রাস্তার দু’পাশে সারি সারি বাস। কোনোটি লম্বালম্বি, আবার কোনোটি আড়াআড়ি রাখা। মনে হয় বাস টার্মিনাল। খালি বাসগুলো এই টার্মিনালে ঢুকছে, আবার বের হয়ে যাচ্ছে। এলাকার মানুষ এই টার্মিনালের জন্য অতিষ্ঠ। অতিষ্ঠ এলাকার ব্যবসায়ী ও পথচারীরা। কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করতে পারেন না। স্থানীয় প্রভাবশালী, এলাকার মাস্তান এবং পুলিশ প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই এখানে বাস টার্মিনাল বানানো হয়েছে। অবৈধ হলেও মানুষের এখন অনেকটা গা সওয়া হয়ে গেছে। এটা রাজধানীর ঢাকা-ডেমরা রোডের কাজলারপাড়ের চিত্র। রাস্তা প্রশস্ত করা হয়েছে; কিন্তু তা ব্যবহৃত হচ্ছে টার্মিনাল হিসেবে। আর কোনো কোনো স্থানে গ্যারেজ বসিয়ে চলছে যানবাহন মেরামত। দিন-রাত এই রাস্তায় প্রায়ই যানজট লাগছে এই অবৈধ টার্মিনালের জন্য। মাসুদ মিয়া নামের স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, রাস্তা বড় হয়েছে মানুষের ভোগান্তি কমানোর জন্য। কিন্তু এই এলাকার মানুষের ভোগান্তি আরো বেড়েছে।
ঢাকা-মাওয়া সড়কের যাত্রাবাড়ী মোড়ে বসেছে শতাধিক বাস কাউন্টার। এই কাউন্টারগুলো থেকে যাত্রীদের টিকিট দেয়া হয়। যাত্রী ওঠার জন্য এখানেও গড়ে উঠেছে মিনি টার্মিনাল। গাড়িগুলো আসছে, রাস্তার পাশে থামছে; আর যতক্ষণ না বাসগুলো কানায় কানায় পূর্ণ হচ্ছে; ততক্ষণ বাসগুলো থেমে থাকছে। যে কারণে এই মোড়ে দিনভর যানজট লেগে থাকছে। দূরপাল্লার বাসগুলো যাত্রাবাড়ী মোড় দিয়ে ঘোরাতে গিয়ে যানজট আরো তীব্র করে দিচ্ছে। এই এলাকার মিজান বাস কাউন্টারের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সবাইকে ম্যানেজ করেই এখান থেকে যাত্রী ওঠানো হয়। প্রতিযাত্রীর জন্য আলাদা করে কমিশন দিতে হয় অনেককেই।
রাজধানীর আরামবাগ পুলিশ বক্স থেকে মতিঝিল কালভার্ট রোড পর্যন্ত গড়ে উঠেছে টার্মিনাল। কুমিল্লার বাসও এখান থেকে ছাড়া হয়। অথচ দূরপাল্লার এই গাড়িগুলো দিনের বেলায় রাজধানীতে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। মতিঝিল ব্যাংক কলোনি এবং টিঅ্যান্ডটি কলোনির ভেতরের রাস্তাটি এখন পুরোপুরি এক বাস টার্মিনাল। টার্মিনালগুলোতে যেভাবে বাস রাখা থাকে এখানেও ওভাবে দিনভর বাস রাখা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কমলাপুরে গড়ে উঠেছে সায়েদাবাদের বিকল্প বাস টার্মিনাল। গোলাপবাগ মাঠের পাশে গড়ে ওঠা মার্কেটে বাস কাউন্টার বসানো হয়েছে। মানিক নগরে রাস্তার পাশে পাশে রয়েছে বেশকিছু কাউন্টার। দুই-তিন সারিতে বাস থামিয়ে এখানে যাত্রী তোলার সময় সাধারণ পথচারীরা যানজটে পড়ে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
পোস্তগোলার বুড়িগঙ্গা ব্রিজের নিচে এবং ব্রিজের উপরে গড়ে উঠেছে পরিবহন স্ট্যান্ড। বাস, লেগুনা এবং সিএনজি অটোরিকশার স্থায়ী স্ট্যান্ড রয়েছে এখানে। অভিযোগ রয়েছে দিগম্বর আলমের লোকজন এই এলাকার টার্মিনাল নিয়ন্ত্রণ করছে। আর এই টার্মিনালের বখরার কমিশন যাচ্ছে বিভিন্ন পর্যায়ে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজধানীর গুলিস্তানের বিভিন্ন স্থানে মূল টার্মিনালের বাইরে গড়ে উঠেছে অবৈধ টার্মিনাল। এসব টার্মিনাল থেকে পুলিশ, স্থানীয় মাস্তান, পরিবহন নেতা ও প্রভাবশালীদের নামে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার চাঁদা আদায় হচ্ছে। এই এলাকা ঘুরে দেখা গেছে মিনি বাস টার্মিনাল ছাড়াও লেগুনা, ম্যাক্সি ও অটোরিকশা স্ট্যান্ড গড়ে উঠেছে। কোনো কোনো স্ট্যান্ড থেকে সিটি করপোরেশনের বরাত দিয়েও টাকা উত্তোলন করা হচ্ছে। বিভিন্ন পরিবহন চালকরা বলেছেন, তারা নিজেদের সুবিধার জন্যই চাঁদা দিয়ে গাড়ি রাস্তায় পার্ক করে রাখেন। টার্মিনালে ঢুকতে ও বের করতে অনেক ঝামেলা। আর এ কারণে সুবিধামতো স্থানে রাস্তায় গাড়ি রেখে দেন তারা। রাজধানীর ঝিগাতলা মোড়ে গড়ে উঠেছে একাধিক অবৈধ স্ট্যান্ড। পুলিশকে টাকা দিয়ে এই স্ট্যান্ডগুলো টিকে আছে। যারা টাকা দেয় না তাদেরকে স্ট্যান্ডে গাড়ি রেখে যাত্রী তুলতে দেয়া হয় না।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নিষিদ্ধ সময়ে দূরপাল্লার বাস এবং ট্রাক প্রবেশ করছে। দিনের বেলায় দূরপাল্লার বাস এবং ট্রাক রাজধানীতে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখের সামনেই নিয়ম লংঘন হচ্ছে। এ ব্যাপারে ট্রাফিকের বিভাগের মাঠ পর্যায়ের একাধিক সদস্য বলেছেন, এসব ম্যানেজ হয় উপর থেকে মাঠ পর্যায়ের কর্তাদের এগুলো নিয়ন্ত্রণের কোনো সুযোগ নেই।