শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ সাতজনকে শ্রমিক-কর্মচারীদের কল্যাণ তহবিলের ২৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় জামিন দিয়েছেন আদালত। গতকাল ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক আস সামছ জগলুল হোসেনের আদালতে তিনি আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করেন। আদালত উভয় পক্ষের শুনানি শেষে ড. ইউনূসসহ সাতজনের জামিন মঞ্জুর করেন। একই সাথে এ মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ২ এপ্রিল দিন ধার্য করেছেন আদালত।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত থেকে জামিন পেয়ে আদালতের সামনে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, এটা ঐতিহাসিক একটি সময়। আজকের ছবিটি তুলে রাখুন। আপনারা ইতিহাসের সাক্ষী। কী জন্য? এটা সাক্ষী হলো যে, এটা একটা ঐতিহাসিক ঘটনা। যেহেতু একজন নোবেলজয়ীকে অর্থ আত্মসাৎ, জালিয়াতি ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আমি একা নই, আমরা আরো সাতজন। যারা সারা জীবন কঠোর পরিশ্রম করেছি গরিব মানুষের জন্য। যারা চাকরি করতে এখানে আসেননি। তারা তাদের জীবন দানের জন্য এখানে এসেছেন। তারা এই অর্থ আত্মসাৎ, জালিয়াতি ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগের জন্য অপেক্ষা করছেন। কাজেই এই ছবিটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ছবি হবে। তারা এখানে উপস্থিত আছেন। তারা জন্ম জন্মান্তরে বলতে পারবেন তারা এখানে উপস্থিত ছিলেন।

তিনি আরো বলেন, আপনারা বিবেচনা করুন, দুর্নীতি দমন কমিশন আজকে একটি বিচারে বসল, এটা সঠিক কারণে হয়েছে কি না, সঠিকভাবে হয়েছে কি না। এ দিনে দুদকের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হলো একজন নোবেল বিজয়ীকে। এটা রেকর্ডেড। জাতির অংশ হয়ে থাকবে। এটার জন্য কি আমরা গর্ববোধ করব নাকি অপরাধ বোধ করব? যারা সারাজীবন খেটে এ প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করে গেলেন, তাদেরও মামলার আসামি করা হলো।
এর আগে বেলা ২টা ৩০ মিনিটে দুদক মামলায় জামিন চেয়ে আদালতে আত্মসমর্পণ করেন ড. ইউনূসসহ অন্যরা।
আদালতে ড. ইউনূসের পক্ষে জামিন আবেদনের শুনানি করেন আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন। সাথে ছিলেন ব্যারিস্টার খাজা তানভীর আহমেদ ও অ্যাডভোকেট এসএম মিজানুর রহমান।
দুদকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল।

যুক্তরাষ্ট্রসহ ৫ দেশের প্রতিনিধিরা বিচারকার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে আসেন : এ দিকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মামলার বিচারকার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নেদারল্যান্ডের হাইকমিশন থেকে প্রতিনিধিরা আদালতে আসেন। তারা মামলার শুনানির সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
শুনানিতে ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ সাতজনের পক্ষে দুদকের দায়ের করা মামলায় আত্মসমর্পণ পূর্বক জামিন আবেদন করছি। তিনি বলেন, এই মামলায় যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। এই ধরনের কোনো অপরাধের সাথে উনারা সম্পৃক্ত নন। আমরা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ সাতজনের জামিন আবেদন করছি।
অপর দিকে দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, এ মামলায় গ্রামীণ টেলিকমের কর্মীদের লভ্যাংশের ৪৩৭ কোটি টাকা দেয়া হয়। ওই অর্থের ৬ শতাংশ ২৬ কোটি টাকা সিবিএ নেতাদের দেয়া হয়েছে। এটাই মামলা। ১৬৪ জন কর্মীকে বঞ্চিত করে সিবিএ নেতাদের দেয়া হয়েছে। আমাদের আবেদন ২৬ কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়েছে। ড. ইউনূসসহ অন্যদের জামিন আবেদনে আপত্তি আছে।
উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত জামিন মঞ্জুর করে আদেশ দেন। এর আগে গত ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সিনিয়র স্পেশাল জজ আছাদুজ্জামানের আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দুদকের উপ-পরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান। অন্য দিকে গত ২৯ জানুয়ারি দুদকের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত কমিশন বৈঠকে ড. ইউনূসসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট অনুমোদন দেয়া হয়।
চার্জশিটভুক্ত ১৪ আসামি হলেন- গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ ইউনূস, ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল ইসলাম, পরিচালক ও সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশরাফুল হাসান, পরিচালক পারভীন মাহমুদ, নাজনীন সুলতানা, মো: শাহজাহান, নূরজাহান বেগম ও পরিচালক এস এম হাজ্জাতুল ইসলাম লতিফী, অ্যাডভোকেট ইউসুফ আলী, অ্যাডভোকেট জাফরুল হাসান শরীফ, গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মো: কামরুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ মাহমুদ হাসান, শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের দফতর সম্পাদক কামরুল হাসান ও প্রতিনিধি মো: মাইনুল ইসলাম।

এ বিষয়ে দুদক সচিব মো: মাহবুব হোসেন সাংবাদিকদের জানান, গ্রামীণ টেলিকমের কর্মচারীদের পাওনা লভ্যাংশের মধ্যে অ্যাডভোকেট ফি হিসেবে প্রকৃতপক্ষে হস্তান্তরিত হয়েছে মাত্র এক কোটি টাকা। বাকি ২৫ কোটি ২২ লাখ ৬ হাজার ৭৮০ টাকা চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বোর্ড সদস্যদের সহায়তায় গ্রামীণ টেলিকমের সিবিএ নেতা এবং অ্যাডভোকেটসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সেটেলমেন্ট অ্যাগ্রিমেন্টের শর্ত লঙ্ঘন করে জাল-জালিয়াতির আশ্রয়ে আত্মসাৎ করেছেন। একই সাথে অর্থ স্থানান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে অবস্থান গোপন করে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন তারা, যা দণ্ডবিধি ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ অবস্থায় আসামি গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯/ ৪২০/ ৪৬৭/ ৪৬৮/ ৪৭১/ ১০৯ ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় কমিশন থেকে চার্জশিট দিতে অনুমোদন দেয়া হয়েছে।
গত ৩০ মে গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিক-কর্মচারীদের কল্যাণ তহবিলের ২৫ কোটি ২২ লাখ ৬ হাজার ৭৮০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে দুদক। সংস্থার উপ-পরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান বাদি হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। এরপর গত ২৯ জানুয়ারি দুদকের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত কমিশন বৈঠকে ড. ইউনূসসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট অনুমোদন দেয়া হয়। নতুন করে একজন আসামি যুক্ত হয়েছে। তিনি হলেন গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের দফতর সম্পাদক কামরুল হাসান।

শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলায় ড. ইউনূসের জামিনের মেয়াদ বৃদ্ধি : শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলায় নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ অন্যদের জামিনের মেয়াদ বৃদ্ধি করেছেন আদালত। রোববার শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের সদস্য জেলা ও দায়রা জজ এম এ আউয়ালের আদালত জামিন আবেদনের ওপর শুনানি শেষে ড. ইউনূসসহ চারজনের জামিন মঞ্জুর করেন। তবে জামিনের মেয়াদ কত দিন হবে সেটা পরে জানাবেন বলে আদালত আদেশের সময় উল্লেখ করেন। এ ছাড়া আগামী ১৬ এপ্রিল এ মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ ধার্য করেন আদালত।
এ দিকে জামিনের মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন করতে বেলা পৌনে ১১টার দিকে রাজধানীর কাকরাইলে শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে আসেন ড. ইউনূসসহ অন্যরা।
এ মামলায় জামিনের মেয়াদ বৃদ্ধির আদেশের পর আদালত থেকে বের হয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস সাংবাদিকদের বলেন, আমি ন্যায়বিচার আশা করব। বিচার বিভাগ থেকে মানুষ ন্যায়বিচার পাবে এটাই তো প্রত্যাশা। বিচারের ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে কি না- সাংবাদিকদের এ প্রশ্নের জবাবে ড. ইউনূস বলেন, প্রক্রিয়া সম্পর্কে আপনারা বলবেন। এ বিষয়ে আমার কোনো ধারণা নেই। তিনি বলেন, আপনাদের সামনেই সব কিছু হচ্ছে। আপনারাই বিচার করবেন।
আদালতে ড. ইউনূসের পক্ষে আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন জামিন আবেদনের শুনানি করেন। সাথে ছিলেন ব্যারিস্টার খাজা তানভীর আহমেদ ও অ্যাডভোকেট এ এস এম মিজানুর রহমান। অপর দিকে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদফতরের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী অ্যাডভোকেট খুরশিদ আলম খান।

শুনানিতে ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, আমরা আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত জামিনের মেয়াদ বৃদ্ধি করার আবেদন করছি। তিনি বলেন, জামিন আমাদের অধিকার। আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত জামিনের মেয়াদ বৃদ্ধি করার এখতিয়ার আদালতের রয়েছে। আমরা আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত জামিনের মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন করছি।
অপর দিকে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদফতরের আইনজীবী খুরশিদ আলম খান আদালতে বলেন, জামিনের বিষয়টি আপনার বিষয়। তবে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দেয়া যেতে পারে। এরপর আদালত বলেন, প্রথম তারিখে আমি বলিনি স্থায়ী জামিন। আমি বলেছিলাম জামিন মঞ্জুর। এরপর আদালত আদেশ দেন। আদেশে বলেন, জামিনের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হলো। কত দিন হবে তা পরে বলব। এর আগে গত ২৮ জানুয়ারি শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলায় ছয় মাসের কারাদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে খালাস চেয়ে ড. ইউনূসসহ চারজনের আপিল শুনারি জন্য গ্রহণ করেন আদালত। একইসাথে ড. ইউনূসসহ চারজনকে ৩ মার্চ পর্যন্ত জামিন দেন। একই সাথে ড. ইউনূসসহ চারজনের বিরুদ্ধে শ্রম আদালতের দেয়া রায়ের কার্যাকারিতাও স্থগিত করেন আদালত। জামিনের মেয়াদ শেষ হওয়ায় রোববার সকালে তারা জামিনের মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য আবেদন করেন।