বহুল আলোচিত পিলখানায় বাংলাদেশ রাইফেলস-বিডিআর (পরিবর্তিত নাম বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি) বিদ্রোহের ঘটনায় দায়ের হওয়া দুটি মামলার মধ্যে হত্যা মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে চূড়ান্ত শুনানির অপেক্ষায়। রাষ্ট্রপক্ষ বলেছে, এই মামলাটির শুনানির জন্য আলাদা একটি বেঞ্চ প্রয়োজন।
এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, এ মামলার আপিল শুনানির জন্য স্পেশাল কোর্ট প্রয়োজন। তিনি বলেন, যেহেতু এই মামলা হাইকোর্টে তিনজন বিচারপতি শুনেছেন। সে জন্য আপিল বিভাগে এ মামলার শুনানি করতে চারজন বিচারপতি প্রয়োজন। এই মামলা শুনানি করতে আমার মনে হয় ৩০ থেকে ৪০ কার্যদিবস প্রয়োজন হবে।
অন্য দিকে বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে করা মামলাটির বিচার কাজই শেষ হয়নি। ১৫ বছর আগের মামলাটিতে সাক্ষ্য নিচ্ছেন বিচারিক আদালত। অথচ হত্যা মামলায় খালাস পাওয়া এবং সাজা খেটে ফেলা ব্যক্তি বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলার আসামি হওয়ায় জেলে আটকে আছেন।
বকশীবাজার আলিয়া মাদরাসা ময়দানে স্থাপিত ঢাকার মহানগর সিনিয়র স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো: আছাদুজ্জামানের আদালতে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ চলছিল। তবে তিনি অবসরে যাওয়ায় তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন বিচারক মোহাম্মদ আসসামস জগলুল হোসেন। তার আদালতেই হবে পরবর্তী বিচার কাজ। রাষ্ট্রপক্ষের ১৩৪৫ জন সাক্ষীর মধ্যে এ পর্যন্ত সাক্ষ্য দিয়েছেন ২৭৩ জন। পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ২৮ ও ২৯ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য রয়েছে।
এ মামলার বেশির ভাগ আসামিপক্ষের আইনজীবী আমিনুল ইসলাম এ প্রতিবেদককে বলেন, সুপ্রিম কোর্টের লিস্টে এ মামলার আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। আমরা শুনানির অপেক্ষায় রয়েছি। শুনানির জন্য আসলে আমরা শুনানি করব। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ বলছে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিচারক না থাকায় এ মামলার শুনানি হচ্ছে না। অপর দিকে রাষ্ট্রের শীর্ষ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন এ প্রতিবেদককে বলেন, এই মামলার আপিল শুনারি জন্য স্পেশাল কোর্ট প্রয়োজন। সেটা হলেই শুনানি শুরু হবে। এখানে ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল আছে। সে কারণে তারা আপিল ফাইল করেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের কাছে সাজা অপর্যাপ্ত মনে হয়েছে। সে জন্য আমরা ক্রিমিনাল পিটিশন ফাইল করেছি। অপর্যাপ্ত সাজার বিরুদ্ধে। আপিলের সাথে শুনানি হবে। তিনি বলেন, যেহেতু এই মামলা হাইকোর্টে তিনজন বিচারপতি শুনেছেন। সে জন্য আপিল বিভাগে এ মামলার শুনানি করতে চারজন বিচারপতি প্রয়োজন।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এই মামলার শুনানি করতে নতুন বেঞ্চ দরকার। যেহেতু অন্য মামলাগুলো শুনতে হয়। আশা করি অচিরেই নতুন বিচারপতি আসবেন এবং এই মামলার শুনানি হবে। তিনি বলেন, অচিরেই বিচারক নিয়োগ হবে। বিচারক নিয়োগ হলেই এ মামলার শুনানি শুরু হবে। অনেকগুলো মানুষ এখানে জড়িত। তারাও দ্রুত শুনানি করতে চাচ্ছে। আমরাও দ্রুত শুনানি করতে চাচ্ছি।
আমিন উদ্দিন বলেন, হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছেন সেই সাজা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আশা করছি হাইকোর্টের সাজা বহাল থাকবে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগেও হাইকোর্টের সাজার রায় বহাল থাকবে।
তিনি বলেন, বিস্ফোরক আইনের মামলায় ২৫৭ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে। এখানে এক হাজারের মতো সাক্ষী আছে। আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি এ মামলার পরবর্তী তারিখ ধার্য রয়েছে। এখানে বিস্ফোরক আইনে অনেকগুলো ঘটনা। অনেকেই জড়িত। কে দেখেছে কাকে দেখেছে সবই বলতে হবে। আসামির সংখ্যা ৮০০-র বেশি। তিনি বলেন, এ ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। তারা যেভাবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মেরে ফেলেছে তা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়। এই অপরাধের যাতে দৃষ্টান্তমূলক সাজা হয়। ভবিষ্যতে যাতে কেউ এ ধরনের ঘটনা ঘটাতে না পারে। এখানে বিচারটা চুলচেরা বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
২০১৭ সালের ২৬ ও ২৭ নভেম্বর বিচারপতি মো: শওকত হোসেন, বিচারপতি মো: আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি মো: নজরুল ইসলাম তালুকদারের হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ পিলখানা হত্যা মামলার রায় দেন। রায় ঘোষণার দুই বছরের বেশি সময় পর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। রায়ে নিম্ন আদালতের দেয়া ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন হাইকোর্ট। এ ছাড়া যাবজ্জীবন দেয়া হয় ১৮৫ জনকে। আর ২০০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়। খালাস পান ৪৫ জন।
বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় দুটি ফৌজদারি মামলা করা হয়। এর একটি ছিল হত্যা মামলা আর অন্যটি বিস্ফোরক আইনের মামলা। হত্যা মামলায় ৮৫০ জনের বিচার শেষ হয় ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর। এতে ১৫২ জনের মৃত্যুদণ্ড, ১৬০ জনের যাবজ্জীবন ও ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়। আর ২৭৮ জন খালাস পান।
পিলখানায় বিডিআর হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায়ের পর ২০৪ জন আসামি পৃথক আপিল ও লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করেছেন। খালাস পাওয়া ও সাজা কমা ৮৩ আসামির ক্ষেত্রে ২০টি লিভ টু আপিল করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। এখন এসব আপিল ও লিভ টু আপিল শুনানির অপেক্ষায়।
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর সদর দফতরে ঘটে নারকীয় হত্যাকাণ্ড। ওই ঘটনায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন প্রাণ হারান। বিচারের মুখোমুখি করা হয় ৮৪৬ বিডিআর জওয়ানকে। মামলার অন্য চার আসামি বিচার চলাকালে মারা যান।





