বেড়িবাঁধের দুই পাশে সারি সারি খেজুর গাছ। এভাবে প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গাছ আর গাছ। বছরের অন্য সময় এ বাঁধে মানুষের আনাগোনা খুব বেশি না থাকলেও শীত এলে জমে উঠে এই এলাকা। গাছি, রসের ক্রেতা-বিক্রেতার পদচারণায় মুখর থাকে সব সময়। কাকডাকা ভোর থেকে রাত পর্যন্ত জমজমাট থাকে। চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ইছাখালী ইউনিয়নের বেড়িবাঁধের দুই পাশে শোভা পাচ্ছে দীর্ঘ লাইনের খেজুরগাছ। ওই ইউনিয়নের টেকেরহাট থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার খেজুর গাছ রয়েছে।
বাংলাদেশের মানুষের শীতকালটা যেন রস ছাড়া জমেই না। প্রকৃতিতে এখন চলছে শীতের দাপট, কদর বেড়েছে খেজুর গাছের। গাছের নিচে প্রতিনিয়ত মানুষের বিচরণ। কেউ রসের জন্য গাছ প্রস্তুত করছেন, কেউ গাছ থেকে রস নামাচ্ছেন। অনেকে রস নিয়ে যেতে অপেক্ষায় রয়েছেন। অনেক তরুণ নিজস্ব তত্ত্বাবধানে খেজুরের রস সংগ্রহ করে ভোজনবিলাসীদের চাহিদা মেটাচ্ছেন। অনলাইনে অর্ডার পেলে রস পৌঁছে দিচ্ছেন ঘরে ঘরে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক রসের ব্যবসা করছেন। অনলাইন-অফলাইন মিলিয়ে শুধু মিরসরাইয়ে প্রতিদিন লাখ টাকার রস বিক্রি হচ্ছে। চলতি মৌসুমে প্রায় কোটি টাকার রস বিক্রি হবে এ এলাকায়।
মিরসরাইয়ের উপকূলীয় জনপদ ইছাখালী ইউনিয়ন। বছরের অন্য সময় ভিন্ন পেশায় থাকলেও শীতের পুরো মৌসুমে ব্যস্ত থাকেন রসের ব্যবসায়। বছর কয়েক আগেও এখনকার মতো রস বিক্রি হতো না। নিজেরা খেয়ে যা বাঁচত তা দিয়ে ঝোলাগুড় তৈরি করা হতো। দাম ছিল না তেমন। এখন রস বিক্রি করে লাভের মুখ দেখছেন প্রান্তিকের মানুষগুলো।
শুধু ইছাখালী নয়, পাশের রহমতাবাদ, পূর্ব ইছাখালী নামে আর দু’টি রসের গ্রাম রয়েছে। খেজুর রসের গ্রাম খ্যাত এই তিন গ্রামে এখন রস নিয়ে নির্ঘুম রাত পার করছেন নারী, পুরুষ, শিশু-কিশোররা। মধ্য রাত থেকে সন্ধ্যা অবধি এখানে চলছে রসের মহোৎসব। সেই সাথে রস দিয়ে গুড়। সেই গুড় দিয়ে ভাপা, পুলি, চিতইসহ হরেক রকমের পিঠা-পায়েস তৈরির ধুম। যেন শীতের আমেজের কোনো কমতি নেই সেখানে।
এসব গাছে আড়াআড়িভাবে বাঁধা আছে গাছের দণ্ড। তার ওপর দাঁড়িয়ে কোমরে ও গাছে মোটা রশি পেঁচিয়ে ধারালো বাটাল দিয়ে গাছের শীর্ষ ভাগ চাঁছছেন গাছিরা। কোমরে ঝুলন্ত বেতের টুকরিতে বাটাল সামলে রেখে অন্য হাতে থাকা রসের পাত্রটি ঠিকঠাকভাবে আটকে দিচ্ছেন। সাথে সাথে সেই পাত্রে টপটপ করে ফোঁটায় ফোঁটায় পড়তে শুরু করেছে সুমিষ্ট খেজুর রস। একই কায়দায় অনেক খেজুরগাছ চেঁছে পাত্র ঝুলানোর কাজটি সুনিপুণভাবে করছেন একদল গাছি।
জানা গেছে, করেরহাট, কাটাছড়া, মঘাদিয়া, মায়ানী, সাহেরখালী, খৈয়াছড়া ও ওয়াহেদপুর ইউনিয়নসহ এ উপজেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আনুমানিক ১০ হাজার খেজুরগাছ। তবে গাছির অভাবে সব এলাকায় খেজুর রস সংগ্রহ করা হয় না।
যতেœর অভাবে ও নির্বিচারে নিধনের কারণে গাছের সংখ্যাও কমে এসেছে। বর্তমানে প্রধানত ইছাখালী, মঘাদিয়া, রহমতাবাদ, এই তিন গ্রামে রস সংগ্রহ করা হয়। এখানে আছে দুই শতাধিক গাছি।
ইছাখালী ইউনিয়নের টেকেরহাট এলাকার গাছি মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, ‘ইছাখালী বেড়িবাঁধে আমার ৭০টি খেজুর গাছ রয়েছে। প্রতিদিন ২৫০০ থেকে ৩০০০ টাকার রস বিক্রি করে থাকি। এক মাস ধরে প্রায় এক লাখ টাকার রস বিক্রি করেছি। প্রতি লিটার রস ৫০ থেকে ৬০ টাকায় ৫ লিটার ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় পাইকারি বিক্রি করে থাকি। পাইকারেরা ৫ লিটার রস ৩৫০ টাকা থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি করেন। তিনি আরো বলেন, রস বাজারে নেয়ার প্রয়োজন হয় না, গাছের নিচ থেকে পাইকারেরা রস কিনে নেয়। সীতাকুণ্ড ও ফেনী থেকে লোকজন এসে রস নিয়ে যায়।
রহমতাবাদ এলাকার গাছি নিজাম উদ্দিন ভাণ্ডারী বলেন, আমি বর্গা নিয়ে ৭০টি খেজুর গাছের রস বিক্রি করি। প্রতিদিন ৩৫০০ থেকে ৪০০০ টাকার রস বিক্রি হয়ে থাকে। অনেকে আগে অর্ডার দিয়ে রাখে। মানুষকে চাহিদা মতো রস দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
শুধু সেলিম কিংবা নিজাম নয়, এভাবে রস বিক্রির সাথে যুক্ত রয়েছেন ইছাখালী ইউনিয়নের মোমিনুল ইসলাম, দ্বীন ইসলাম, হোরা মিয়া, বদিউল আলম, আজম খান, জাহাঙ্গীর আলমসহ অন্তত দুই শতাধিক গাছি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা করে রস বিক্রি করে থাকেন তরুণ উদ্যোক্তা মেহেদী হাসান ইমন। ইমন জানান, আমার ফেসবুক আইডিতে রস বিক্রির বিষয়ে পোস্ট করার ভালো সাড়া পেয়েছি। এ পর্যন্ত প্রায় ৮০০ লিটার রস বিক্রি করেছি। প্রতি লিটার রস ৭০ টাকা ধরে বিক্রি করছি। অর্ডার পেয়ে ঠিকানা বরাবরে রস পৌঁছে দেয়া হয়। তিনি আরো বলেন, প্রতিদিন ভোরে গাছি থেকে রস সংগ্রহ করে থাকি। রস বিক্রির লাভের কিছু অংশ মানবিক কাজে খরচ করব ইনশা আল্লাহ।
সত্তরোর্ধ্ব জানে আলম বলেন, একসময় প্রাকৃতিকভাবে পাখিরা খেজুর খেয়ে বীজ ফেললে সেই বীজ মাটিতে পড়ে গাছ গজাত। এভাবেই বেশির ভাগ গাছের জন্ম। একেকটি খেজুরগাছ ৮০-৯০ হাত লম্বা হয়। বাঁচে ১০০-১৫০ বছর। পাঁচ বছর বয়স থেকে খেজুরগাছ রস দেয়া শুরু করে। রসের স্বাদ ভালো পেতে সপ্তাহে তিন দিন সংগ্রহই উত্তম। যে গাছের আঁশ পাতলা সেই গাছের রস হয় বেশি মিষ্টি।
ইছাখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল মোস্তফা বলেন, শীত মানেই খেজুর রস। আমাদের এলাকায় খেজুর রস বিশেষ ঐতিহ্য। যার আলাদা কদর রয়েছে। এ ঐতিহ্য আমাদের ধরে রাখতে হবে। একসময় খেজুরগাছের কোনো যতœ নেয়া হতো না বলেই গাছ কমে গেছে। তবে এখন বাণিজ্যিক আকারে খেজুরগাছের বাগান করছেন কেউ কেউ।
মিরসরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় বলেন, খেজুর গাছের রস বর্তমানে একটি অর্থকরী বিষয় হয়ে উঠেছে। মিরসরাইয়ের ইছাখালীতে অনেক কৃষক এখন রস ব্যবসার সাথে জড়িত রয়েছেন। অনলাইনের কারণে বিপণন বেড়েছে। বিষয়টি মাথায় রেখে এ বিষয়ে কৃষি বিভাগও নানা পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। কৃষি বিভাগের উদ্যোগে আগামীতে কৃষকদের মধ্যে খেজুর গাছের চারা বিতরণ করা হবে।





