বাইক দুর্ঘটনা, না পরিকল্পিত হত্যা? এ রহস্য জানতে দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন সুমনের বাবা আকবর আলী। পরিবারের দাবি, সুমনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে বাইক দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা।
আরিফ মাহমুদ সুমন বেসরকারি সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগ থেকে অনার্স সম্পন্ন করে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরি নেন। তার বাবা আকবর আলী পরিকল্পনা কমিশনে পিআইও (প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা) হিসেবে কর্মরত। তিনি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার ঢাকা পলিটেকনিক স্টাফ কোয়ার্টারে সপরিবারে থাকেন।

সুমন গত ৯ জুন রাত সাড়ে ৯টার দিকে বাসা থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হন। ওই দিন রাতে বাসায় ফিরে না এলে তার বাবা-মা আত্মীয়স্বজনের বাসায় খোঁজাখুঁজি করেও সুমনের কোনো হদিস পাননি। পরদিন সুমনের বাবা তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় একটি জিডি করেন। ১১ জুন সকালে সুমনের বাবার মোবাইল ফোনে একটি অজ্ঞাত নম্বর থেকে ফোন আসে। জানানো হয় যে, সুমন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। এ খবর পেয়ে সুমনের বাবা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ১০২ নম্বর ওয়ার্ডের একটি বেডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার ছেলেকে খুঁজে পান। তার ছেলের পুরো মাথায় ব্যান্ডেজ করা ছিল। অচেতন অবস্থায় পড়েছিল বেডে। চিকিৎসকরা জানান, তাকে আইসিইউতে নিতে হবে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউতে বেড খালি না থাকায় জরুরি ভিত্তিতে তাকে ধানমন্ডির পপুলার হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়।
পপুলার হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, ভিকটিমের মাথার উপরিভাগে ভারী আঘাতে তার ব্রেন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই হাসপাতালে চিকিৎসকরা ব্রেনের অপারেশন করেন। পরে তাকে আইসিইউতে রেখে চিকিৎসা দেয়া হয়। ৪৪ দিন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন থাকার পর ২৫ জুলাই মধ্য রাতে সুমনকে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।

সুমনের মা শাহীনুর আক্তার বলেন, তার ছেলেকে কোথা থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়েছে, তা তারা জানেন না। কারা তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে তাও জানি না। তার মোটরসাইকেলটি অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে। হেলমেটও ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।
আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক রাতে সুমনের জ্ঞান ফিরেছিল। তখন সুমন মাকে দেখতে পেয়ে বলেছিল, ‘মা আমি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটাইনি, সুস্থ হই আগে, তোমাকে সব খুলে বলব।’
এর আগে সুমনের বাবার দায়ের করা জিডির সূত্র ধরে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা পুলিশ দুই ছিনতাইকারীকে আটক করে। তাদের কাছ থেকে সুমনের খোয়া যাওয়া মানিব্যাগ ও মোবাইল পাওয়া গিয়েছিল। মোবাইল ফোনটি ফ্লাশ দিয়ে আইএমই নম্বর পরিবর্তন ও অন্যান্য তথ্য মুছে ফেলা হয়েছে। পরে সুমনের বাবাকে না জানিয়ে ওই দুই ছিনতাইকারীকে ছেড়ে দেয় পুলিশ।
পরিকল্পনা কমিশনের পিআইও আকবর আলী বলেন, তার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার উদ্দেশ্যে মাথাসহ পুরো শরীরে আঘাত করা হয়েছিল। বিষয়টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। অথচ সুমনের বাইকটিতে কোনো দুর্ঘটনার আঘাতের চিহ্ন নেই। তার মাথায় ভারী আঘাতের চিহ্ন ছিল।

তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় দায়ের করা জিডির তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মনির হোসেন সাংবাদিকদের বলেছেন, এটি একটি সড়ক দুর্ঘটনা। সুমন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়ে পড়েছিল। পরে লোকজন তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। দুর্ঘটনার ঘটনাস্থল বেগুনবাড়ি থেকে হাতিরঝিলে প্রবেশমুখের সড়ক। ওই ঘটনাস্থলটি হাতিরঝিল থানা পুলিশের অধীন।
হাতিরঝিল থানার ওসি আবদুর রশিদ সাংবাদিকদের বলেন, লাশ দাফনের সময় পুলিশের পক্ষ থেকে ময়নাতদন্ত করার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু ভিকটিমের বাবা পুলিশের কাছে বিনা ময়নাতদন্তে লাশ নেয়ার মুচলেকা দিয়েছেন। এ কারণে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ দাফন করা হয়েছে। এখন পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করছেন যে সুমনকে হত্যা করা হয়েছে। তাদের যদি এ অভিযোগ থাকে, তাহলে থানায় মামলা দায়ের করতে হবে।
এ দিকে সুমনের বাবা দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন ছেলের মৃত্যু রহস্য জানার জন্য। কিন্তু কেউ তার দিকে সহযোগিতার হাত বাড়াচ্ছে না। তিনি বলেন, ছেলেকে হারিয়ে তিনি দিশেহারা। কোথায় যাবেন কী করবেন কিছুই বুঝতে পারছেন না।