রাজধানীর দয়াগঞ্জ মোড় পার হয়ে মিরহাজিরবাগের দিকে যাচ্ছিলেন আব্দুল্লাহ আল বাপ্পি। বিপরীত দিক থেকে বেপরোয়াভাবে আসছিল একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। রিকশার চালকের বয়স ১২ বছরের বেশি হবে না। দ্রুতগতির অটোরিকশার সাথে ধাক্কা লেগে এক মহিলা পথচারী ছিটকে পড়েন বাপ্পির মোটরসাইকেলের ওপর। বাপ্পি ছিটকে পড়েন রাস্তার ওপর। চলন্ত মোটরসাইকেলটি আছড়ে পড়ে তার ওপরে। অটোরিকশার দুই যাত্রী ছিটকে পড়েন ফুটপাথের ওপর। মহিলা পথচারীসহ সবাই রাস্তায় পড়ে ব্যথায় কাতরাচ্ছিলেন। এই দৃশ্য দেখে পথচারীরা তাদেরকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। পথচারী মহিলার হাত ভেঙে আলাদা হয়ে যায়।
বাপ্পি গতকাল বলেন, কয়েক দিন আগে দুর্ঘটনার শিকার হলেও এখনো ক্ষতস্থানগুলো শুকায়নি। তিনি বলেন, ওই অটোরিকশা চালকের বয়স ১২ বছরের বেশি হবে না। রিকশাটির গতি ছিল ৫০ কিলোমিটারের ওপরে। ওই গতিতে ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায় ভালোমানের যানবাহন চালানোও বিপজ্জনক। তিনি নিজে ব্যস্ততম শহরে ওই গতিতে মোটরসাইকেলও চালান না। অথচ তিন চাকার অটোরিকশাটি অতোটাই বেপরোয়া গতিতে চলছিল।

বাপ্পি বলেন, আগে এই অটোরিকশা ঢাকার গলিপথে চলতো। তাও পুলিশের চোখ এড়িয়ে। এখন প্রধান প্রধান সড়কে চলে পুলিশের চোখের সামনে দিয়ে। এমনকি, থানার সামনে দিয়েও এই অটোরিকশা যাতায়াত করলেও পুলিশ কিছু বলে না। যাত্রাবাড়ি থানা, শ্যামপুর থানা, ডেমরা থানা, কদমতলী থানা, মুগদা, খিলগাঁও, কামরাঙ্গীরচরসহ অনেক থানার সামনে দিয়ে হাজার হাজার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা যাতায়াত করছে প্রতি দিন। অথচ প্রধান প্রধান সড়কে এই অনিরাপদ বাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
রাজধানীর গোপীবাগ এলাকার সাইদুর রহমান জানান, তার বাসার সামনে দিয়েই প্রতিদিন অসংখ্য অটোরিকশা যাতায়াত করে। এসব রিকশার গতি এতোটাই বিপজ্জনক যে বাসার সামনে নামতেও ভয় পান তিনি। তিনি বলেন, প্রায়ই দেখেন এই রিকশায় লেগে কেউ না কেউ আহত হচ্ছেন।
রাজধানীর ডেমরার কোনাপাড়া এলাকার বাসিন্দা শফিক জানান, এই অটোরিকশাগুলো কোনোই আইন মানে না। রাস্তায় যখন যানজট থাকে তখন দেখা যায় উল্টো রাস্তা দিয়ে চলছে। এদের আবার সিন্ডিকেট রয়েছে। এদের বেপরোয়া গতির বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললে উল্টো তাকে আক্রমণের শিকার হতে হয়। রাস্তায় এরা কাউকে মানে না। এমনকি, অনেক সময় দেখা যায় দূরপাল্লার বাসের সাথে তারা পাল্লা দিচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজধানীর ডেমরার, শ্যামপুর, কদমতলি, জুরাইন, যাত্রাবাড়ি, মিরহাজিরবাগ, গেন্ডারিয়া, সূত্রাপুর, মুগদা, মানিকনগর, ধলপুর, মান্ডা, বাসাবো, মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ, কামরাঙ্গীরচর, উত্তরার দক্ষিণখান, উত্তরখানসহ রাজধানীর বেশ কিছু এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। প্যাডেলচালিত রিকশায় ব্যাটারি বসিয়ে এগুলো যান্ত্রিক রিকশায় পরিণত করা হয়েছে। গড়ে উঠেছে গ্যারেজ। এসব গ্যারেজে চোরাই বিদ্যুতে এই রিকশার ব্যাটারি চার্জ হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন। মানিক নগরের এক বাসিন্দা আব্দুল মজিদ বলেন, মানিকনগর ও মান্ডা মিলে অন্তত অর্ধশত গ্যারেজ রয়েছে। যেসব গ্যারেজে চোরাইভাবে এসব রিকশার ব্যাটারিতে চার্জ দেয়া হয়। ভুক্তভোগী অনেকেই বলেছেন, এগুলো খুবই বিপজ্জনক। এগুলোর অধিকাংশ চালক অল্প বয়সী। রাস্তায় যানবাহন চালানোর ব্যাপারে তাদের কোনো বৈধতা নেই। তারা বেপরোয়া গতিতে এই রিকশা চালায়।
রাজধানীর ট্রাফিক বিভাগের এক পুলিশ সদস্য বলেছেন, এসব অটোরিকশার মালিকদের অনেকেই প্রভাবশালী। মানিকনগর বিশ্বরোড মোড়ে দায়িত্বরত এক পুলিশ সদস্য গতকাল বলেন, তারা মাঝে মধ্যে এই অটোরিকশা আটক করেন। কিন্তু ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। একটি রিকশা ধরলে বিভিন্ন জায়গা থেকে ফোন আসে। আবার অনেকে প্রতিবন্ধীর সার্টিফিটেক নিয়ে অটোরিকশা চালায়।