বান্দরবানে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে পাহাড়ি সশস্ত্র গ্রুপগুলোর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘাত কিছুতেই থামছে না। একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এলাকার লোকজন আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। পার্বত্য জনসংহতি সমিতি ও মগ লিবারেশন পার্টির মধ্যে আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজি নিয়ে খুন অপহরণ ও হত্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে বান্দরবানে। রোয়াংছড়িতে জনসংহতি সমিতির চাঁদা কালেক্টর উনুমং মারমাকে হত্যার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই রুমা-রোয়াংছড়ি সীমান্তের সাঙ্গু নদীপথের কান্নান পাড়ার কাছে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গুলিতে প্রতিপক্ষ গ্রুপের চারজন নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। গত শনিবার দুপুরে সশস্ত্র সন্ত্রাসী দল সাঙ্গু নদী পথে কলমা চাং হয়ে রুমার পাইন্দু ইউনিয়নের কান্নান পাড়ায় যাওয়ার সময় অপর একটি গ্রুপ হামলা চালালে ঘটনাস্থলে ওই চারজন মারা যায়। নিহতদের পরিচয় জানা না গেলেও এরা সবাই মগ লিবারেশন পার্টির সদস্য বলে স্থানীয় লোকজন ও নিরাপত্তা বাহিনী সদস্যরা ধারণা করছেন।
ঘটনার খবর পেয়ে গতকাল রোববার দুপুরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা গিয়ে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সন্ধ্যায় বান্দরবান সদর হাসপাতালে নিয়ে আসে। শনিবার বেলা ২টার দিকে সাঙ্গু নদী পথের রোয়াংছড়ি উপজেলার তারাছা ইউনিয়নের ফাইসসা ঝিড়ি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ দিকে ঘটনার পর ওই এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। ভয়ে অনেকেই পাড়া ছেড়ে নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে। থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে আশপাশের বেশ কয়েকটি পাড়ায়।
যেভাবে ঘটল এ ঘটনা : শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রোয়াংছড়ি উপজেলার তারাছা ইউনিয়নের নতুন পাড়ায় একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী হানা দিয়ে জনসংহতি সমিতির চাঁদা কালেক্টর উনুমং মারমাকে গুলি করার পর আহত অবস্থায় তাকে ধরে নিয়ে যায়। এখনো তার কোনো খোঁজ মেলেনি। এ দিকে এ ঘটনার পর বেলা ২টার দিকে একটি সশস্ত্র গ্রুপ ইঞ্জিন বোট নিয়ে সাঙ্গু নদী পথে পাইন্দুর কান্নান পাড়ার দিকে যাওয়ার সময় আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকা প্রতিপক্ষ গ্রুপ তাদের ওপর অস্ত্র নিয়ে অতর্কিত হামলা করে। এতে নদীর পাড়ে ঘটনাস্থলেই চার সন্ত্রাসী নিহত হয়। এদের মধ্যে তিনজনের লাশ নদীর পাড়ে ও একজনের লাশ মাটিতে পুঁতে রাখা অবস্থায় উদ্ধার হয়। স্থানীয় লোকজন গতকাল সকালে লাশ দেখতে পেয়ে নিরাপত্তা বাহিনীকে খবর দেয়। পরে দুপুরে রোয়াংছড়ি থেকে সেনাবাহিনী ও পুলিশ গিয়ে লাশগুলো উদ্ধার করে। প্রতিটি লাশের গায়ে বেশ কয়েক রাউন্ড গুলির চিহ্নহ্ন ছিল। ঘটনাস্থল থেকে গুলির খোসা, বাণ্ডুলা, ওয়াকিটকি সেটসহ বেশ কিছু সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। ওই এলাকার মংউ খুমি পাড়ার বাসিন্দা লুকিং খুমি ও মারমা পাড়ার কেতাঅং প্রু জানান, তারা দুপুরে বেশ কয়েক রাউন্ড গুলির আওয়াজ শুনেছেন। কিন্তু ভয়ে কেউ ওই এলাকায় যাননি। পরে নদীর ঘাটে লাশ দেখতে পেয়ে তারা নিরাপত্তা বাহিনীকে খবর দেন।
নিহতদের পরিচয় জানা যায়নি : নদীর পাড়ে চার সন্ত্রাসীর লাশ পড়ে থাকলেও কেউ তাদের সম্পর্কে বলতে পারছে না। নিহতদের একজনের শরীর ট্যাটু করা রয়েছে। তাদের পরনে ছিল সেনাবাহিনীর রঙের পোশাক। শরীরে বাণ্ডুলা। ওই এলাকায় ওয়াকিটকি সেটসহ সরঞ্জাম পাওয়া গেলেও কোনো অস্ত্র পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে হামলাকারীরা সেসব লুট করে নিয়ে গেছে। স্থানীয়রা বলছেন, নিহতদের দেখে তারা মগ লিবারেশন পার্টির সদস্য বলে ধারণা করছেন। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারাও বলছেন, তারা মগ লিবারেশন পার্টির সদস্য হতে পারে। তবে কারা তাদের ওপর হামলা করেছে এ ব্যাপারে এখনো কেউ স্পষ্ট করে জানাতে পারেনি। মগ লিবারেশন পার্টির সাথে জনসংহতি সমিতির দ্বন্দ্বের কারণে এ ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।
এ দিকে জেলা পুলিশ সুপার জেরিন আখতার গতকাল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, শনিবার দুপুরে এ ঘটনা ঘটলেও দুর্গম এলাকা ও স্থানীয় লোকদের আতঙ্কের কারণে একদিন পর এ ঘটনার কথা তারা জেনেছেন। ঘটনার খবর পাওয়ার পরেই সেখান থেকে চারজনের লাশ উদ্ধার করে আনা হয়। এরা মগ লিবারেশন পার্টির সদস্য হতে পারে বলে পুলিশ সুপার জানায়। সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর মধ্যে আধিপত্য বিস্তার রোধে পুলিশ মাঠপর্যায়ে আরো তৎপরতা বাড়িয়েছে বলেও তিনি জানান।





