ডেনমার্কের রাজকুমারী ম্যারি এলিজাবেথ ডোনাল্ডসন শ্যামনগরের উপকূলবর্তী এলাকায় বসবাসরত জনগোষ্ঠীর ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। সমবেত প্রচেষ্টায় সব প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়া যাবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সাতক্ষীরায় বুধবার সকালে শ্যামনগর উপজেলার উপকূলবর্তী এলাকা পরির্দশনকালে পরিবর্তিত জলবায়ু পরিস্থিতির শিকার মুন্সিগঞ্জের কুলতলি গ্রামের নারীদের সাথে আলাপচারিতায় তিনি এমন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। লবণাক্ততা বৃদ্ধিতে ফসল উৎপাদন হ্রাস পেলেও খালখননের মাধ্যমে মিষ্টি পানি সংরক্ষণপূর্বক সবজিসহ কৃষি ফসল চাষ করে ওই অংশের উপকূলীয় নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার ঘটনাকে তিনি অনুকরণীয় হিসেবে উল্লেখ করেন।
এ সময় ডেনিস রাজকুমারী সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলবর্তী এ গ্রাম ঘুরে সিএনআরএসের (সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিস) বাস্তবায়নাধীন গভর্নেন্স ফর কোস্টাল রেজিলিয়েন্স প্রজেক্টের বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত হন। এ সময় তার সাথে ছিলেন ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত উইনি এসট্রাপ পিটারসেন, ডেপুটি রাষ্ট্রদূত লেনি ভলকারসেনসহ ডেনমার্কের এক মন্ত্রী ও দূতাবাস কর্মকর্তারা।
কুলতলি গ্রাম পরিদর্শনকালে রাজকুমারী কুলতলি খাল ঘুরে দেখেন এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিরূপ প্রভাবের শিকার পুষ্প রানী মণ্ডল, শিলা রানী, টুম্পা মণ্ডল, আরতী বালা ও হেমলতা মণ্ডলের সাথে কথা বলেন। এ সময় ম্যারি এলিজাবেথ ডোনাল্ডসন উপকূলীয় জনপদের এসব নারীর চরম প্রতিকূলতার সত্ত্বেও পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প শুনে রীতিমতো বিস্মিত হন। এ সময় রাজকুমারী তাদের সাথে বেশ কিছু সময় অতিবাহিত করার পাশাপাশি ছবি তোলেন।
এরপর রাজকুমারী দুর্যোগকালীন সময়ে স্থানীয়দের আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত কুলতলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম সাইক্লোন শেল্টার পরিদর্শন করেন। এ সময় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সরোজ কুমার মণ্ডল ফুল দিয়ে অতিথিকে বরণ করে নেন। এখান থেকে ম্যারি এলিজাবেথ বুড়িগোয়ালিনীর ভাঙনকবলিত দাতিনাখালী এলাকার উপকূল রক্ষা বাঁধ পরিদর্শন করেন এবং ভাঙনের শিকার কয়েকটি পরিবারের সাথে কথা বলেন।
দুপুরে মুন্সিগঞ্জের কলবাড়ী এলাকায় বরসা রিসোর্ট সেন্টারে মধ্যাহ্নভোজ গ্রহণের পর বেলা ৩টার দিকে তিনি মালঞ্চ নদী দিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করেন। এ সময় প্রায় ৩০ মিনিট ধরে তিনি বিশ্বখ্যাত সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল হিসেবে স্বীকৃত সুন্দরবনের কলাগাছিয়া এলাকার সৌন্দর্য উপভোগ করেন। বিকেলে মুন্সিগঞ্জ টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট মাঠ থেকে হেলিকপ্টারে রাজকুমারী শ্যামনগর ত্যাগ করেন।
রাজকুমারীর সাথে তাদের কী কথা হয়েছে জানতে চাইলে কুলতলি গ্রামের পুষ্প রানী মণ্ডল জানান কুলতলি খাল খননের ফলে এলাকায় মিষ্টি পানির জোগান বেড়েছে। খালের মিষ্টি পানির বদৌলতে এক ফসলের পরিবর্তে এখন দুটো ফসল হচ্ছে। এসব কথা রাজকুমারীকে বলা হয়েছে।
জগদীশ চন্দ্র মণ্ডল বলেন, রাজকুমারী ম্যারিকে এ অঞ্চলের ঝড়-সাইক্লোন-জলোচ্ছ্বাস ও দুর্যোগের সময়ে মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে আনার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছি। বাড়িঘর ছেড়ে মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে আসতে চায় না; কিন্তু যখন দুর্যোগের মুখে পড়ে অসহায় হয়ে পড়ে, তখনই তারা ছাগল-গরু নিয়ে ঝড়ের মধ্যে আশ্রয়কেন্দ্রে আসে। এলাকায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও আরো আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের দাবি জানানো হয়েছে ম্যারি এলিজাবেথের কাছে।
মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান অসীম কুমার মৃধা জানান, রাজকমাারী কুলতলি গ্রামে যেয়ে বেড়িবাঁধের উপর কিছুক্ষণ হাঁটেন ও আশ্রয়কেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করেন। পরে কুলতলি গ্রামের মানুষের সাথে কথা বলেন। গ্রামবাসী তাকে জানিয়েছে, দুর্যোগে ভঙ্গুর বাঁধের জন্য তারা প্রায় প্রতি বছর ঘরবাড়ি হারান। এ ছাড়া এলাকায় বেকারত্ব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে জানিয়ে তারা বলেন, চিংড়ি ঘেরে লোকবল কম লাগে। অপর দিকে মিষ্টি পানির অভাবে কৃষিব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। জলাভূমি খনন করে মিষ্টি পানির ব্যবস্থা করে এলাকায় কৃষিব্যবস্থা আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন চাষিরা।