শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা
- যে দোষ করিনি, সেই দোষের শাস্তি পেলাম : ড. ইউনূস
- এ রায় অন্যায়, ন্যায়বিচার বঞ্চিত হয়েছি : ব্যারিস্টার মামুন
- নোবেলজয়ী হলেই আইনের ঊর্ধ্বে নয় : খুরশীদ আলম খান
শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলায় শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ চারজনকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সাথে তাদের প্রত্যেককে ২৫ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। গতকাল সোমবার বেলা ৩টায় ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালতের বিচারক বেগম শেখ মেরিনা সুলতানার আদালত এ রায় ঘোষণা করেন।
রায় ঘোষণার পর ড. ইউনূসসহ অন্য তিনজনের পক্ষে আপিলের শর্তে জামিন আবেদন করা হয়। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করে ৫ হাজার টাকা বন্ডে ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ চারজনকে এক মাসের জন্য জামিন দেন।
রায়ে শ্রম আদালত শ্রম আইনের ৩০৩ (ঙ) ধারায় ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে ১০ দিনের কারাদণ্ড দেয়া হয়। অপর দিকে ৩০৭ ধারায় ২৫ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেন আদালত। এ মামলায় অন্য আসামিরা হলেন- গ্রামীণ টেলিকমের এমডি আশরাফুল হাসান, পরিচালক নুরজাহান বেগম ও মো: শাহজাহান।
যে দোষ করিনি, সেই দোষের শাস্তি পেলাম : ড. মুহাম্মদ ইউনূস
রায় ঘোষণার সময় আদালতের আদেশ মনোযোগ দিয়ে শোনেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বেলা ৩টার দিকে রায় পড়া শেষ হলে তিনি আইনজীবীদের সাথে পরামর্শ করে আদালত থেকে বের হয়ে আসেন। আদালতের বাইরে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের ড. ইউনূস বলেন, যে রায় পেলাম, যে দোষ আমরা করিনি। সেই দোষের ওপরে শাস্তি পেলাম। এটা আমাদের কপালে ছিল। জাতির কপালে ছিল আমরা সেটা গ্রহণ করলাম দোষ হিসেবে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কিভাবে আদালত থেকে শেষ পর্যন্ত আমরা ন্যায়বিচার পাবো, সেটা আমাদের এখানে আইনজ্ঞ আছেন তিনি সেটা ব্যাখ্যা করবেন। তবে আজকের এই আনন্দের দিনে আমাদের মনের দুঃখটা রয়েই গেল।
তিনি আরো বলেন, যে দোষ করিনি, সেই দোষের শাস্তি পেলাম। এটাকে যদি ন্যায়বিচার বলতে চান বলেন। এটা আপনাদের ইচ্ছা।
এই রায় অন্যায়, আমরা ন্যায়বিচার থেকে বাঞ্চিত হয়েছি : ব্যারিস্টার মামুন
রায় ঘোষণার পর ড. ইউনূসের আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, তড়িঘড়ি করে আজকের এই রায় দেয়া হয়েছে। এই রায়ে আমরা বিক্ষুব্ধ। এই রায় অন্যায়। এই রায় জনগণের বিরুদ্ধে রায়। আমরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছি। আমরা এর বিরুদ্ধে আপিল করব। তিনি অভিযোগ করেন, আদালত যে রায় দিয়েছেন তার প্রতিটি লাইনে, লাইনে ভুল। লাইনে লাইনে বাদ দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি পূর্ণাঙ্গ জাজমেন্ট না পড়ে শুধু আদেশটি দিয়ে গেলেন। এটা আইনের বরখেলাপ। নিয়ম হচ্ছে আসামির উপস্থিতিতে সম্পূর্ণ জাজমেন্ট শোনানো।
ব্যারিস্টার মামুন বলেন, আমরা এ ব্যাপারে ক্ষুব্ধ। লেবার কোর্টে ড. ইউনূসের মামলা অতিদ্রুত শুনানি করা হয়েছে। এক মাসে ৯ থেকে ১০টি তারিখ দেয়া হয়েছে। তড়িঘড়ি করে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত শুনানি করে তড়িঘড়ি করে আজকের এই রায় দেয়া হয়েছে। এই রায়ে আমরা বিক্ষুব্ধ। এই রায় অন্যায়। এই রায় জনগণের বিরুদ্ধে রায়। আমরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছি। আমরা এর বিরুদ্ধে আপিল করব।
ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, সারা বিশ্ব ড. ইউনূসের সামাজিক ব্যবসা গ্রহণ করেছেন। বাংলাদেশে তিনি ৫২টি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। এই গ্রামীণ টেলিকম একটি সামাজিক ব্যবসা। তিনি অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রপক্ষ এই মামলার কোনো কিছু প্রমাণ করতে পারেনি। আমরা ১০৯টি কনটারডিকশন দিয়েছি। যেখানে একটি কনটারডিকশন দিলেই খুনের আসামির খালাস হয়ে যায়। এর বিরুদ্ধে আমরা আপিল করব। আপিলে আমরা প্রতিকার চাইব।
নোবেল বিজয় হলেই তো আইনের ঊর্ধ্বে না : খুরশীদ আলম খান
কলকারখানা প্রতিষ্ঠান ও পরিদর্শন অধিদফতরের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, এখানে তার বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে লেবার ল’ ভায়োলেট হয়েছে, যা আদালত আমলে নিয়েছেন। তিনি বলেন, আদালত তাদের শোকজ করেছেন, তারা জবাব দিয়েছেন, কিন্তু আদালত তাদের জবাব সন্তোষজনক মনে করেননি। তাদের যেসব ত্রুটি ছিল তা তারা সংশোধন করেননি। বরং সন্দেহাতীতভাবে আমরা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি যে তারা শ্রম আইন লঙ্ঘন করেছেন। বাদিপক্ষের চারজন সাক্ষী ও কিছু ডকুমেন্টসের মাধ্যমে প্রমাণও করেছি।
খুরশীদ আলম খান বলেন, নোবেল বিজয়ী হিসেবে নয়, প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে তার বিচার হয়েছে। আমরা প্রথম দিনেও আর্গুমেন্টে বলেছি। আমরা কোনো কিছু বললেই তারা বলেন- নোবেল বিজয়ী। এখানে কিন্তু বিষয়টা নোবেল বিজয়ী না। আমরা কলকারখানা পরিদর্শনের ক্ষেত্রে কাগজে কলমে ডকুমেন্ট দেখেছি। নোবেল বিজয় হিসেবে তাকে দেখিনি। তাকে আমরা দেখেছি প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে। শ্রম আইন লঙ্ঘন করার অপরাধে তার বিচার হচ্ছে। আমাদের সেই যুক্তিটা আদালত একসেপ্ট করেছেন। তিনি বলেন, কিছু হলেই তারা বলেন নোবেল বিজয়ী। নোবেল বিজয় হলেই তো আইনের ঊর্ধ্বে না। তিনি হতে পারেন নোবেল বিজয়ী। এটা তার ব্যক্তিগত অর্জন। প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে তিনি যে শ্রম আইন লঙ্ঘন করেছেন সেটি আমরা আদালতে উপস্থাপন করেছি। আজকে আদালতের পর্যবেক্ষণেও আসছে যে, আজকে যার রায় হলো সেটি কোনো নোবেল বিজয়ীর বিরুদ্ধে না। শ্রম আইন ভঙ্গকারীর বিরুদ্ধে।
সোমবার বেলা ২টা ১২ মিনিট থেকে এ রায় শুরু হয় ৩টা ১০ মিনিটে রায় ঘোষণা করা শেষ হয়। এর আগে সোমবার বেলা ১টা ৪২ মিনিটে ড. ইউনূস ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালতে এসে উপস্থিত হন। তার সাথে ছিলেন ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন, ব্যারিস্টার খাজা তানভীর আহমেদ ও অ্যাডভোকেট এস এম মিজানুর রহমান।
রাজধানীর বিজয়নগর টেপা কমপ্লেক্সে রায় দেখতে আসেন দেশী-বিদেশী সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীরা। রায় দেখতে আদালতে আসেন মানবাধিকার কর্মী আইরিন খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন প্রমুখ।
এ দিকে ড. ইউনূস রায় ঘোষণা উপলক্ষে সোমবার সকাল থেকে বিজয়নগর টেপা টাওয়ারের আশপাশে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়। ভবনটির সামনে সশস্ত্র পুলিশ সদস্যদের সারিবেঁধে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। এ মামলায় আদালতে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদফতরের পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী খুরশীদ আলম খান ও সিনিয়র আইনজীবী সৈয়দ হায়দার আলী। অন্য দিকে ড. ইউনূসসহ চারজনের পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন। সাথে ছিলেন ব্যারিস্টার খাজা তানভীর আহমেদ, অ্যাডভোকেট এস এম মিজানুর রহমান ও অ্যাডভোকেট মো: ইব্রাহিম।
মামলার বিবরণ : গত ২৪ ডিসেম্বর এ মামলার উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে ১ জানুয়ারি রায় ঘোষণার এই দিন ধার্য করেন আদালত। ওই দিন রাত ৮টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত আদালত উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের শুনানি গ্রহণ করে মামলাটি রায়ের জন্য রাখেন।
আর ২৪ ডিসেম্বর শুনানির শেষ দিনের যুক্তি উপস্থাপনে বেলা ১১টা ৩০ থেকে রাত ৮টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত আদালতে প্রায় ৯ ঘণ্টা বসে ছিলে ড. ইউনূসসহ অপর আসামিরা। গত ৬ নভেম্বর এ মামলার বাদিপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। ওই দিন আদালত ৯ নভেম্বর ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ এ মামলার চারজন আসামির ফৌজদারি কার্যবিধি ৩৪২ ধারায় আত্মপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য রাখার দিন রাখেন।
২০২১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালতে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদফতরের শ্রম পরিদর্শক আরিফুজ্জামান বাদি হয়ে ড. ইউনূসসহ চারজনের বিরুদ্ধে ওই মামলা করেন। মামলায় শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনে নির্দিষ্ট লভ্যাংশ জমা না দেয়া, শ্রমিকদের চাকরি স্থায়ী না করা, গণছুটি নগদায়ন না করায় শ্রম আইনের ৪-এর ৭, ৮, ১১৭ ও ২৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়।
এ মামলায় ড. ইউনূস ছাড়াও গ্রামীণ টেলিকমের এমডি মো: আশরাফুল হাসান, পরিচালক নুরজাহান বেগম ও মো: শাহজাহানকে বিবাদি করা হয়েছে।





