দীর্ঘদিন ধরে প্রায় নিষ্ক্রিয় বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটকে আগামী দিনের আন্দোলন ও নির্বাচনকে সামনে রেখে ফের সক্রিয় করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। জোটের শরিকদলের বেশির ভাগ নেতার অভিযোগÑ একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর থেকেই ২০ দলীয় জোটকে ঠিকমতো মূল্যায়ন করছে না বিএনপি। তবে রমজান মাসে ইফতার মাহফিলকে ঘিরে বহুদিন পর জোটের শীর্ষ নেতাদের ফের একমঞ্চে দেখা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে জোটের বিভিন্ন শরিকদের সাথে অনানুষ্ঠানিকভাবে বৈঠক সেরেছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। ফলে বিএনপির সাথে শরিকদের দূরত্ব ও ক্ষোভ অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। যদিও জোটের নেতারা মনে করতে পারেন না সর্বশেষ কবে বৈঠক হয়েছে? এমন পরিস্থিতিতে ২০ দলীয় জোটের কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নানামুখী কথা শোনা যাচ্ছে। ঈদুল ফিতরের পর ২০ দলীয় জোটের বৈঠক হতে পারে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। সেখানে সরকারবিরোধী আন্দোলন ও নির্বাচনে জয়ী হলে জাতীয় সরকারের রূপরেখাসহ সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও করণীয় নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। বিএনপির নীতিনির্ধারকরা নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে আন্দোলন এবং জাতীয় সরকার কিভাবে গঠন করা হবে তা নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। বিশ দল যুগপৎভাবে মাঠে থাকবে বলে জানা গেছে।
জানা যায়, ১৯৯৯ সালের ৬ জানুয়ারি বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ঐক্যজোট নিয়ে চার দলীয় জোট গঠিত হয়। পরে সাবেক প্রেসিডেন্ট মরহুম এইচ এম এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি জোট ছেড়ে গেলে নাজিউর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বে গঠিত নতুন দল বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) চার দলীয় জোটে সংযুক্ত হয়। চার দলীয় জোট ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এবং বিজয়ের পর সরকার গঠন করে। পরে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল চার দলীয় জোটের সাথে নতুন ১৪টি দলের সংযুক্তির মাধ্যমে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন জোরদার করতে বিএনপির নেতৃত্বে ১৮ দলীয় জোট গঠিত হয়। পরে আরো দু’টি রাজনৈতিক দল যুক্ত হলে জোটের পরিধি বেড়ে দাঁড়ায় ২০ দলে। এরপর জোটে আরো তিনটি দল যোগ দেয়। তবে ভাঙা-গড়ার প্রক্রিয়ায় এই জোটে এখন ২০টি দলই রয়েছে। অবশ্য জাগপা ও এলডিপির দু’টি করে অংশ জোটে রয়েছে।
জানা যায়, বর্তমানে ২০ দলীয় জোট বা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট কোনো জোটকেই তেমন প্রাধান্য দিচ্ছে না বিএনপি। ২০ দলীয় জোটে জামায়াতে ইসলামীকে ধরে রাখতে কৌশলী অবস্থান নিয়েছে দলটি। বর্তমান পরিস্থিতিতে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও সরকারকে বিদায়ে কয়েক মাস ধরে বৃহত্তর রাজনৈতিক জোট গঠনের চেষ্টা করছে বিএনপি। তারা ডান-বাম-ইসলামীসহ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে এক প্ল্যাটফর্মে আনার চেষ্টা করছে। ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটকে অক্ষুণœ রেখেই বৃহত্তর জোট গঠনে আগ্রহী বিএনপি। এ ক্ষেত্রে বিএনপির বৃহত্তর ঐক্য গঠনের উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও ২০ দলীয় জোটকে আরো সক্রিয় করার দাবি শরিকদের।
বিএনপি ও জোটের একাধিক নেতা জানান, গত ২০ এপ্রিল রাজনীতিকদের সৌজন্যে ইফতার মাহফিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিএনপি। কিন্তু কৌশলগত কারণে সেটি স্থগিত করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আপাতত ২০ দলীয় জোটেই থাকবে জামায়াতে ইসলামী। তারা স্বেচ্ছায় চলে গেলে আটকানো হবে না। ডান-বামসহ সরকারবিরোধী সব দল নিয়ে বৃহত্তর ঐক্য হলেও শুরুতেই একসাথে কর্মসূচি দেয়া হবে না। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারসহ নানা ইস্যুতে যুগপৎ কর্মসূচি হবে। পরে সবাই একমঞ্চ থেকে ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি ঘোষণা করবে।
এলডিপির মহাসচিব ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী ড. রেদোয়ান আহমেদ বলেন, একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজস্ব কিছু মতামত থাকলেও লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি-এলডিপি ২০ দলীয় জোটে আছে। ২০১২ সালের পর থেকে এলডিপি বর্তমান সরকারের অনেক লোভনীয় প্রস্তাবকে উপেক্ষা করে ২০ দলীয় জোটে রয়েছে। আগামীতে সরকার পতনের আন্দোলনেও থাকবে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে মন্ত্রীসহ বিভিন্ন অফার থাকলেও এলডিপি বেগম খালেদা জিয়ার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। এলডিপি সেদিন জোট ত্যাগ করলে ২০ দলীয় জোট ক্ষতিগ্রস্ত হতো। এলডিপি সরকারবিরোধী আন্দোলন ও খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনে সর্বদা বিএনপির পাশে ছিল। ২০১৮ সালের নির্বাচনে সরকারের অনেক লোভনীয় প্রস্তাব থাকলেও তা গ্রহণ করেনি। দুঃসময়ে আমরা বিএনপির পাশে থেকেছি। ভবিষ্যতেও থাকব। তিনি বলেন, ২০ দলীয় জোটকে উপেক্ষা করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনে আমাদের দ্বিমত থাকলেও বৃহত্তর স্বার্থে এলডিপি বিএনপির পাশে থেকেছে।
ড. রেদোয়ান বলেন, এই সরকার ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছে। এর বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশের সব মানুষ বিশ্বাস করে এই সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। তাই কেউ চায় নির্দলীয় সরকার, কেউ চায় নির্বাচনকালীন সরকার, কেউ চায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এলডিপি চায় জাতীয় সরকার। সবাই মত প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু সরকারবিরোধী আন্দোলনকারীরাই সিদ্ধান্ত নিবে এই সরকার কার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিদায় নিবে। তিনি আরো বলেন, খালেদা জিয়ার মুক্তি, তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় এলডিপি বিএনপির সাথে একমত। ইদানীং লক্ষ করছি বিএনপির কিছু নেতা এক দিকে জাতীয় ঐক্যর ডাক দিচ্ছেন অন্য দিকে ঐক্য বিনষ্টের জন্য বিভিন্ন সভা সমাবেশে আপত্তিকর বক্তব্য উপস্থাপন করছেন। একটি দল তাদের নিজস্ব বক্তব্য প্রকাশ করলে তারা সরকারের দোসর হয়ে যাবে জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে এ ধরনের বক্তব্য পরিহার করতে হবে।
জোটের শরিক ন্যাপ ভাসানীর চেয়ারম্যান আজহারুল ইসলাম বলেন, বিএনপি বৃহত্তর জোট গঠনে ব্যস্ত। অনেক দিন ২০ দলের বৈঠক হয় না। তবে ২০ দলকে সাথে নিয়েই বিএনপির বৃহত্তর জোট হওয়া উচিত। এলডিপির অপর অংশের মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বলেন, সামনের দিনে জোট আরো বেশি সক্রিয় ও ঐক্যবদ্ধ হবে। যদিও শরিকদের অনেকেই ব্যক্তিগত স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়াকে বাদ দিয়ে জনগণের স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। জাগপার সভাপতি খন্দকার লুৎফর রহমান বলেন, ৯০’র গণ-অভ্যুত্থানের মতো সর্বস্তরের জনগণকে সম্পৃক্ত করে গণ-আন্দোলনে বর্তমান সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করা হবে। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন কোনোভাবেই আর গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিশদলীয় জোটের নেতৃত্বে জাগপা ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে থাকবে।
জানতে চাইলে ২০ দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, সরকারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রাম সামনে রেখে ২০ দলীয় জোটকে কিভাবে আরো সক্রিয় করা যায় সে ব্যাপারে শরিকদের সাথে আলোচনা চলছে। আলোচনার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কার্যক্রম শুরু হবে।
যুগপৎ আন্দোলনে মাঠে থাকবে ২০ দলীয় জোট
দীর্ঘদিন ধরে প্রায় নিষ্ক্রিয় বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটকে আগামী দিনের আন্দোলন ও নির্বাচনকে সামনে রেখে ফের সক্রিয় করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। জোটের শরিকদলের বেশির...





