কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প অতি ঘনবসতি হওয়ায় মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো হয়ে উঠেছে ডেঙ্গুর ‘হটস্পট’। প্রতিদিন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে রোহিঙ্গারা সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। ক্যাম্পে দ্রুত বাড়ছে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। প্রথমে রোহিঙ্গারা স্বাভাবিক জ্বর বলে মনে করতেন। ডেঙ্গু সম্পর্কে তাদের তেমন কোনো ধারণা না থাকলেও তাদের দেহে ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ায় এখন তারা আর হেলা করছেন না।
স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল আলম বলেন, ডেঙ্গু চিকিৎসা সেবা এখানে খুব একটা সুখকর নয়। ডেঙ্গুর চিকিৎসা সহায়ক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। টাকার অভাবে অনেকেই সঠিক চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন না। আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ ইসলাম বলেন, মধুরছড়া, রোহিঙ্গা-৪ নং ক্যাম্পে হোপ ফিল্ড হসপিটাল ফর উইমেন রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্য সেবার পাশাপাশি স্থানীয়দের বিনা মূল্যে যাবতীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সেবা দেয়া হতো। এখন বাজেট কমার অজুহাতে চিকিৎসা সেবা দিলেও ওষুধপত্র সম্পূর্ণ বাইরে থেকে রোগীর স্বজনদের কিনে নিয়ে আসতে হচ্ছে।
চলিত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৯৫৫ জন। এ সময়ে মৃত্যু হয়েছে ৪ জনের। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আশপাশের স্থানীয় বাংলাদেশীদের মধ্যেও ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। এ পর্যন্ত স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ১১৮ জন।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত বছর কক্সবাজারে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছিল ১৭ হাজার ৩৯০ জন। তাদের মধ্যে ১৫ হাজার ৩৫২ জনই ছিল রোহিঙ্গা। আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিল ৩০ রোহিঙ্গাসহ ৩৯ জন।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, এ বছর সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গুর প্রকোপ রয়েছে উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। এখানকার ক্যাম্প-৩ এলাকায় ৬২০ জন, ক্যাম্প-১৭-এ ১৭১ জন, ক্যাম্প-৪-এ ১৬৭ জন, ক্যাম্প-১ ডব্লিউতে ১১৫ এবং ক্যাম্প-২৪-এ ৯১ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। অন্য দিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে কক্সবাজার পৌরসভায় ২৫ জন, টেকনাফে ২১ জন, সদর উপজেলায় ১৯ জন, মহেশখালীতে ১২ জন এবং রামু উপজেলায় ৮ জন রয়েছে। এ সবই সরকারি হিসাব। প্রাইভেট ক্লিনিক কিংবা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ব্যক্তিগত চেম্বারে চিকিৎসা নেয়া অনেক রোগী এই হিসাবের বাইরে রয়ে যাচ্ছেন।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) আশিকুর রহমান জানিয়েছেন, ২৪ জুলাই পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে ১৭০ জন। হাসপাতালে ভর্তি আছে ৩৭ জন। প্রতিদিন ৫ থেকে ৭ জন ভর্তি হচ্ছে।
জেলা সিভিল সার্জন বিপাশ খীসা জানান, ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে জেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও কক্সবাজার পৌরসভা সচেতনতামূলক নানা পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। জেলা সদর হাসপাতালে সার্বক্ষণিক ৯ জন চিকিৎসক টেলিসেবা দিচ্ছেন। তিনি আরো বলেন, ডেঙ্গু সচেতনতায় ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৩ লাখ ৫০ হাজার এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ৫০ হাজার মশারি বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া গত জুন ও চলতি মাসে আরো ৯৮ হাজার মশারি বিতরণ কার্যক্রম চলমান।
উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সদর রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়াতে মাইকিংয়ের পাশাপাশি মশার প্রজননের স্থান ধ্বংস করা হচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন জায়গার নালা-নর্দমা পরিষ্কার ও ওষুধ ছিটানো কার্যক্রম হাতে নেয়া হচ্ছে।
কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) কার্যালয় এবং দেশী-বিদেশী আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা নানা পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন আরআরআরসি কার্যালয়ের চিকিৎসা সমন্বয়ক ডা: আবু তোহা ভূঁইয়া।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান হোসাইন সজীব বলেন, উপজেলা বিভিন্ন এলাকায় সচেতনতা বৃদ্ধি ও মশার উৎসস্থল ধ্বংসের জন্য নানা কর্মসূচি হাতে নেয়া হচ্ছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে যে গাড়িগুলো বের হয়, সেগুলোর ভিতরে ¯েপ্র করে বের করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
পালংখালী ইউনিয়নের চেয়াম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, সারা দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। একসময় শুধু নগর এলাকায় প্রকোপ বেশি দেখা গেলেও বর্তমানে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে। ঢাকার পর সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত হচ্ছে কক্সবাজারের মানুষ। এর মধ্যে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিক- এফডিএমএন বা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি, ৯০ শতাংশ। সীমান্ত এলাকার ক্যাম্পগুলোয় মশার বিস্তারের সুযোগ বেশি থাকার পাশাপাশি ভাষাগতভাবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা আত্মস্থ করতে না পারায় রোহিঙ্গাদের মধ্যে ডেঙ্গুর শঙ্কা বাড়ছে।
পর্যটন জেলা কক্সবাজার সিভিল সার্জনের কার্যালয় বলছে, উখিয়া ও টেকনাফের ক্যাম্পগুলোয় ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করে। ক্যাম্পগুলোয় ঘনবসতিপূর্ণ বসবাস, নাজুক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, অপ্রবহমান খাল ও জলাশয়, পলিথিনের ত্রিপল, ছাদে তৈরি ঘর ডেঙ্গু মশার বংশবিস্তারে ভূমিকা রাখছে। তা ছাড়া ভিন্ন ভাষার পত্রিকা, টেলিভিশন চ্যানেল কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারের সাথে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী সম্পৃক্ত হতে না পারায় ক্যাম্পে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে বলে মনে করছে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়।
তা ছাড়া ক্যাম্পগুলোর জলাধার, ড্রেনেজ সিস্টেম, অপ্রবহমান জলাধার এবং ক্যাম্পের ঘরবাড়ি ও পানির ট্যাংকগুলোর কারণে ডেঙ্গু মশার প্রজনন ঝুঁকি বেশি। আবার ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন শহর থেকে পর্যটকের আগমনের কারণেও কক্সবাজারে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বেড়েছে।’
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশের মানুষ ডেঙ্গু সম্পর্কে আগে থেকেই অবগত। তাছাড়া ডেঙ্গুর মৌসুম শুরু হয়ে যাওয়ার পর প্রায় সব ধরনের মিডিয়ায় সচেতনতা বাড়াতে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। রোহিঙ্গারা প্রমিত ভাষায় অভ্যস্ত না হওয়ায় সহজেই ডেঙ্গু সম্পর্কে সচেতন করা সম্ভব নয়। তা ছাড়া দেশের অন্যান্য এলাকার মতো দ্রুত সময়ের মধ্যে চাইলেই ক্যাম্প এলাকায় মশক নিধনসহ সিভিল ওয়ার্কের সুযোগ না থাকায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন তারা।
ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে
কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প অতি ঘনবসতি হওয়ায় মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো হয়ে উঠেছে ডেঙ্গুর ‘হটস্পট’। প্রতিদিন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে...





