ভোলায় পুলিশ ও বিএনপি কর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনায় জেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম নবী আলমগীর ও সম্পাদক হারুন অর রশিদ ট্রুম্যানসহ ৪ শতাধিক নেতাকর্মীর নামে দুটি মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। রোববার রাতে ভোলা সদর মডেল থানায় এ মামলা দুটি দায়ের করা হয়। ভোলা সদর মডেল থানার এসআই মো: জসিম বাদি হয়ে পুলিশের ওপর হামলা এবং স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আবদুর রহিম হত্যার ঘটনায় এ মামলা করা হয়। এতে নাম উল্লেখ করে বিএনপির ৭৪ জন এবং অজ্ঞাত আরো ৩৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ গতকাল পর্যন্ত ১০৮ জনকে গ্রেফতার করেছে। এছাড়া অন্যান্য আসামিকে গ্রেফতারে অভিযান চালানো হচ্ছে। গতকাল দুপুরে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফরহাদ সরদার মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এদিকে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা রহিম হত্যার ঘটনায় বিএনপির পক্ষ থেকে একটি মামলার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা বিএনপির সভাপতি। রহিমের মৃত্যুর জন্য পুলিশ ও বিএনপি নেতারা পরস্পরকে দায়ী করছেন। সংঘর্ষের ঘটনার পর থেকে বন্ধ রয়েছে জেলা বিএনপির কার্যালয়। মামলা আতঙ্ক বিরাজ করছে বিএনপি নেতাকর্মীদের মাঝে। শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে বিএনপি কার্যালয়ের আশপাশে। নিহত রহিমের লাশ ময়নাতদন্ত শেষে দুপুরে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তার পরিবারে চলছে শোকের মাতম। গতকাল বিকেলে দ্বিতীয় নামাজে জানাজা শেষে ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে দাফন করা হয়। এদিকে নিহত আব্দুর রহিমের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার পক্ষে গতকাল বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন নিহতের পরিবারের খোঁজখবর নেন এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন।
ঘটনার দিন পুলিশের সাথে সংঘর্ষে বিএনপির শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়। বরিশাল শেরে বাংলা মেডিক্যাল কলেজে বর্তমানে গুরুতর অবস্থায় ২২ জন ভর্তি রয়েছে। রাজধানীর হাসপাতালে জেলা ছাত্রদলের সভাপতি নুরে আলম আশঙ্কাজনক অবস্থায় লাইফ সাপোর্টে ভর্তি রয়েছেন।
বিএনপি নেতারা অভিযোগ করছেন, বিএনপির ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে পুলিশ এখন বলছে বিএনপি অস্ত্র নিয়ে মাঠে নেমেছে। তাদের প্রশ্ন, যেখানে বিএনপি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করতে পারে না, রাজপথে কথা বলার সুযোগ দেয়া হয় না, সেখানে কিভাবে অস্ত্র নিয়ে মাঠে নামে। বিএনপির নেতাকর্মীরা যদি হামলা করত তাহলে পুলিশের লোকজন হাসপাতালে ভর্তি থাকত। আমরা এই ন্যক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই।
জেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম নবী আলমগীর বলেন, আবদুর রহিম নিহত হওয়ার ঘটনায় কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে গায়েবানা জানাজার কথা থাকলেও ভোলায় তা হয়নি। লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের পর জানাজার আয়োজন করেছে বিএনপি। জোহরের নামাজের পর গোরস্থান মসজিদের সামনে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। আমাদের পিঠ আজ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এই ঘটনার পর থেকে কর্মীরা আরো শক্তিশালী হয়ে কর্মসূচি পালন করবে। তিনি বলেন, ভোলায় বিগত ১০ বছরে এই ধরনের হামলার নজির নেই। আমরা পুলিশের অনুমতি নিয়েই আন্দোলন করি। অতিউৎসাহী কিছু পুলিশ আমাদের কর্মীদের ওপর হামলা করে মনোবল ভেঙে দেয়ার চেষ্টা করছে। ঘটনার পর থেকে পুলিশ পুরো জেলায় নেতাকর্মীদের বাড়িতে হানা দিচ্ছে। এতে নেতাকর্মীরা বাড়িতে থাকতে পারছে না।
পুলিশের মামলার পরিপ্রেক্ষিতে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হারুন উর রশীদ ট্রুম্যান বলেন, আমরাও পুলিশের বিরুদ্ধে একটি মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছি। হামলা করল পুলিশ, আর মামলা করে আমাদের বিরুদ্ধে। নিহতের স্ত্রী খাদিজা বিবি বলেন, আমার স্বামী বিএনপিকে ভালোবাসতো, রোববার তিনি মিছিলে এসেছিলেন, কিন্তু তাকে হত্যা করা হয়েছে, আমি এ হত্যার বিচার চাই।
এ বিষয়ে জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেছেন, বিএনপি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির নামে অশান্তি সৃষ্টি করছে। বিভিন্ন জায়গায় থেকে লোকজন এনে বিএনপি অফিসের সামনে এনে জড়ো করে। বিএনপির মিছিল করার অনুমতি ছিল না, তার পরও তারা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে। পুলিশ বাধা দিলে তারা পুলিশের ওপর চড়াও হয়। এক পর্যায়ে তারা পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে পুলিশকে হত্যার চেষ্টা করেছে। সংঘর্ষে নিহত ব্যক্তি পুলিশের গুলিতে মারা যায়নি, তিনি মারা গিয়েছেন ইটের আঘাতে। মামলার আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। অন্যদিকে রহিমের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ভোলা জেলা বিএনপি এবং পুলিশ পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন করে পরস্পরকে দোষারোপ করছে। বিএনপি সভাপতির দাবি, পুলিশ টিয়াসেল লাঠিচার্জ আর গুলি করায় রহিমের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশ সুপার বলছেন, শর্টগানের গুলিতে কেউ মারা যাওয়ার কথা নয়। ইট বা অন্য কোনো কিছুর মাধ্যমে মাথায় মারাত্মকভাবে আঘাত পাওয়ায় প্রচুর রক্তক্ষরণের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে।
উল্লেখ্য, রোববার কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে জেলা বিএনপির বিক্ষোভ মিছিলে বাধা দেয়াকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও বিএনপি কর্মীদের সংঘর্ষ হয়। এতে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আবদুর রহিম নিহত ও পুলিশসহ শতাধিক আহত হয়।





