রাজধানীর বাংলামোটর থেকে স্যানেটারি ফিটিংস সামগ্রী নিয়ে বাসাবোর নন্দিপাড়ায় যাচ্ছিলেন ভ্যানচালক হুকুম আলী (৪০)। প্রতিদিনই এমন দু’চারটি ভাড়ায় গিয়ে যে টাকা উপার্জন হয় তা দিয়ে হুকুম আলীর সংসার চলে। কিন্তু গত রোববার হুকুম আলীর সাথে যে ঘটনা ঘটেছে তা কোনো দিন ভুলবেন না তিনি। তাকে বোকা বানিয়ে ভ্যানের প্রায় সব মালামাল লুটে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। তার চোখের সামনে দিয়ে সব নিয়ে গেছে, কিন্তু তিনি কোনোই প্রতিবাদ করতে পারেননি। উল্টো দুর্বৃত্তদের গাড়িতে মালামাল তুলে দিয়েছেন। এরূপ আরো অসংখ্য ঘটনা ঘটছে রাজধানীতে। ভুক্তভোগীরা নিজের টাকাকড়ি নিজেই তুলে দিচ্ছে দুর্বৃত্তদের হাতে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলেছেন, একটি মাদকের ব্যবহার করে দুর্বৃত্তরা এভাবে মানুষের টাকাকড়ি, মূল্যবান মালামাল কেড়ে নিচ্ছে। ‘শয়তানের নিশ্বাস’ নামের ওই মাদকটি মানুষের নাকের কাছে ধরতে পারলেই চলে। এরপর তাকে যা বলা হবে সে তাই করবে।
ওই এলাকা থেকে সম্প্রতি ফারুক নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ১৩ হাজার টাকা এভাবে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। ফারুক নিজেই দুর্বৃত্তদের হাতে টাকা তুলে দেন। ১৫ থেকে ২০ মিনিট পর তার যখন হুঁশ ফেরে তখন তিনি টাকার খুঁজতে গিয়ে দেখেন টাকা নেই।

গতকাল হুকুম আলী নয়া দিগন্তকে বলেন, তার বাসা বাংলা মোটরের লক্ষীবাড়ি এলাকায়। বাংলামোটর এলাকায় তিনি ভ্যানগাড়ী চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। এখানকার দোকানগুলো থেকে নির্মাণসামগ্রী রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দেন তিনি। গত রোববার ৭৫ হাজার টাকার মালামাল নিয়ে তিনি বাসাবো নন্দিপাড়া যাচ্ছিলেন। পথে বাসাবো ওয়াসা রোডের ফুটপাতের একটি চায়ের দোকানে চা পান করতে বসেন। সেখানে তার পাশেই বসা ছিল দু’ব্যক্তি। হুকুম আলী বলেন, ওই ব্যক্তিদের সন্দেহ হয় তার। তিনি চা খেয়ে কিছুদূর যেতেই একটি মোটর সাইকেলে এক ব্যক্তি তার সামনে এসে বলে, ‘এই মাল এখানে নামবে’। হুকুম আলী বলেন, তার সাথে থাকা রিসিটে মাল ডেলিভারির ঠিকানা দেয়া ছিল। কিন্তু তার কোনো কিছুই মনে নেই। মোটরসাইকেল আরোহী তাকে যে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি নির্বোধের মতো তাই করেছেন। কোনো কিছু জিজ্ঞাসাও করেননি। কয়েক পিস মাল ভ্যানে রেখে তাকে বলে এই মালগুলো অন্য সাইটে নিয়ে যেতে হবে। তিনি ভ্যান চালিয়ে সামনের দিকে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ হুকুম আলীর জ্ঞান ফিরে। তিনি বুঝতে পারেন মালগুলো তো ওই বাড়ির সামনে নামানোর কথা নয়। দ্রুত তিনি ভ্যান ঘুরিয়ে ওই বাড়ির সামনে গিয়ে দেখেন সেখানে কেউ নেই। আশপাশে থাকা দোকানিদের জিজ্ঞাস করে জানতে পারেন, মালগুলো একটি পিকআপ ভ্যানে ভরে চলে গেছে। হুকুম আলী বলেন, ‘ওই সময় আমি বুঝতে পারি; আমি প্রতারণার শিকার হয়েছি।’ হয়তো দুর্বৃত্তরা আমাকে নির্বোধ করতে নেশা জাতীয় কোনো দ্রব্য ব্যবহার করেছে।

বাসাবো ওয়াসা রোডের রাসেল কম্পিউটার। সম্প্রতি ওই দোকানে দুই যুবক প্রবেশ করে। তাদের হাতে ছিল ৫টি ২০০ টাকার নোট। তারা নোটগুলো আস্ত করতে চায়। প্রতিষ্ঠানের মালিক রাসেল বলেন, তিনি যুবকদের জানিয়ে দেন তার কাছে আস্ত টাকা নেই। তার দোকানেই ফারুক নামের এক ব্যক্তি বসেছিলেন। যুবকরা ফারুকের মুখের সামনে ২০০ টাকার নোটগুলো ধরে। রাসেল বলেন, ফারুকের কাছে ১৩ হাজার টাকা ছিল। ফারুক নির্বোধের মতো সব টাকাই ওই দুই যুবকের হাতে তুলে দেন। ১৫ থেকে ২০ মিনিট পর ফারুক তার টাকা খুঁজতে থাকেন।
একাধিক সূত্র বলেছেন, মানুষ এখন চরম আতঙ্কের মধ্যে আছেন। রাজধানীর বাসাবো এলাকার বাসিন্দা চঞ্চল চৌধুরী বলেন, এভাবে অনেক মানুষকে নিঃস্ব করে নিয়ে যাচ্ছে দুর্বৃত্তরা। ব্যবহার করছে এই শয়তানের নিঃশ্বাস নামের মাদক। যা নগরবাসীর জন্য চরম আতঙ্কের। তিনি বলেন, রাজধানীতে এটা মারাত্মকরূপ ধারণ করেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, শয়তানের নিঃশ্বাস নামের একটি মাদক আছে। যা আসক্ত ব্যক্তিরাই ব্যবহার করে থাকে। তবে বর্তমানে এটা দুর্বৃত্তরা ব্যবহার করছে মানুষের টাকাকড়ি কেড়ে নেয়ার জন্য। এটায় আসক্ত ব্যক্তিকে যা নির্দেশ দেয়া হবে ১০-১৫ মিনিট সে সেই নির্দেশই পালন করবে। এমনকি, এই নেশায় আসক্ত করে অনেক মানুষকে দিয়ে জঘন্য অপরাধ ঘটানো হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। আর নাক দিয়ে কোনোমতে ওই নেশার দ্রব্য শোঁকানো সম্ভব হলেই ভিকটিম নেশায় আসক্ত হয়ে পড়বে।