বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থিতার দৌড়ে এখন পর্যন্ত টিকে থাকা ছয়জন হলেন- আওয়ামী লীগ মনোনীত আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ, জাতীয় পার্টি মনোনীত ইকবাল হোসেন তাপস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম, জাকের পার্টি মনোনীত মিজানুর রহমান বাচ্চু এবং স্বতন্ত্র পদে কামরুল আহসান রুপন ও আলী হোসেন হাওলাদার।
নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হলফনামার সূত্রে জানা গেছে, মেয়র পদে লড়াই করা ছয় প্রার্থীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিক্ষিত স্বতন্ত্র প্রার্থী কামরুল আহসান রুপন। তিনি সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। রুপন বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও বিএনপি নেতা আহসান হাবিব কামালের ছেলে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম ফিকাহ শাস্ত্রে কামিল পাস করেছেন (স্নাতকোত্তর সমমূল্য)। জাতীয় পার্টির প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপস উল্লেখ করেছেন, তিনি বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক (বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার)। জাকের পার্টির প্রার্থী মিজানুর রহমান বাচ্চু এইচএসসি পাস। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী আলী হোসেন হাওলাদার স্বশিক্ষিত বলে উল্লেখ করেছেন।

ছয় প্রার্থীর মধ্যে শুধু জাতীয় পার্টির প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপস বর্তমানে মামলার আসামি। তিনি ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দায়ের হওয়া দু’টি প্রতারণা মামলার আসামি। যদিও মামলা দু’টির রায় না হওয়া পর্যন্ত তাকে জামিন দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশন। তিনি আরো বেশ কয়েকটি দেওয়ানি মামলার আসামি।
তিনি ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী ফয়জুল করিম পাঁচটি মামলার আসামি ছিলেন, যে মামলাগুলো নিষ্পত্তি হয়ে গেছে বলে উল্লেখ করেছেন। অন্য চার প্রার্থী কোনো মামলায় আসামি বলে উল্লেখ করেননি।
ছয় প্রার্থীর মধ্যে কেবল আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ দু’টি অস্ত্রের মালিক। সম্পদে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন তিনি।

আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ
৬৬ বছর বয়সী প্রার্থী আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ তার আয়ের প্রধান উৎস দেখিয়েছেন ব্যবসা। অংশীদারি প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তিনি। এটি জাহাজের মালামাল বোঝাই ও জাহাজ থেকে মালামাল খালাস করার কাজে নিযুক্ত লোকবল সরবারহকারী প্রতিষ্ঠান।
এ ছাড়া অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া দিয়ে বার্ষিক আয় করেন সাত লাখ ৮৩ হাজার ১৫০ টাকা, যা প্রার্থীর ওপর নির্ভরশীলদেরও আয় হিসেবে দেখিয়েছেন। ব্যাংক আমানত থেকে আয় দুই লাখ ৭৫ হাজার ৫৭২ টাকা।
নিজের নামে নগদ জমা রয়েছে দুই কোটি ৫০ লাখ ৮৩ হাজার ৮৭২ টাকা। স্ত্রীর নামে রয়েছে এক কোটি ৩৫ লাখ ৮৪ হাজার পাঁচ টাকা। আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আবুল খায়ের আব্দুল্লাহর নামে রয়েছে দুই লাখ ৭৫ হাজার ৫৭২ টাকা, স্ত্রী লুনা আব্দুল্লাহর নামে রয়েছে ১২ হাজার ৩৯৭ টাকা। শেয়ার মালিক রয়েছেন ২০ লাখ টাকা।

এ ছাড়া নিজের ও স্ত্রীর নামে একটি করে গাড়ি রয়েছে। যেখানে নিজের গাড়ির মূল্য দেখানো হয়েছে ৩১ লাখ এবং স্ত্রীর ৪৯ লাখ টাকা। প্রার্থী নিজে ১০ ভরি ও স্ত্রী লুনা আব্দুল্লাহ ২০ ভরি স্বর্ণের মালিক, যা সবই উপহার হিসেবে পেয়েছেন।
আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ তিন লাখ ২৫ হাজার ও স্ত্রী ৫০ হাজার টাকার ইলেকট্রনিক সামগ্রীর মালিক। আসবাবপত্রের অর্থমূল্যও দেখানো হয়েছে দুই লাখ ৫৪ হাজার এবং স্ত্রী দুই লাখ ৫০ হাজার। লাইসেন্সকৃত একটি এনপিবি পিস্তল ও একটি শর্টগানের মালিক তিনি।
তিনটি ভবনের মালিক আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ। এরমধ্যে খুলনায় ৪০ লাখ টাকা সমমূল্যের চারতলা দালান, ধানমন্ডিতে ১৮ লাখ ৬০ হাজার টাকা সমমূল্যের একটি অ্যাপার্টমেন্ট ও উত্তরায় ছয়টি অ্যাপার্টমেন্টের মূল্য দেখানো হয়েছে ১৪ লাখ টাকা।

ইকবাল হোসেন তাপস
৫৭ বছর বয়সী মেয়রপ্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপসের আয়ের প্রধান উৎস ব্যবসা। এর মধ্যে ইওকোহামা লেবেলস অ্যান্ড প্রিন্টিং কোম্পানির নির্বাহী ব্যবস্থাপনা পরিচালক। সাউথ অ্যাপোলো মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের অংশীদার। পাশাপাশি সাউথ অ্যাপোলো ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও সাউথ অ্যাপোলো প্রপার্টিজের পরিচালক। এই পরিচালক পদের সম্মানী হিসেবে বার্ষিক আয় তিন লাখ ৬০ হাজার টাকা। বেতন বাবদ বছরে আয় ৭৬ লাখ ৯৪ হাজার ৯২৭ টাকা। প্রার্থীর ওপর নির্ভরশীলদের আয় ২৮ লাখ ২০ হাজার টাকা। সঞ্চয়ী আমানতের মুনাফা বাবদ আয় ১,১৯৬ টাকা। তিনি দুই কোটি ২৯ লাখ ২৫ হাজার নগদ টাকার মালিক। ব্যাংকে জমা ৬৫ লাখ ৩২ হাজার ২৪ টাকা। ডায়াগনস্টিক সেন্টারের শেয়ারমূল্যর ১২ লাখ ৫০ হাজার, মেডিক্যাল কলেজের ৩৪ লাখ ৩৪ হাজার, প্রোপার্টিজে ১৫ লাখ টাকা। নিজের ৩৮ লাখ টাকা মূল্যের একটি গাড়ি রয়েছে। উপহার বাবদ পাওয়া ৬০ তোলা স্বর্ণ, উপহার হিসেবে পাওয়া ফ্রিজ, টেলিভিশন, এসি ও ওভেন। ৫১ হাজার ৫৬৫ টাকার আসবাবপত্রের পাশাপাশি উপহারের আসবাবপত্রও রয়েছে। যৌথ মালিকানার চারতলা ভবন। প্রাইম ব্যাংকের কাছ থেকে গৃহ সংস্কার ঋণ বাবদ ১৪ লাখ ৭৪ হাজার ৯৫৫ টাকা নিয়েছেন।

সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম
৫০ বছর বয়সী ইসলামী আন্দোলনের মনোনীত প্রার্থী মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিমের আয়ের প্রধান উৎস চাকরি। তিনি চরমোনাই আহসানাবাদ রশীদিয়া কামিল মাদরাসার মুহাদ্দিস বা হাদিস বিশারদ। তার বছরে আয় হয় তিন লাখ ছয় হাজার টাকা, ব্যবসা থেকে আয় চার লাখ পাঁচ হাজার টাকা। শিক্ষকতা পেশায় আয় সাত লাখ ছয় হাজার টাকা। ফয়জুল করিম ৪৩ লাখ ৭৪ হাজার ৫১৩ নগদ টাকার মালিক। ব্যাংকে জমা আছে এক লাখ ২১ হাজার ৭৬৯ টাকা। আসবাবপত্র ও ইলেকট্রনিকস সামগ্রীর মালিক থাকলেও তার উৎস উল্লেখ করেননি।
৮২৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ কৃষি জমির এবং ৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ অকৃষি জমির মালিক, দালান রয়েছে একটি এবং দু’টি অ্যাপার্টমেন্ট।

কামরুল আহসান রুপন
৩৯ বছর বয়সী স্বতন্ত্র প্রার্থী কামরুল আহসান রুপনের প্রধান আয়ের উৎস মৎস্য, পশু ও কৃষি খামার নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান রিভার আইল্যান্ড ইন্টিগ্রেশন লিমিটেড। তার ব্যবসা থেকে আয় হয় চার লাখ ৩১ হাজার ২৫ টাকা। নগদ ৯ লাখ ৪৯ হাজার ৪০৫ টাকার মালিক। ব্যাংকে জমা ১২ হাজার ১৬৫ টাকা। তার প্রতিষ্ঠান রিভার আইল্যান্ড ইন্টিগ্রেশন এক কোটি টাকা মূল্যের শেয়ারের মালিক। ২৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা মূল্যমানের একটি গাড়ির মালিক। তিনি মা ও বোনের কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা লোন নিয়েছেন।

আলী হোসেন হাওলাদার
৬০ বছর বয়সী প্রার্থী আলী হোসেন হাওলাদারের প্রধান আয়ের উৎস তার মালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আলী অ্যান্ড ব্রাদার্স। তার বাড়ি ও দোকানভাড়া দিয়ে বছরে আয়ে দুই লাখ ১০ হাজার টাকা। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে আয় ছয় লাখ ৩৭ হাজার ১৩ টাকা। নগদ ৫০ হাজার টাকার মালিক। ব্যাংকে জমা ১৮ লাখ টাকা। দু’টি ট্রাক, একটি মোটরগাড়ি ও দু’টি মোটরসাইকেলের মালিক। তারা স্বামী-স্ত্রী মিলে ২০ ভরি স্বর্ণের মালিক। এ ছাড়া আসবাব ও ইলেকট্রনিকস পণ্যের মালিকানা রয়েছে। তিনি দোকান স্থাপনের জন্য ৯ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। কৃষি জমি পৈতৃক সূত্রে তিন একর এবং ইজারা নিয়েছেন দুই একর। অকৃষি জমির মালিক ৫৬ শতাংশ। একটি ভবনের মালিক। উত্তরা ব্যাংক লিমিটেডের কাছ থেকে ৯ লাখ টাকা ঋণ গ্রহণ।

মিজানুর রহমান বাচ্চু
৬৮ বছর বয়সী মিজানুর রহমান বাচ্চুর আয়ের প্রধান উৎস আবাসিক হোটেল ব্যবসা ও গৃহ-সম্পত্তি আয়। তিনি ঘরভাড়া বাবদ বছরে ছয় লাখ ছয় হাজার ৯৮০ টাকা ও দোকান ভাড়া দিয়ে ছয় লাখ ২৩ হাজার ৬৬০ টাকা আয় করেন। আবাসিক হোটেল থেকে আয় করেন দুই লাখ ৪৪ হাজার ৬৫০ টাকা। প্রার্থীর ওপর নির্ভরশীলদের বার্ষিক আয় চার লাখ ২০ হাজার টাকা। তার কোনো নগদ টাকা না থাকলেও স্ত্রীর নগদ তিন লাখ ও ব্যাংকে ছেলের নামে জমা দুই লাখ ৭৫ হাজার টাকা দেখিয়েছেন।
নিজের একটি প্রাইভেট কার ও একটি মোটরসাইকেল রয়েছে। ছেলে ১০ টাকা ও স্ত্রী আট ভরি স্বর্ণের মালিক। তার ব্যবসার মূলধন ৫১ লাখ ১৯ হাজার ৭০০ টাকা। নিজের নামে অকৃষি জমি ২৩ শতাংশ, স্বামী-স্ত্রীর নামে সাড়ে ৪ শতাংশ ও যৌথ মালিকানার ২১ শতাংশের এক অংশ।