বাঙালির রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পটভূমি ও প্রেক্ষাপট গভীরভাবে খেয়াল করলে সচেতন মহলের একটা বিষয় চোখ এড়ানোর কথা নয়। সেটি হলো, বাংলা ভাষা আন্দোলনের পটভূমি তৈরি হয়েছিল সম্পূর্ণ একটি আদর্শিক দ্বন্দ্বের মধ্য থেকে। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের চেয়ে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি ও কংগ্রেস নেতাদেরই বেশি চাওয়া ছিল বাংলা হোক পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার জন্য সেই সময় যারা জোর প্রচেষ্টা করেছেন তারা সবাই ছিলেন হিন্দু এবং কংগ্রেসের সদস্য। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার জন্য জোর কলমে লেখালেখি করলেও নিজেদের ভারতে রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার ব্যপারে তারা ছিল নিষ্প্রভ। মূলত ভারতবাদীদের পাকিস্তানকে ভাঙার ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই হিন্দু-মুসলিম, কংগ্রেস-মুসলিম লীগ, ভারত-পাকিস্তান আদর্শের রাজনীতির বলি হয়েছে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ। কিন্তু এত বড় একটা ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র বুঝে উঠতে দীর্ঘ সময় নিয়েছিল তৎকালীন পাকিস্তানের মুসলিম নেতারা। ‘আ মরি বাংলা ভাষা’ বইয়ের লেখক ও ইতিহাসবিদ ফাহমিদ-উর-রহমান তার বইয়ে লেখেন, ভারতের রাষ্ট্রভাষা যখন হিন্দি করা হয় তখন এর ভাষাভাষী জনসংখ্যা ছিল নগণ্য। বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করার পেছনে সবচেয়ে বেশি যারা কাজ করেছেন তাদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, অন্নদাশঙ্কর রায়, রমেশচন্দ্র মজুমদার, যদুনাথ সরকার, মেঘনাদ সাহা, সুকুমার সেন, বিভূতিভূষণ, অচিন্ত্য, মানিক প্রমুখ।

ফাহমিদ-উর-রহমান এই বুদ্ধিজীবীদের নীতির উদাহরণ দিতে গিয়ে আরো লেখেন, ‘প্রকৃতপক্ষে অন্নদাশঙ্কর ছিলেন একজন ছদ্মবেশী ভারতীয় জাতীয়তাবাদী। হিন্দিই ছিল তার শেষ ঠিকানা। তিনি পূর্ব বাংলায় বাঙালি জাতীয়তাবাদী বাড়-বাড়ন্তের মধ্যে পাকিস্তানের বিনাশ দেখে উল্লসিত হয়েছিলেন এবং ভারতের স্বার্থে পাকিস্তানকে ভেঙে দিয়ে নিষ্কণ্টক হওয়ার জন্য তিনি এ দেশে বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে বৌদ্ধিক রসদ সরবরাহ করেছিলেন। সেকুলারিজম, রেনেসাঁ, মানবিকতা প্রভৃতির চাদর মুড়িয়ে তিনি তার অভিসন্ধিকে গোপন রেখেছেন। এটি তার লেখার কৌশল মাত্র। পশ্চিমবঙ্গের তা-বড় তা-বড় বাঙালি বুদ্ধিজীবী ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিন্দির বাইরে তেমন কিছু চিন্তাও করেননি। তারা কেউই ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে হিন্দির বাইরে বাংলাকে নিয়ে ভাবেননি। ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি’-এর কবি জীবনানন্দও হিন্দিতে অপ্রীতি বোধ করেননি। একমাত্র বুদ্ধদেব বসু ভারতীয় ভাষা কমিশনের তরফ থেকে হিন্দির পক্ষে সুপারিশের প্রতিবাদ করে তার ‘কবিতা’ পত্রিকায় ‘ভাষা, কবিতা ও মনুষ্যত্ব’ নামে একটি প্রতিবাদমূলক নিবন্ধ লেখেন। এখানে তিনি হিন্দির দাপটে বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন এবং অচিরেই যে এটি হিন্দিঘেঁষা বাংলা হয়ে উঠবে তা নিয়েও আশঙ্কা প্রকাশ করেন। হিন্দির ভূমিকাকে তিনি বলেন, ‘‘মদমত্ত ও ব্যভিচারী। তারপরেও বুদ্ধদেব বসু এই প্রবন্ধে ‘যাতে আমরা নিজেদের বাঙ্গালী বলে অনুভব করতে পারি, ভারতীয় বলে জানতে পারি’ এই দুয়ের সমন্বয়ের সম্ভাবনার মধ্যে একধরনের সমাধানের আশা করেছেন।”

অপর দিকে মুসলিম লীগ নেতারা চেয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি ভাষা হিসেবে বাংলা থাকবে। এখানকার কাজকর্ম সব বাংলায় চলবে। কিন্তু পাকিস্তানের লিংগুয়া ফ্রাংকা হিসেবে তারা উর্দুর পক্ষপাতী ছিলেন। এটা ছিল মুসলিম লীগের দলীয় ও আদর্শিক সিদ্ধান্ত। মুসলিম লীগ নেতারা এই সিদ্ধান্তকেই কার্যকর করতে চেয়েছিলেন। এ-দেশের বাঙালি জাতিয়তাবাদীরা মুসলিম লীগের এই সিদ্ধান্তকে রীতিমতো অপরাধ হিসেবে গণ্য করেন এবং এমন একটা ভাব প্রকাশ করেন যে, এই কারণে মুসলিম লীগ নেতারা প্রায় ফাঁসির রশিতে ঝোলার উপযুক্ত। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে একই ‘অপরাধ’ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিন্তু ফাঁসির রশিতে ঝোলার উপযুক্ত বিবেচিত হননি, যদিও তাকে এ-দেশের বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা নিজেদের সাংস্কৃতিক পয়গম্বর হিসেবে বন্দনা করেন। অথচ রবীন্দ্রনাথ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে চাননি। ভারতীয় জাতিগত স্বার্থে হিন্দিকে বানাতে চেয়েছেন রাষ্ট্রভাষা। এই একই যাত্রায় দু-ফল কেন? এটাই বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ফাঁকি এবং এই ফাঁকিটাকেই বাঙালি মুসলিম নেতাদের একাংশ তাৎক্ষণিক উপলব্ধি করতে পারেননি। তাই তারা আদর্শের দ্বন্দ্বে হয়েছেন লজ্জাজনকভাবে পরাজিত।