আইনজীবীদের শীর্ষ সংগঠন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচন আগামী ৬ ও ৭ মার্চ। সর্বোচ্চ আদালতের আইনজীবীদের এ নির্বাচন নিয়ে ইতোমধ্যেই প্রচার-প্রচারণায় মেতেছেন আইনজীবীরা। এবারের নির্বাচনে সরকারপন্থী সাদা ও বিএনপিপন্থী নীল প্যানেলের বাইরে সভাপতি ও সম্পাদক পদে আরো বেশ কয়েকজন প্রার্থী হয়ে ভোটের মাঠে প্রচারণায় নেমেছেন।

এ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ সমর্থিত সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদের (সাদা) প্যানেলে সভাপতি পদে সিনিয়র আইনজীবী আবু সাঈদ সাগর এবং সম্পাদক পদে সিনিয়র আইনজীবী শাহ মঞ্জুরুল হক নির্বাচন করছেন।
অন্য দিকে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য প্যানেলে সভাপতি পদে ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন এবং সম্পাদক পদে ব্যারিস্টার মো: রুহুল কুদ্দুস কাজল নির্বাচন করছেন।

জানা গেছে, ২০২৪-২৫ সেশনে বার নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ সমর্থিত সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদের (সাদা প্যানেল) সবার প্রার্থিতা বৈধ হয়েছে। একইভাবে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য প্যানেল (নীল প্যানেল) থেকেও সবার প্রার্থিতা বৈধ হয়েছে। এই দুই প্যানেলের বাইরে সভাপতি পদে ইউনুছ আলী আকন্দ ও এম কে রহমানের প্রার্থিতা বৈধ হয়েছে। সম্পাদক পদে সাদা ও নীল প্যানেলের বাইরে নাহিদ সুলতানা যুথি ও ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়ার প্রার্থিতা বৈধ হয়েছে। কোষাধ্যক্ষ পদে সাদা ও নীল প্যানেলের বাইরে সাইফুল ইসলামের প্রার্থিতা বৈধ হয়েছে।

নির্বাচনে এম কে রহমান ও নাহিদ সুলতানা যুথি : এবার নির্বাচনে সভাপতি পদে এম কে রহমান প্রার্থী হয়েছেন। তিনি আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবী হিসেবে পরিচিত। ২০০৯ সালের মার্চে সরকার তাকে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল পদে নিয়োগ দেয়। এরপর ২০১৪ সালের মে মাসে সরকার আবার তাকে অব্যাহতি দেয়। সাধারণ আইনজীবীদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ আইনজীবী হিসেবে এম কে রহমানের ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। এ কারণে তিনি প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করলে সাদা প্যানেলের ভোট ভাগাভাগি হতে পারে। অন্য দিকে সাদা প্যানেলের বিপরীতে নীল প্যানেল থেকে সভাপতি পদে মাহবুব উদ্দিন খোকন নির্বাচন করছেন। তিনি এর আগে বারবার সম্পাদক পদে নির্বাচিত হয়েছেন।

এ বিষয়ে এম কে রহমান বলেন, আমি মনোনয়নপত্র দাখিল করেছি। আশা করছি প্রার্থিতা বৈধ ঘোষিত হবে। আমি প্রার্থিতা প্রত্যাহার করব না। তিনি বলেন, বারটাকে এখানে রাজনীতির বাইরে রাখতে হবে। তিনি বলেন, আমরা আশা করি নির্বাচনের যে সাব কমিটি হয়েছে তারা একটি ভালো, একটি সুন্দর নির্বাচন করবে।

সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচনে সাদা ও নীল প্যানেলের বাইরে সম্পাদক পদে প্রার্থী হয়েছেন, বারের সাবেক কোষাধ্যক্ষ ও যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশের স্ত্রী নাহিদ সুলতানা যুথি। তিনি রাজশাহী ইউনিভার্সিটি ল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের (রুলা) প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। উত্তরবঙ্গ আইনজীবী সমিতির সভাপতিও নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ প্যানেল থেকে নির্বাচন করে সুপ্রিম কোর্ট বারে কোষাধ্যক্ষ পদেও নির্বাচিত হয়েছেন। আইনজীবী হিসেবে তারও ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে।

নাহিদ সুলতানা যুথি বিজয়ী হতে না পারলেও দু’জন একই ঘরানার হওয়ার কারণে সাদা প্যানেলের ভোট ভাগাভাগি হবে। এতে নীল প্যানেলের প্রার্থীর বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।

এ বিষয়ে নাহিদ সুলতানা যুথি সাংবাদিকদের বলেছেন, সুপ্রিম কোর্ট বারে আমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন দেখতে চাই। যে নির্বাচনে বারের কোনো হস্তক্ষেপ থাকবে না, কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আমরা আমাদের এই নির্বাচনে দেখতে চাই না। এই নির্বাচন কমিশন সুন্দর একটা নির্বাচন উপহার দেবে এমনটিই আমরা চাই। তিনি বলেন, আইনজীবীরা ভোটাধিকার ফিরে পেতে চায়। আমি সাধারণ আইনজীবীদের একটি কণ্ঠ, তাদেরই একজন বোন আমি। তারা ভোট দিয়ে আমাকে নির্বাচিত করবে, এই প্রত্যাশা করছি। আমি প্রার্থিতা প্রত্যাহার করব না। আমি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকব এবং নির্বাচনে লড়ে যাবো।

সাদা প্যানেলের সম্পাদক প্রার্থী যা বললেন : বার নির্বাচন নিয়ে সাদা প্যানেলে প্রার্থী শাহ মন্জুরুল হক বলেন, বার নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে। আর সেই নির্বাচনে সাদা প্যানেল বিপুল ভোটে জয়লাভ করবে বলে আমি আশা করছি। তিনি আরো বলেন, নির্বাচনে বিজয়ী হলে এই বার হবে ঐকমত্যের বার। সবাইকে সাথে নিয়ে আইনজীবীদের যাবতীয় সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করব। বিশেষ করে তরুণ আইনজীবীদের বসার ব্যবস্থা, দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণসহ বার ও বেঞ্চের মধ্যে দৃঢ় সেতুবন্ধন গড়ে তোলা হবে। তিনি বলেন, আইন পেশাকে স্মার্ট পেশায় রূপান্তিত করতে চাই। তিনি বলেন, স্মার্ট আইন পেশার জন্য ডিজিটালাইজেশন প্রয়োজন। আমি নির্বাচিত হলে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেব। তিনি বলেন, এবার নির্বাচনে আমি জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী। আমি নির্বাচিত হলে আইনজীবীদের পেশাগত এবং আর্থিক যেসব সমস্যা আছে, তার সমাধান করব। এ ছাড়া বারের অবকাঠামো উন্নয়ন লাইব্রেরিসহ পেশাগত উন্নয়নে ভূমিকা রাখব।

নীল প্যানেলের সম্পাদক প্রার্থী যা বললেন : নির্বাচনে নীল প্যানেলের সম্পাদক প্রার্থী রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, গত দু’টি নির্বাচন জোর-জুলুম করে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্মান নষ্ট করে বার জবরদখল করে নেয়া হয়েছে। যদিও এবারো বিতর্কিত ব্যক্তি নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে রয়েছেন। তার পরও আমরা নির্বাচন সাব কমিটির প্রধানের ওপর আস্থা রাখতে চাই- এবার বারের নির্বাচন সুষ্ঠু ভোট হবে বলে প্রত্যাশা রাখছি। তিনি বলেন, সুষ্ঠু ভোট ও নিরপেক্ষ গণনা হলে আমাদের বিজয় নিশ্চিত।

রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, আমরা নির্বাচন কমিশনের কাজ গভীরভাবে অবজারভেশন করছি। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে এক ধরনের আশঙ্কা রয়েছে। তবুও আমরা প্রত্যাশা করছি যে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা গত দুই বছরে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতিতে নজিরবিহীন ঘটনা কলঙ্কের অধ্যায় সৃষ্টি করেছে। এ কারণে সাধারণ মানুষের কাছে আইনজীবীদের মাথা যে হেঁট হয়েছে সেটি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন প্রয়োজন। আমরা নির্বাচন কমিশনের কাজ অবজারভেশন করছি, এ মুহূর্তে বলতে পারছি না। তারা নির্বাচনটা স্বচ্ছ করবেন কি না। তবে আমরা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্যে আছি। আমরা বিজ্ঞ আইনজীবীদের আহ্বান জানাতে চাই, আপনারা ভোট দিন, আপনারা নেতা নির্বাচিত করুন। সুপ্রিম কোর্ট বারে দীর্ঘ দিনের অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে যে গণতন্ত্রের চর্চা আছে সেটি যেন অব্যাহত থাকে।

নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচন পরিচালনা সাব কমিটির সদস্য ও সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক ট্রেজারার মো: কামাল হোসেন বলেন, ভোট সুষ্ঠু হবে। বার নির্বাচনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোটগ্রহণের জন্য এবার আমরা যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়েছি। সবাইকে নিয়ে আমরা একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করতে চাই। কামাল হোসেন বলেন, আমরা গত দু’টি নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পারেনি। তবে আশা করছি এবার একটা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারব।

২০২৪-২৫ মেয়াদে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির (বার) নির্বাচনের জন্য গত ১১ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির (বার) নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন সমিতির সম্পাদক আব্দুন নূর দুলাল। তফসিলে আগামী ৬ ও ৭ মার্চ ভোটগ্রহণের দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।

নির্বাচনে সাদা প্যানেলের প্রার্থীরা হলেন সভাপতি পদে আবু সাঈদ সাগর, সম্পাদক শাহ মঞ্জুরুল হক, দু’জন সহসভাপতি পদে রমজান আলী শিকদার ও দেওয়ান মোহাম্মদ আবু ওবায়েদ হোসেন সেতু, কোষাধ্যক্ষ পদে মোহাম্মদ নুরুল হুদা আনসারী, দু’টি সহ-সম্পাদক পদে হুমায়ুন কবির ও হুমায়ুন কবির পল্লব। সাতটি সদস্য পদে সৌমিত্র সরদার রনী, মো: খালেকুজ্জামান ভূঁইয়া, রাশেদুল হক খোকন, মাহমুদা আফরোজ, বেলাল হোসেন শাহীন, খালেদ মোশাররফ রিপন, রায়হান রনী।
আর জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য প্যানেল থেকে মনোনীত বিভিন্ন পদের প্রার্থীরা হলেন- সভাপতি পদে এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, সম্পাদক পদে মো: রুহুল কুদ্দুস (কাজল), দু’জন সহসভাপতি পদে মো: হুমায়ুন কবির মঞ্জু ও সরকার তাহমিনা বেগম সন্ধ্যা, কোষাধ্যক্ষ পদে মো: রেজাউল করিম, দু’টি সহ-সম্পাদক পদে মাহফুজুর রহমান মিলন ও মো: আবদুল করিম। সাতটি সদস্য পদে ফাতিমা আক্তার, সৈয়দ ফজলে এলাহি অভি, মো: শফিকুল ইসলাম শফিক, মো: রাসেল আহমেদ, মো: আশিকুজ্জামান নজরুল, মহিউদ্দিন হানিফ ও মো: ইব্রাহিম খলিল।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির (বার) সভাপতি, সম্পাদকসহ মোট ১৪টি পদ রয়েছে। ২০২৪-২৫ সেশনের নির্বাচনে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ২৫ ফেব্রুয়ারি। প্রার্থী পরিচিতি ৪ মার্চ। আর ৬ ও ৭ মার্চ ভোট অনুষ্ঠিত হবে।