তেজগাঁও রেজিস্ট্রি কমপ্লেক্স যেন কেরানি ও উমেদারদের নিয়ন্ত্রণে। জমির দলিলসহ যাবতীয় কাজই হচ্ছে তাদের হাত হয়ে। এই সিন্ডিকেটের দাপটে অসহায় রেজিস্ট্রি কার্যালয়ের কর্মকর্তারা। জমির দলিল, শ্রেণী পরিবর্তনসহ নানা কাজে যেন কেরানি আর উমেদারদের কথায় চলতে হচ্ছে তাদের।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বছরের পর বছর ধরে জমির দলিলের শ্রেণী পরিবর্তন করে সরকারের বিপুল অঙ্কের রাজস্ব আত্মসাৎ করা হচ্ছে। রেজিস্ট্রি অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এই জালিয়াতির সাথে জড়িত। রাজস্বের টাকা আত্মসাৎ করে বিপুল অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছে এসব অসাধু চক্র। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিষয়টি আমলে নিয়ে অনুসন্ধানে নেমেছে।
দুদক সূত্র জানায়, জমির দলিলের শ্রেণী পরিবর্তন করে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ আসে দুদকে। প্রথম দিকে ২০১৬-২০১৭ সাল পর্যন্ত ১১৯টি দলিলের শ্রেণী পরিবর্তনের অভিযোগ দুদক থেকে আমলে নেয়া হয়। দুদকের উপপরিচালক মো: ইব্রাহিমের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু এক অদৃশ্য শক্তির কারণে দুদকের অনুসন্ধান তালিকা থেকে এই অভিযোগটি বাদ দেয়া হয়। সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে আবারো অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক।
অভিযোগে জানা গেছে, তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে ঘুষসহ নানা অবৈধ কাজের নেতৃত্ব দিচ্ছে অসাধু কেরানি ও উমেদার সিন্ডিকেট। সাবরেজিস্ট্রারের খাস কামরায় তাদের অবাধ যাতায়াত। রেকর্ডরুমসহ মূল্যবান দলিল দস্তাবেজও তাদের কব্জায়। কেরানি ও উমেদারদের অনেকেই প্রভাবশালী। এমনকি তাদের অনেকে হাত মিলিয়েছে দলীয় রাজনীতি ও স্থানীয় সিন্ডিকেটের সাথে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাড্ডা-সাবরেজিস্ট্রি অফিসের অফিস সহকারী (কেরানি) রাসেল মিয়া, মোহাম্মদপুর অফিসের উমেদার বাবু হাওলাদার, সোবাহানসহ কয়েকজনের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে একটি অসাধু চক্র। তাদের বিরুদ্ধে জমির দলিলের শ্রেণী পরিবর্তন, ঘুষ বাণিজ্যসহ নানা দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এতে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে তারা গড়েছেন সম্পদের পাহাড়।
এর মধ্যে কেরানি রাসেল মিয়াকে নানা অপকর্মের অভিযোগে সম্প্রতি শাস্তিমূলক অন্যত্র বদলি করা হয়। কিন্তু সে প্রভাব খাটিয়ে দুই মাসের মধ্যে আবারো স্বস্থানে ফিরে আসে। অভিযোগ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রভাবশালী এক ব্যক্তির পরিচয়ে রাসেল তেজগাঁও রেজিস্ট্রি অফিসে গড়ে তুলেছে দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য। তার সীমাহীন দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যসহ নানা অনিয়মের কারণে গত ২০২১ সালের ১৪ অক্টোবর বাড্ডা সাবরেজিস্ট্রি অফিস থেকে খিলগাঁও সাবরেজিস্ট্রি অফিসে অফিস সহকারী হিসেবে বদলি করা হয় (যার স্মারক নং-২৪৮০)। সেই বদলি চ্যালেঞ্জ করে দুই মাসের মাথায় আবারো বাড্ডা সাবরেজিস্ট্র অফিসে অফিস সহকারী হিসেবে বদলি হয়ে আসে, যার স্মারক নং-৫৫ (৫)।


এই বদলি নিয়ে প্রতিবাদ জানায় ঢাকা জেলার রেজিস্ট্রেশন এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ। যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী রাসেলের অনিয়ম দুর্নীতির প্রতিবাদ জানায় তাদেরকে নানাভাবে হয়রানি ও হুমকি দেয় রাসেল মিয়া। প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম ভাঙিয়ে এখন আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে সে। তার ঘুষ বাণিজ্য এখন রেজিস্ট্রি অফিসে ওপেন সিক্রেট।
সূত্র জানায়, রাসেলের বিরুদ্ধে দলিলের শ্রেণী পরিবর্তনের অভিযোগ রয়েছে। এতে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে নিজেই গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। ২০১৬-২০১৭ সাল পর্যন্ত ১১৯টি দলিলের শ্রেণী পরিবর্তনের অভিযোগ দুদক থেকে আমলে নেয়া হয়। দুদকের তিন সদস্যের অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু এক অদৃশ্য শক্তির কারণে দুদকের অনুসন্ধান তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয় রাসেলের নাম।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তেজগাঁও রেজিস্ট্রি অফিসের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী রাসেলের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। দলিলের শ্রেণী পরিবর্তনের মতো অন্যায় কাজে যেসব সাবরেজিস্ট্রার রাজি হতেন না তাদেরকে বদলি করে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। তাদের অভিযোগ, অফিস সহকারী রাসেলের কারণে ইতোমধ্যে বাড্ডা-সাবরেজিস্ট্রি অফিসের প্রশাসনিক কাজ মুখ থুবড়ে পড়েছে। ঘুষ ছাড়া সেখানে কোনো সেবা পায় না সেবাপ্রত্যাশীরা।
ঘুষ বাণিজ্য আর অবৈধ আয়ের মাধ্যমে রাসেলের নিজ গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলায় গড়েছে আলিশান বাড়ি। ঢাকার বসুন্ধরা ও ইস্টার্ন হাউজিংসহ বিভিন্ন স্থানে নামে-বেনামে রয়েছে তার কোটি কোটি টাকার প্লট ও সম্পদ। তার মায়ের নামে রয়েছে কোটি টাকার আয়কর নথি। এছাড়া সে প্রভাব খাটিয়ে মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে বিভিন্ন লোককে রেজিস্ট্রি অফিসে পিয়নসহ বিভিন্ন পদে চাকরি দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
অপর দিকে রেজিস্ট্রি কমপ্লেক্সের প্রভাবশালীদের উমেদারদের অন্যতম হলেন বাবু হাওলাদার। তিনি অঢেল সম্পদের মালিক। বিলাসবহুল জীবনযাপন তার। বাড়ি করেছেন বাড্ডায়। জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে বাবুলের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়। তার প্রভাবের কারণে অসহায় কর্মকর্তারা।
এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানতে রাসেল মিয়ার সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ ধরনের কাজের সাথে আমি জড়িত নই। আমি সামান্য কেরানি। জমির দলিল করা আমার কাজ নয়। কোন তদবির বা ঘুষ বাণিজ্যের সাথেও জড়িত নই। কোনো মহল আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য দিয়েছে।