৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম মাহতাবকে আহ্বায়ক ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক নেতা আব্দুর রহিমকে সদস্যসচিব করে ১৫৪ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়।





