নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে অস্থিরতা কোনোভাবেই থামছে না। দীর্ঘ দিন ধরে পণ্যের দাম এই বাড়ছে এই কমছে- এই ওঠানামা করায় কিছু কিছু পণ্যের দাম কমলেও ক্রেতারা সুফল পাচ্ছে না। আবার কোনো কোনো পণ্যের দাম বিনা নোটিশে হুটহাট করে বেড়ে যাচ্ছে। কয়েক দিন বাদেই পবিত্র রমজান শুরু হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা বললেও শেষতক কোথায় গিয়ে ঠেকে তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা সংশয় রয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এক প্রকার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে আওয়ামী লীগ সরকার।
সরকারের শীর্ষ মহল থেকে চ্যালেঞ্জের বিষয়টি স্বীকারও করেছেন। খোদ প্রধানমন্ত্রীও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বাজার নিয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট ভাঙার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। এমনকি গত ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের একতরফা জয়ের মধ্য দিয়ে সরকার গঠনের পরই গঠিত মন্ত্রিসভাকে বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং সাধারণ মানুষকে এর সুফল ভোগের বিষয়টি নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেন সরকার প্রধান। তবুও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার এখনো সিন্ডিকেটের কবজায় থাকায় হতাশ দেশের সাধারণ মানুষ। পবিত্র রমজানেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম হু হু করে বাড়ার আশঙ্কা করছেন অনেকেই।
এদিকে দ্রব্যের দাম যেভাবে বাড়ছে, সেটা নিয়ে চ্যালেঞ্জ আছে বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। সম্প্রতি তিনি সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, দ্রব্যের দাম বাড়ছে, এটা বাস্তবতা, অস্বীকার করে লাভ নেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসা একটি চ্যালেঞ্জ আছে। প্রধানমন্ত্রী প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা নেয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। এটা নিয়ে আমরা কাজ শুরু করে দিয়েছি।
আওয়ামী লীগের মধ্যমসারির একাধিক নেতা বলেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে নানা সংশয় ছিল। সেটা ইতোমধ্যে কেটে গেছে। মন্ত্রিসভা গঠন হয়েছে। মন্ত্রিসভার আকারও ইতোমধ্যে বৃদ্ধি করা হয়েছে। সেই চ্যালেঞ্জ উতরাতে পারলেও দ্রব্যমূল্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা ও এর সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া নতুন সরকারের জন্য বড় ধরনের একটি চ্যালেঞ্জ। নেতারা মনে করেন, গত এক যুগে বিএনপি ও তার মিত্ররা কোনো আন্দোলনেই সফল হতে পারেনি। কারণ তাদের ইস্যুটা ছিল তাদের দলের জন্য, সাধারণ জনগণের জন্য তারা কোনো আন্দোলন করেনি। এবার বিএনপি ও তার মিত্ররা দ্রব্যমূল্য নিয়ে ধীরে ধীরে সক্রিয় হচ্ছে। ইতোমধ্যে তাদের অনেক নেতাই জামিনে মুক্ত হয়ে জেল থেকে বের হয়েছেন। তাদের শীর্ষ নেতারা এখন নিয়মিত দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি নিয়ে সরব হয়ে উঠেছেন। বিএনপির মিত্র দলগুলো রাজপথে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে নিয়মিত মিছিল মিটিং করছেন। এটা একটি ইস্যু হয়ে গেলে জনঅসেন্তাষ দেখা দিতে পারে। সেটা মোকাবেলা করা আওয়ামী লীগ ও সরকারের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। যদিও সরকারের উচ্চপর্যায়ের মনিটরিং সেল বাজার ব্যবস্থা নিয়ে কাজ শুরু করেছে। আগামী রমজানে হয়তো কিছুটা সুফল মিলতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা বলেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠন করেই বাজার ব্যবস্থার ওপর নজর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ জন্য মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনা দিয়েছেন। সিন্ডিকেট যত শক্তিশালী হোক তা কৌশলে ভেঙে দেয়ার কাজ চলছে। রমজান সামনে রেখে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। নিয়মিত বাজার মনিটরিং হচ্ছে। তবে এই সিন্ডিকেট একদিনে গড়ে উঠেনি বলে মনে করেন ওই নেতা। তিনি আরো বলেন, বাজার ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট ভাঙতে একটু সময় লাগবে। এ জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারের সুফলও পেতে কিছু সময় লাগবে। তা ছাড়া এটা শুধু দেশের বাজারের ওপর নির্ভর করছে না, বিশ্বব্যবস্থার স্থিতিশীলতাও এখানে জরুরি।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম এমপি নয়া দিগন্তকে বলেন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে, মানুষ কষ্টে আছে এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। যেসব মানুষ কষ্টে আছে তাদের সাথে আমরা সমব্যথি। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আনা নতুন সরকারের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ। প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। সরকার এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। দ্রব্যমূল্য নিয়ে সরকারের পাশাপাশি দলের কোনো করণীয় রয়েছে কি না জানতে চাইলে বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, আওয়ামী লীগেরই তো সরকার। দ্রব্যমূল্য যখন বৃদ্ধি পায় তখন তো মানুষের মধ্যে প্রতিক্রিয়া হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার সিন্ডিকেটের কারণে মানুষ যে কষ্টে আছে এটা সত্য। ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করবে এটা একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া কিন্তু যেভাবে জিনিসপত্রের দাম তারা বাড়ায় এটা অনৈতিক। যারা এমন ঘটনার জন্য দায়ী তাদের আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করা উচিত। শুধু মনিটরিং নয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নিতে হবে বলে তিনি মনে করেন। অবশ্য ব্যবসায়ীদের ঢালাওভাবে ধরপাকড় করেও বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না বলে আওয়ামী লীগের এই নেতা মনে করেন।
রমজান মাসের বাইরেও নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলে জানান বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটু। গতকাল এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আমাদের টার্গেট রমজানে যেন ভোক্তাদের বেশি দামে পণ্য কিনতে না হয়। আমাদের টার্গেট শুধু রমজান নয়, রমজান মাসের পরও নিত্যপণ্যের বাজার স্বাভাবিক থাকবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ কোনো ব্যবসায়ী বা কোনো গোষ্ঠীর হাতে যেন সাধারণ মানুষ জিম্মি না থাকে। বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, শুক্রবার থেকে ভোজ্যতেলের মনিটরিং শুরু হয়েছে। আজ সকাল থেকেও সব মিলগেটে টিমগুলো মনিটরিংয়ে আছে।