বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় স্বচ্ছন্দ বিচরণকারী কবি, সাহিত্যিক, গল্পকার, গীতিকার ও নানান মৌলিক গুণের অধিকারী ছিলেন আল মাহমুদ। তিনি বায়ান্নর ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে অবদান রেখে বেড়ে উঠেছেন, আবার একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধেও সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন। আশ্চর্যের বিষয়, কবি আল মাহমুদ ছোট থেকেই টুকটাক কবিতা লিখলেও তার প্রথম মুদ্রিত কবিতা ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়াকেন্দ্রিক সংগঠিত ভাষা আন্দোলন কমিটির লিফলেটে ছাপানো চার লাইনের ছোট্ট একটি কবিতা।
ভাষা আন্দোলনে তার অংশগ্রহণের স্মৃতি নিয়ে তিনি তার বই ‘যেভাবে বেড়ে উঠিতে বিস্তারিত লিখেছেন। আল মাহমুদ তার ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে লিখেছেন, আমি নিজে ভাষা আন্দোলনের একজন কর্মী। ভাষা আন্দোলনের জন্য আমার প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়াই আর হয়নি। এ সময়ে আমার জীবনের প্রধান ঘটনা হলো ভাষা আন্দোলন, যা আমার জীবনের স্বাভাবিক গতিধারাকে সম্পূর্ণ পাল্টে দেয়। ১৯৫২ সালের ভাষা বিদ্রোহ ও রক্তপাত হঠাৎ সারা দেশে বিদ্যুৎপ্রবাহের মতো ছড়িয়ে পড়লে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেও এর স্পর্শ লাগে। সারাটা শহর যেন মুহূর্তের মধ্যে কেঁপে ওঠে। ছাত্র ও শিল্পীরা মিছিল করে রাস্তায় নেমে আসে। আমরা কয়েকজন ছাত্র স্টেশনে ঢাকার খবরের জন্য অধীর অপেক্ষায় কাল কাটাতে থাকি। সে সময় আমার অন্তরঙ্গ বন্ধুদের মধ্যে দু’জনের নাম খুব মনে পড়ে। একজন তাজুল ইসলাম ও অন্যজন মুহম্মদ মুসা। আমরা তখন নিয়াজ মোহাম্মদ হাইস্কুলের ছাত্র। এই আন্দোলনে বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ভাষা আন্দোলন কমিটিতে তাজুলের যোগদান ছিল অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা। আমার এই বন্ধুটি জন্মসূত্রে বাঙালি নয়, বিহারি।

বিহার প্রদেশেরই কোনো অঞ্চলে যেন আদি বাড়ি। সততা, ন্যায়নিষ্ঠা ও আদব-কায়দার জন্য এরা সারা শহরের মানুষের প্রিয়পাত্র ছিল। যদিও এদের মাতৃভাষা ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান মূলত উর্দুতেই চলত, তবুও বাংলাভাষা শেখার জন্য এদের ব্যাকুলতার শেষ ছিল না। তাজুল এই পরিবারের একমাত্র ছেলে। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও উর্দুর বদলে বাংলাকে তার পড়াশোনার মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিল। বায়ান্ন সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে ভাষা আন্দোলনকারী ঢাকার ছাত্র-মিছিলের ওপর গুলি চলার ঘটনাটি যখন সারা দেশকে উত্তপ্ত করে তুলল তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেও এর জের বইতে লাগল। আমি, তাজুল ও মুসা শহরের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের একপ্রকার নেতৃত্বের স্থানে অধিষ্ঠিত। গান-বাজনা বা কবিতার আসর আমাদের ছাড়া কেউ চিন্তাও করতে পারত না। যদিও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো জায়গায়, যা এককালে উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল।
সেখানে আমাদের মতো পুচকে ছোকরাদের নেতৃত্ব দেয়ার মতো কোনো যোগ্যতাই ছিল না। তবুও কেন জানি আমরা মনে করতাম এ শহরের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নাক গলানোর মতো অধিকার আমাদের আছে। আমি, তাজুল ও মুসা ব্রাহ্মণবাড়িয়া ভাষা আন্দোলন কমিটির ডাকে সর্বান্তকরণে আন্দোলনে যোগ দিলাম। যেখানে সেখানে ঢাকার কেন্দ্রীয় আন্দোলনকে সহায়তা অর্থাৎ অর্থ সংগ্রহ করার জন্য বক্তৃতা করে বেড়াতে লাগলাম। ভাষা আন্দোলন কমিটির যে লিফলেট ছাপার জন্য প্রেসে গেল এর শিরোনামের ওপর ছাপার জন্য মুহম্মদ মুসা আমার খাতা থেকে লাগিয়ে দিলো আমার চার লাইন কবিতা। যদিও এই দীর্ঘকাল পরে এক কিশোর কবির চার লাইন কবিতার কী অর্থ ছিল, কবিতার পঙ্ক্তিগুলোই বা কী, তা একদম বিস্মৃত হয়েছি। তবুও এই চারটি লাইন আমার জীবনে যে দুঃখ বহন করে এনেছিল তার কোনো তুলনা নেই।

কবি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ভাষা আন্দোলন কমিটির একটি লিফলেটে আমার চার লাইন কবিতা যেদিন ছাপা হয়ে মুহম্মদ মুসার কাছে আসে ঠিক সেদিন আমাদের বাড়িতে পুলিশ হানা দেয়। লিফলেটগুলো তখনো বিলি হয়নি। ছাপা ও বিতরণের দায়িত্ব সম্ভবত মুসাকেই দেয়া হয়েছিল, আমার ঠিক মনে নেই, শুধু মনে আছে লিফলেটগুলো যে প্রেসে ছাপা হচ্ছিল আমরা সারাটা সকাল সেখানে কাটিয়ে বাড়ি ফিরছি। আমি আমাদের বাড়ির গেটে এসে পৌঁছামাত্রই পুতুল নামের আমার এক বোন যে ছিল একদা শোভার সহপাঠিনী, শিক্ষক ও সাংবাদিক গফুর মাস্টারের মেয়ে- কোথা থেকে যেন দৌড়ে এসে বলল, ‘পালাও। তোমাদের ঘরবাড়ি পুলিশ সার্চ করছে। তোমাকে খুঁজছে। বইপত্র সব তছনছ করে কী যেন খুঁজছে।’
আমি পুতুলকে পেছনে রেখে পূর্বদিকের কলেজের মাঠ পেরিয়ে তিতাস পাড়ের শ্মশান ঘাটের দিকে হাঁটা দিলাম। হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম আন্দোলনের নেতৃস্থানীয়দের বাড়িতে হানা না দিয়ে পুলিশ আমাদের বাড়িতেই কেন প্রথম সার্চ শুরু করেছে? পরে অবশ্য জেনেছিলাম প্রেস থেকে লিফলেটের কপি আইবির লোকদের হস্তগত হলে তারা লিফলেটের মাথায় আমার নামসহ চার লাইন কবিতা দেখতে পায়। লিফলেটটিতে যেহেতু অন্য কারো নাম ধাম ছিল না, ছিল শুধু ভাষা আন্দোলন কমিটি শব্দটি। সে কারণে এই আন্দোলনে কারা কারা জড়িত আছে এই তথ্য বের করার জন্য তারা আমাদের বাড়িতে হানা দিয়েছে। যেহেতু চার পঙ্ক্তি কবিতা রচয়িতার নাম সেখানে আছে সে সূত্র ধরেই তারা সার্চ শুরু করেছে- যদি বাকি লিফলেট উদ্ধার করা যায়। এরপর নিয়াজ মোহাম্মদ স্কুল ত্যাগ করে আমার চাচা আবদুল হক মীরের (থানা অ্যাগ্রিকালচার অফিসার) সাথে চলে যাই এবং দাউদকান্দি থানার জগৎপুর গ্রামে জগৎপুর স্কুলে ক্লাস সেভেনে বা এইটে ভর্তি হই। পরে আমার চাচা সীতাকুণ্ডে বদলি হয়ে গেলে আমি সীতাকুণ্ড স্কুলে ভর্তি হই এবং মেট্রিকুলেশন পর্যন্ত পড়ি। আগে থেকেই কবিতা লেখা শুরু করেছিলাম। ভাষা আন্দোলনের লিফলেটে চার লাইনের কবিতা ছাপাই হলো আমার প্রথম মুদ্রিত কবিতা।