-অপরিকল্পিত হোটেল ও স্থাপনা নির্মাণ
-তিস্তার স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা
হিমালয়ের কোলে অবস্থিত ভারতের উত্তরাখণ্ড ও হিমাচল প্রদেশের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের স্মৃতি এখনো মুছে যায়নি। এর মধ্যে প্রায় একই রকম দুর্যোগের কবলে পড়েছে হিমালয়ের কোলে ভারতের আরেক রাজ্য সিকিম। একেবারে হিমাচলের যোশিমঠ ও উত্তরাখণ্ডের কেদারনাথ বিপর্যয়ের মতোই মেঘভাঙা বৃষ্টি ও হ্রদের পানি ফুঁসে উঠে ভাসিয়ে নিয়ে গেল উত্তর সিকিমের লোনক হ্রদ সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকা। প্রায় দোতলা বাড়ি সমান পানি উঠেছিল। এতে ভেসে গেছে রাস্তা, ভবন, ব্রিজ। সেনাসদস্যসহ এখনো নিখোঁজ রয়েছে বহু মানুষ। ভেঙে গেছে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। কিন্তু কেন এমন ঘটল? এমন প্রশ্নই ঘোরাফেরা করছে সবার মনে। জবাব খুঁজতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা তিন রাজ্যের বিপর্যয়ের পেছনে একই কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে ভবিষ্যতে সিকিমের পরিস্থিতিও উত্তরাখণ্ড প্রদেশের যোশিমঠের মতো হতে পারে। সিকিমের একাধিক হোটেলেও ফাটল দেখা দিতে পারে। ধসে যেতে পারে এলাকা। যোশিমঠকে বাঁচাতে যেমন ইতোমধ্যে বহু স্থাপন ভেঙে ফেলার পরামর্শ দিয়ে নোটিশ জারি করেছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। তবে কেবল যোশিমঠ নয়, হিমালয়-সংলগ্ন সব শহর তথা রাজ্যে জলবায়ু ও ভৌগোলিক পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে পরিকল্পিতভাবে পরিকাঠামো নির্মাণ করতে হবে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যোশিমঠ, কেদারনাথ, সিমলা ও সিকিমের বিপর্যয়ের কারণ প্রায় একই। উত্তরাখণ্ড, হিমাচলের মতোই হিমালয়ের কোলে অবস্থিত সিকিম। যেভাবে গ্লোবাল ওয়ার্মিং বাড়ছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে হিমবাহের ওপর। ফলে সবচেয়ে বিপদের মুখে হিমালয় কোলের রাজ্যগুলো। ২০১৩ সালে যেমন হিমালয়ের কোলে অবস্থিত উত্তরাখণ্ডের কেদারনাথে হিমবাহ বিস্ফোরিত হয়ে ভয়াবহ দুর্যোগ ঘটেছিল, সবকিছু নিমেষের মধ্যে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। প্রায় বছরখানেক আগে একই বিপর্যয় ঘটেছিল যোশিমঠে। ভারতের মানচিত্র থেকে কার্যত নিশ্চিহ্ন হতে বসেছিল যোশিমঠ। মাটি বসে গিয়ে হুড়মুড়িয়ে ধসে গিয়েছিল একাধিক রাস্তা। বড়সড় ফাটল দেখা গিয়েছিল একের পর এক হোটেল ও বাড়িতে। সে অবস্থা হতে পারে সিকিমেও। এমনটাই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা। এবার ঠিক তেমনই ঘটনা ঘটেছে সিকিমে। সিকিমের এই বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ জলবায়ুর পরিবর্তন বলে মনে করা হচ্ছে। এ ছাড়া যেখানে সেখানে অপরিকল্পিত হোটেল ও বড় বড় স্থাপনা নির্মাণ, অসংখ্য জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণসহ তিস্তার স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি, দুর্বল ভূমিকাঠামো ইত্যাদিকে দায়ী করা হচ্ছে। নেপালের ভূমিকম্পকেও দায়ী করছেন কেউ কেউ।
যে লোনাক হ্রদের পানি সিকিমের বর্তমান প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের নেপথ্যে বলা হয় সেই হ্রদটি ইতোমধ্যেই দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে মত দিয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় পানি কমিশন। সংস্থাটির মতে আগে এর এলাকা ছিল প্রায় ১৬৭ হেক্টর। এখন হয়েছে ৬০ হেক্টর। হ্রদের পানি ধারণক্ষমতা কমেছে অর্ধেকেরও বেশি। ফলে অতিরিক্ত যে পানির চাপ তা সহ্য করতে না পারার কারণে সেটি ভেঙে গেছে। কিন্তু কেন হ্রদের এলাকা কমল তা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত কিছু বলেনি পানি কমিশন।
সিকিম বিপর্যয়ের আগে ও পরের কিছু স্যাটেলাইট ছবি প্রকাশ করেছে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো। ছবিগুলো লোনাক হ্রদের নাটকীয় পরিবর্তন প্রকাশ করে। ছবিতে গত ১৭ ও ২৮ সেপ্টেম্বর এবং ৪ অক্টোবর ওই হ্রদ এলাকায় পানির স্তরে ব্যাপকভাবে পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। পানির স্তর বৃদ্ধি পাওয়ার কারণেই এই বিপর্যয় নেমেছে বলে প্রাথমিকভাবে মত প্রকাশ করেছে ইসরো। স্যাটেলাইট ছবিগুলো পর্যালোচনা করে এ নিয়ে আরো তথ্য পেতে চেষ্টা করছে তারা।
সিকিমের প্রশাসন জানিয়েছে, লোনাক হ্রদের কারণে যে বন্যা নেমেছে তাতে মঙ্গন, গ্যাংটক, নামচি এবং পাইকিয়ং জেলার বিভিন্ন এলাকা বিপর্যস্ত হয়েছে। এর ফলে তিস্তা নদীর পানির স্তর বাড়ছে, যার জেরে নিচু এলাকাসহ বাংলাদেশেও বন্যার প্রকোপ দেখা দিতে পারে।
ভারতের পানি বিশেষজ্ঞ ড. সুজীব কর বলেন, সিকিমে যে মেঘ ভাঙা বৃষ্টি হলো তাতে মেঘের গভীরতা থাকলেও মেঘের বিস্তার খুব একটা ছিল না। কেদারনাথে মেঘের গভীরতা ছিল ২৫ কিলোমিটার। বিস্তার ছিল ৯ কিলোমিটার। সেই গভীর পানির স্তম্ভ এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যে ঝরে পড়ে। কিন্তু সিকিমে ঘণ্টায় ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে, যা কেদারনাথের তুলনায় সামান্য। এতেই সিকিমের অবস্থা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।
কেদারনাথ, উত্তরকাশী, সিমলা কিংবা সিকিম, এসব এলাকায় আগামী দিনে এমন পরিস্থিতি উত্তরোত্তর বাড়বে এমনটাই আশঙ্কা গবেষকের। ড. সুজীব করের মতে, বর্ষা তার স্বাভাবিক ছন্দে নেই। তবে ভূমিভাগ এখনো তাপমাত্রা ত্যাগ করতে পারেনি। এ পরিস্থিতি তৈরি হলে প্রচুর জলীয় বাষ্প ভূমিভাগের মধ্যে প্রবেশ করার চেষ্টা করে। স্বাভাবিক অবস্থা থেকে বেশি জলীয় বাষ্প যখনই আসছে তখনই এমন দুর্যোগের সৃষ্টি হয়। এ ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের খড়গপুরের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি ও জিও ফিজিক্স বিভাগের সিনিয়র অধ্যাপক শংকর কুমার নাথ যোশিমঠের বিপর্যয়ের পর বলেছিলেন, সিকিম অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে সিকিমের পরিস্থিতিও যোশিমঠের মতো হতে পারে। সিকিমের একাধিক হোটেলেও ফাটল দেখা দিতে পারে। ধসে যেতে পারে এলাকা।
অধ্যাপক শংকর কুমার নাথ বলেন, অপরিকল্পিতভাবে সিকিমে একাধিক জায়গায় পাহাড়ের ঢালে হোটেল তৈরি করা হয়েছে। আমি সেখানে দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, সিকিমে ভিত শক্ত নয়। এমন জায়গাতেও কোনো নিয়ম না মেনেই দেদার হোটেল নির্মাণ করা হয়েছে। কোনো পাইলট ফলো করা হয়নি।
কিভাবে কাটবে সিকিমের দুর্দশা? ড. সুজীব করের কথায়, যতক্ষণ না বঙ্গোপসাগর শান্ত হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই অবস্থা কমবে না। নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহের আগে এই পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তার মতে, সিকিমের এই দুর্যোগের পেছনে দায়ী মূলত এল নিনো। এর প্রভাবেই প্রতি বছর পাহাড়ি অঞ্চলে এই দুর্যোগ বাড়বে।
ড. সুজীব করের দাবি, সবটাই ঘটছে এল নিনোর জন্য। গত ২১ বছর ধরে এল নিনো বঙ্গোপসাগর ছেড়ে যায়নি। সে কারণেই আমাদের এই দুর্দশা। নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহের পর সূর্য ধীরে ধীরে দক্ষিণ গোলার্ধের দিকে সরে যাবে। তখন ভারত থেকে সরে অস্ট্রেলিয়ার দিকে যাবে এল নিনো।





