‘আমি রোজাদার আমাকে মাইরেন না’ এমন আকুতি জানিয়েও চাঁদাবাজদের পিটুনি থেকে রক্ষা পাননি রিকশাচালক মো: আরিফ হোসেন (২৭)। ৫০ টাকা চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় তাকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয়েছে। আহত আরিফ থানায় অভিযোগ দিতে গেলে চাঁদাবাজরা চিকিৎসার নামে তাকে কৌশলে থানা থেকে অন্যত্র নিয়ে যায়। গতকাল দুপুরে গাজীপুর মহানগরের বোর্ড বাজার বাসস্ট্যান্ডে এ ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী রিকশাচালকরা জানান, আরিফ দুপুর ১২টায় যাত্রীবিহীন খালি রিকশা নিয়ে বটতলা রোড হয়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে প্রবেশ করছিলেন। এ সময় ওই পয়েন্টে নিয়মিত চাঁদা আদায়কারী অন্তর ও মিজান রিকশার গতিরোধ করে এবং তার কাছে ৫০ টাকা চাঁদা চায়। আরিফ চাঁদা আদায়কারীদের জানান, তিনি বটতলা রোডে রিকশা চালান না। অন্য রোড থেকে বটতলা রোড হয়ে মহাসড়কে যাচ্ছেন। কিন্তু এর পরও তার কাছে ৫০ টাকা চাঁদা চাওয়া হয়। তিনি চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় মিজান, অন্তরসহ চার-পাঁচজন তাকে লাঠি দিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করে। এ সময় ‘আমি রোজাদার, আমাকে মাইরেন না’ এমন আকুতি জানিয়েও চাঁদাবাজদের কবল থেকে তিনি রক্ষা পাননি। একপর্যায়ে চাঁদাবাজরা তাকে পিটিয়ে রিকশাটিও রেখে দেয়। নিরুপায় হয়ে তিনি স্থানীয় গাছা থানায় অভিযোগ দিতে যান। তিনি থানা ভবনের দ্বিতীয় তলার সিঁড়ি বেয়ে উঠার সময় চাঁদাবাজরা চিকিৎসার নামে তাকে কৌশলে অন্যত্র নিয়ে যায়।
ভুক্তভোগী রিকশাচালকরা অভিযোগ করে জানান, এলাকার প্রভাবশীলীদের নিয়োজিত এ চাঁদাবাজরা বিভিন্ন রোডে নিয়মিত চাঁদা আদায় করে। আলোচিত মিজান, অন্তর ও তাদের সহযোগীরা গাজীপুর মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম দীপের পক্ষ হয়ে রিকশা থেকে নিয়মিত চাঁদা ওঠায়। এ ছাড়া অন্যান্য এলাকায় সরকার দলীয় প্রভাবশালী নেতাদের নিয়োজিত ব্যক্তিরা নিয়মিত চাঁদা আদায়ে জড়িত।
রিকশাচালকরা আরো জানান, বটতলা রোডের বোর্ডবাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ইজিবাইক থেকে দৈনিক ৫০ টাকা, মোটাচাকার অটোরিকশা থেকে ২০ টাকা এবং চিকনচাকার অটোরিকশা থেকে ১০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হয়। একইহারে বটতলা রোডের ঝাজর বাইপাস মোড়, ঝাজর টু হারিকেন, ঝাজর টু তিন সড়ক, ঝাজর টু ধীরাশ্রম রেলগেট ও সাইনবোর্ড এলাকায় চাঁদা আদায় করা হয়। এ ছাড়া কলমেশ^র রোডে বোর্ডবাজার কেন্দ্রেীয় মসজিদ পয়েন্টে, বড় বাড়ি, তারগাছ ও বঙ্গবন্ধু কলেজ চৌরাস্তা মোড়ে বিভিন্ন হারে রিকশা থেকে চাঁদা আদায় করেন প্রভাবশালীরা। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মামুন কর্তৃক নিয়োজিত ডালিম ঝাজর এলাকায় চারটি রোডে রিকশা থেকে চাঁদা আদায় করেন। বোর্ডবাজার কেন্দ্রীয় মসজিদ স্ট্যান্ডে চাঁদা আদায় করেন সিদ্দিক নামে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরের এক নিকটাত্মীয়।
রিকশাচালক হরমুজ মিয়া বলেন, চাঁদাবাজরা আমাদের রক্ত চুষে খাচ্ছে। বহু কষ্ট করে রিকশা চালাই সংসার চালানোর জন্য। কিন্তু দিন শেষে গ্যারেজ মালিকের জমা ও রোডে জিপি (চাঁদা) দেয়ার পর কোনো কোনো দিন খালি হাতে বাসায় ফিরতে হয়। স্ত্রী-সন্তানরা যখন হাতের দিকে তাকিয়ে থাকে তখন নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়।
রিকশাচালক ফিরোজ মিয়া বলেন, বিভিন্ন পয়েন্টে দৈনিক ৭০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। রিকশা মালিকের জমা ২৫০ টাকা, রোডের চাঁদা ৭০ টাকা অর্থাৎ দৈনিক মোট ৩২০ টাকা খরচ বাধ্যতামূলক। কোনো দিন ৩০০ টাকাও কামায় হয় না। অনেক সময় মালিকের জমা বাকি থেকে যায়। এঅবস্থায় সংসার চালানো তো দূরের কথা নিজের পেট চালানোই দায়। তিনি বলেন, আমাদের কষ্টের কথা তুলে ধরুন, রোডে চাঁদা বন্ধ করুন, আমাদেরকে বাঁচান।