আনন্দের যাত্রা বিষাদেই বরণ করতে হচ্ছে নিরপরাধ যাত্রীদের। পথে যানবাহন চালকদের বেপরোয়া গতি অনেক পরিবারের আনন্দকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিচ্ছে। কেড়ে নিচ্ছে পথচারীদের জীবন। সারাজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যাচ্ছেন অনেকেই। ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, চালকদের বেপরোয়া আচরণের কারণেই এভাবে একের পর এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটছে। ভুক্তভোগীরা বলেছেন, গতকালও অন্তত ৫০টি পরিবারের ঈদ নষ্ট হয়েছে দুর্ঘটনার কারণে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল পৌনে ১০টার দিকে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ঢাকা থেকে শরীয়তপুরগামী পদ্মা ট্রাভেলসের একটি গাড়ির পাঁচজন যাত্রী নিহত ও অন্তত আরো ২০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। অনেকের শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে হাত-পায়ের খণ্ডিত অংশ রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শী রাকিব জানিয়েছেন, সকালে শ্রীনগরের ষোলঘর এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। বাসটির গতি ছিল খুবই বেপরোয়া। একটি থামানো ট্রাককে ওভারটেক করতে গিয়ে ট্রাকের ব্যাকডালার সাথে বাসের একপাশ আটকে যায়। কিন্তু চালক ওই অবস্থায় গাড়ির আরো গতি বাড়িয়ে দিলে বাসের একপাশ কেটে পড়ে যায়। এতে ওই পাশের সব যাত্রীর শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। ওই বাসের যাত্রী শামীম বলেছেন, বাসটির গতি শুরু থেকেই বেপরোয়া ছিল। যাত্রীরা বারবার চালককে গতি নিয়ন্ত্রণের জন্য বলছিলেন। কিন্তু এতে চালক যাত্রীদের ওপর ক্ষেপে যান। আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।দিনাজপুরের চিরিরবন্দরে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রেখা পরিবহনের একটি বেপরোয়া বাস একটি অটোরিকশাকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই নিহত হয় চারজন। যারমধ্যে তিনজনই একই পরিবারের।
সকাল ৮টার দিকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে দু’টি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ঢাকা থেকে রাজধানী পরিবহনের একটি বাস আরিচার দিকে যাচ্ছিল। বাসটি আগে যাওয়ার জন্য উল্টো পথে যেতে থাকলে বিপরীত দিক থেকে আসা আমেরিকান পরিবহনের একটি গাড়ির সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় বাসের অন্তত ২০ জন যাত্রী আহত হন। ছিদ্দিকুর রহমান নামের এক পথচারী বলেছেন, বাসে উঠতেই মানুষের ভয় লাগে। বাসগুলো এতটাই বেপরোয়া গতিতে চালায় যে দম বন্ধ হয়ে আসতে চায়। বুকের মধ্যে কেঁপে ওঠে। যখন ওভারটেক করে তখন তো অনেক যাত্রী চোখ বুজে দোয়া পড়তে থাকেন।
আলম নামের এক যাত্রী বলেন, বাসে উঠলে সারাক্ষণ মনে হয় এই বুঝি বিপদ হলো। তিনি বলেন, যাদের রাস্তায় যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ করার কথা তারা নির্বিকার। তারা এগুলো দেখেও দেখেন না। কোনো বিপদ হলে, প্রাণ ঝরলেই কেবল কর্তৃপক্ষের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়। রোড সেইফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেছেন, রাস্তায় অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে বেপরোয়া গতির কারণে। তিনি বলেন, দেশে রাস্তাঘাটে বিস্তৃতি ঘটার সাথে সাথে যানবাহনের গতিও বেড়েছে। কিন্তু গতি নিয়ন্ত্রণের যে প্রযুক্তি দরকার সেই প্রযুক্তি দেশে নেই। একই সাথে নজরদারি তো নেই-ই। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আর নজরদারি না থাকলে রাস্তায় যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সাইদুর রহমান বলেন, মহাসড়কে যে যানবাহন চলছে তার বেশির ভাগেই কোনো ফিটনেস নেই। রাস্তায় নামলেই নষ্ট হয়ে যায়। এই গাড়িগুলো মহাসড়কের পাশে বসে মেরামতের সময় অনেক বেপরোয়া গাড়ি ওগুলোর ওপরে উঠে যাচ্ছে। এমন কোনো মাস নেই যে মাসে এ রকম ১০-১২টি দুর্ঘটনা না ঘটছে।