ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ৫০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে গাঢাকা দিয়েছেন সেলিম চৌধুরী নামের এক ব্যবসায়ী। বিভিন্ন ব্যাংকের দায়ের করা একের পর এক মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতার পরোয়ানা জারি হলেও পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে পারছে না। তার কাছ থেকে টাকা ফেরত পেতে ব্যাংকগুলোও অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। সেলিম চৌধুরী ও তার ছেলের বিরুদ্ধে বিপিএলএ ম্যাচ গড়াপেটারও দায় পড়েছিল ২০১৪ সালে। রাজধানীর গুলশানের বাসিন্দা সেলিম চৌধুরী নিজ নামের বাইরেও স্ত্রী-সন্তান ও তার বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের নামে এই ঋণ গ্রহণ করেন বলে জানা যায়। গুলশান ২ নম্বরের ৫৫ নম্বর রোডের ২০ নং হোল্ডিংস্থ এক্সেলসিওর কনকর্ডে তার আলিশান বাসা। অভিজাত এলাকা বনানীর কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউর হ্যামলেট টাওয়ারে তার অফিস। গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জ হলেও তার বাবা ইয়াহিয়ার চাকরির সুবাদে থাকতেন খুলনায়। নব্বইয়ের দশকে ঢাকায় এসে ইউরোপা ট্রাভেলস নামে একটি অফিস খুলে জনশক্তি রফতানির ব্যবসা শুরু করেন। পরে নানা কোম্পানি খুলে ব্যবসা সম্প্রসারণের নামে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে টাকা আত্মসাৎ করা শুরু করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অর্থ আত্মসাতে সেলিম চৌধুরী পারিবারিক সিন্ডিকেটে রয়েছেন তার স্ত্রী নাহিদ চৌধুরী, তাদের দুই পুত্র শিহাব জিসান চৌধুরী ও তিশাম তামরিজ চৌধুরী। আছেন সেলিমের খালাতো ভাই মনজুর আলম, মশিউর রহমান ও চাচাতো ভাই জিহান হোসাইন চৌধুরী। তারা সাতটি প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংকগুলো থেকে এই ঋণ নেন।

তথ্য মতে, সেলিম চৌধুরী তার নিজস্ব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মাহিন নিটিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, বড় ছেলে শিহাব চৌধুরীর নামে শিহাব গার্মেন্ট লিমিটেড, ছোট ছেলে তিশামের নামে তিশাম অ্যাপারেলের নামে অগ্রণী ব্যাংকের তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল করপোরেট শাখা থেকে মোটা অঙ্কের টাকা লোন নেন, যা সুদসহ দাঁড়ায় ১১১ কোটি টাকার ওপর। ব্যাংকের একই শাখা থেকে সেলিম জামিনদার সেজে খালাতো ভাই মনজুর আলমের মেসার্স পটেটো ফ্ল্যাক্স বিডি লিমিটেডের নামে ৯৪ কোটি টাকা ঋণ করিয়ে নেন। সব মিলিয়ে সেলিম পরিবার সিন্ডিকেটের কাছে শুধু অগ্রণী ব্যাংকের দাবিকৃত টাকার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১৩ কোটিরও বেশি। অথচ একটি টাকাও তিনি পরিশোধ করেননি। ব্যাংকের মামলায় ২০২১ সালে একবার গ্রেফতার হয়েছিল সেলিম চৌধুরী। তখন টাকা পরিশোধের শর্তে এবং নগদ এক কোটি টাকার একটি চেক দিয়ে জামিন নেন। পরে ওই চেকটিও ডিজঅনার হয়। শর্ত ভঙ্গ করায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। কিন্তু গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকলেও অদৃশ্য কারণে তিনি গ্রেফতার হচ্ছেন না।

অভিযোগ রয়েছে, একই জমি বিভিন্ন ব্যাংকে মর্টগেজ রেখে ঋণ নেন সেলিম চৌধুরী। শুধু তা-ই নয়, বন্ধুত্বের সূত্র ধরে ইকবাল হায়দার চৌধুরী নামের এক ব্যবসায়ীর ১০ বিঘা জমি বাকিতে খালাতো ভাই মশিউর রহমানের নামে লিখিয়ে নেন সেলিম চৌধুরী। ঢাকার আশুলিয়া এলাকার ওই জমির মূল্য বাবদ ইকবালকে ১৭ কোটি টাকার চেক দেয়া হয়। ওই চেক ছিল সেলিম ও তার স্ত্রী নাহিদ চৌধুরীর নামে খোলা যৌথ একটি অ্যাকাউন্টের। ওই চেক জমা দিয়ে টাকা পাননি ইকবাল চৌধুরী। ভুক্তভোগী ইকবাল চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘বাকিতে আমার জমি লিখে নিয়ে সেই জমি দু’টি ব্যাংকে মর্টগেজ রেখে মোটা অঙ্কের টাকা ঋণ নিয়েছেন সেলিম চৌধুরী। আমার টাকা দিচ্ছেন না। ব্যাংকের টাকাও পরিশোধ করছেন না।’ পাওনা টাকা আদায়ে ইকবাল চৌধুরী অভিযুক্ত সেলিম চৌধুরী, তার স্ত্রী ও দুই ছেলের নামে মামলা করেছেন। তার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। ইকবাল চৌধুরী বলেন, ওই জমি মর্টগেজ রেখে তৎকালীন রিলারেন্স লিজিং কোম্পানি থেকে ১৫ কোটি টাকা ঋণ নেন সেলিমের খালাতো ভাই মশিউর রহমান। ঋণের টাকা পরিশোধ না করে তিনি লন্ডনে পালিয়ে যান। পরে ওই জমির দলিল একটি ব্যাংকের চকমোগলটুলী শাখায় মর্টগেজ রেখে গ্যারান্টার হিসেবে সেলিম তার চাচাতো ভাই জিহানের মালিকানাধীন কোম্পানি মেসার্স পদ্মা অ্যাগ্রো ট্রেডার্সের নামে দুই দফায় মোট ১৫৪ কোটি টাকা ঋণ করিয়ে নেন। টাকা পরিশোধ না করায় ব্যাংক জিহানের বিরুদ্ধে মামলা করে।
ইউরোপা বেভারেজ লিমিটেড নামে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে সেলিম চৌধুরী ২০১৭ সালে ট্রাস্ট ব্যাংকের দিলকুশা করপোরেট শাখা থেকে ৬৭ কোটি টাকা ঋণ নেন। প্রথম দিকে ঋণের কয়েকটি কিস্তি পরিশোধ করেছিলেন। এই ব্যাংক এখন তার কাছে ৫৯ কোটি টাকা পাবে।

এ দিকে ঢাকা ব্যাংক থেকে সেলিম চৌধুরী ২০০৭ সাল থেকে কয়েক ধাপে ১০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। এখন সুদসহ ব্যাংক তার কাছে পাবে ১৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। ব্যাংক তার বিরুদ্ধে মামলা করেও টাকা তুলতে পারছে না। তারাও আদালতে মামলা করেছেন।
সেলিম চৌধুরীর ও তার পারিবারিক সিন্ডকেটের নামে ঢাকার গুলশান, কাফরুল বনানীসহ বিভিন্ন থানায় ওয়ারেন্ট রয়েছে। গুলশান ও বনানী থানায় সেলিমের বিরুদ্ধে দু’টি গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। অথচ রহস্যজনক কারণে তিনি গ্রেফতার হচ্ছেন না। থানা কর্তৃপক্ষ বলছে তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
সেলিম চৌধুরী বিপিএলে দলও কিনেছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, ম্যাচ গড়াপেটায় জড়িত থাকায় ২০১৪ সালে তার দল ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটরসকে অভিযুক্ত করা হয়।
সেলিম চৌধুরীর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি। তার দেশী-বিদেশী নম্বর দু’টি মোবাইল নম্বরে ফোন দিলেও তার সাথে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।