১৯৪৭ সাল থেকে শুরু হওয়া ভাষাকেন্দ্রিক বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে অনেক মহান ব্যক্তির মতো শামিল হয়েছিলেন রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ। তিনি বাংলা ভাষার সপক্ষে সেই সময় যেমন কবিতা রচনা করেছিলেন আবার উর্দু ভাষাকে ব্যঙ্গ করেও কবিতা লিখেছিলেন। রাষ্ট্রভাষার পক্ষে রাজপথেও তার বিচরণ ছিল। ‘আ মরি বাংলা ভাষা’ বইয়ের লেখক ফাহমিদ-উর-রহমান লিখেন, ফররুখ আহমদকে বলা হয় ইসলামী রেনেসাঁর কবি। সেটি তার একটি পরিচয় বটে। কিন্তু তিনি আসলে ইসলামের মধ্যে মানুষের মুক্তি খুঁজেছিলেন। ১৯৪০-এর দশকে তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের একজন সাংস্কৃতিক যোদ্ধা হিসেবে লেখাজোখা শুরু করেন। মুসলিম লীগের বুর্জোয়া নেতৃবৃন্দের পাকিস্তান ভাবনা আর ফররুখ আহমদের পাকিস্তানবিষয়ক ভাবনা-চিন্তার মধ্যে বিস্তর তফাত ছিল।
ফররুখ আহমদ বিশ্বাস করতেন পাকিস্তান হবে মজলুমের মুক্তির মনজিল। তার এ ভাবনার মধ্যে কল্পনার মিশেল ছিল অবশ্যই। কিন্তু এ ভাবনার মধ্যে কোনো খাদ ছিল না। তরুণ বয়সে তিনি বামপন্থী আন্দোলনের সাহচর্যে এসেছিলেন। হয়তো এ প্রভাবের কারণে তিনি একধরনের ইসলামী সাম্যবাদের ভাবনায় উজ্জীবিত হয়েছিলেন। সেই সাম্যবাদের উজ্জ্বল নমুনা হিসেবে তিনি গ্রহণ করেছিলেন ইসলামের প্রাথমিক যুগের ফারুকি খেলাফতকে। ফররুখ আহমদের সবচেয়ে বড় সাফল্য হচ্ছে পাকিস্তান আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে বাঙালি মুসলিমের জন্য তিনি একটি নতুন সংস্কৃতির ভাষা নির্মাণের চেষ্টা করেছিলেন। যে ভাষার ইঙ্গিত আমরা পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটির পণ্ডিতদের কাছ থেকে এরই পূর্বে পেয়েছি। তার বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘সাত সাগরের মাঝি’ নতুন সংস্কৃতির ভাষার উজ্জ্বল প্রমাণ।

এই ফররুখ আহমদ, যিনি ইসলামি সাম্যবাদে গভীরভাবে বিশ্বাসী, একই সাথে তিনিই আবার রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সমর্থক ও উর্দুর ঘোরতর বিরোধী ছিলেন। তার কবিতার ভাষায় বিস্তর আরবি, ফারসি, উর্দুর মিশেল। তার পরও তিনি উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা চান না। ১৯৪০ ও ৫০-এর দশকে কোনো কোনো ইসলামপন্থীরা বঙ্গীয় মার্কসবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে উর্দুকে জমিদারি ও অভিজাত শ্রেণীর শোষণের সাথে একাকার করে ফেলেছিলেন। কারণ এদের কারো কারো মাতৃভাষা ছিল উর্দু। মার্কসবাদীদের এই বয়ানটি সঠিক নয়। মুসলিম নৃপতিরা এই ভাষার পৃষ্ঠপোষকতা করলেও এটি জনগণের ভাষা হিসেবেই উঠে এসেছিল এবং এ ভাষায় লিখেছেন গালিব, ইকবাল, ফয়েজ আহমদ ফয়েজের মতো কবিরা। ভারতবর্ষের মুসলিম সংস্কৃতির একটা অসাধারণ প্রকাশ মাধ্যম ছিল উর্দু ভাষা এবং এ কারণেই এখানকার মার্কসবাদীরা এই ভাষার ব্যাপারে বিরূপ।
ফররুখ আহমদ রেডিও পাকিস্তানে চাকরি করতেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনার পর তার নেতৃত্বে রেডিওর দৈনন্দিন কাজকর্ম বন্ধ করে সবাই রাস্তায় নেমে আসে। ফররুখ আহমদের এই কাজের সাথে তার সারা জীবনের বিশ্বাসের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। এটির জন্য তাকে বড় রকমের কাফফারা দিতে হয়েছিল। তিনি হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন অস্ত্র তিনিও শত্রুর হাতে তুলে দিয়েছেন। ভাষা আন্দোলন অনেককেই নীলকণ্ঠ বানিয়েছিল এবং ইতিহাসের ট্র্যাজেডি তারা নিজ হাতে মন্থন করেছিলেন। ফররুখ ছিলেন সেই লোকেদের একজন।