বাবা-মা ও তিন বোন নিয়ে সানজিদা আক্তারের সংসার। বাবা স্থানীয় একটি হোটেলে কাজ করেন। বোনদের বিয়ে দেয়া ও বাড়িতে ঘর তৈরি করার সময় এনজিও ও স্থানীয়দের থেকে সুদে অনেক টাকা ঋণ করেন তার বাবা। পরে সে টাকা শোধ করার জন্য প্লাস্টিকের বেত দিয়ে তারা বিভিন্ন টুকরি বানানোর কাজ শুরু করেন। যার মজুরি হিসেবে দৈনিক ৬০০ টাকা পান। অভাব অনটনের সংসারে ওই অর্থ দিয়ে ঋণ শোধ করার পাশাপাশি সচ্ছলতা এসেছে তাদের সংসারে। শুধু সানজিদা নয়, এভাবে প্লাস্টিকের টুকরি তৈরি করে, ফাতেমা মনিসহ চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার প্রায় দুই হাজার গ্রামীণ নারীর জীবন বদলে গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার মিঠাছরা, আবুতোরাব, আবুরহাট, শান্তিরহাট, কমরআলী, বড়দারোগাহাট, জোরারগঞ্জ বাজারের মতো প্রাচীন হাটগুলোতে এখনো প্রত্যক্ষ করা যায় অনেক মানুষের জীবিকা নির্বাহের প্রধান উপকরণ আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতির ঐতিহ্য বাঁশ। বাঁশ দিয়ে তৈরি স্থানীয় ভাষায় ঢালা, কুলা, চালনি, পানডালা, মাছ ধরার ঝুড়ি, চাটাই, খেলনা, কলমদানি, ফুলদানি, বাঁশি কিংবা গৃহসজ্জার বাহারি পণ্য বিক্রি করে সংসার চলে তাদের। এভাবেই এ অঞ্চলে বাঁশ শিল্পের সাথে জড়িত দুই সহস্রাধিক পরিবার।

আমবাড়িয়া গ্রামের হাজেরা আক্তার (৪০) বাঁশ দিয়েই মোড়া তৈরি করে সংসার চালান। মোড়া বিক্রি থেকে প্রতি মাসে আয় হয় প্রায় ১০ হাজার টাকা। স্বামী সিরাজ মিয়াও এ কাজে সহযোগিতা করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার হিঙ্গুলী ইউনিয়নের দক্ষিণ মেহেদীনগর, উত্তর মেহেদীনগর ও স্টেশন গ্রামের অধিকাংশ পরিবারই আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল। আগে শিতল পাটি বুনা ও বাঁশ থেকে তৈরি বেত দিয়ে বিভিন্ন হস্তশিল্প তৈরি করে সংসার চালাতেন নারীরা। যা দিয়ে পরিবারের ভরণ পোষণে আর্থিক ভূমিকা রাখতে পারতেন তারা। এখন শিতল পাটির প্রধান কাঁচামাল পাটি বেত ও পাহাড়ে সামাজিক বনায়নের ফলে উৎপাদন কমে যাওয়ায় আগের মতো বাঁশ পাওয়া যায় না। বিগত ৮-১০ বছর আগে মেহেদী নগর গ্রামে প্লাস্টিকের বেত দিয়ে বিভিন্ন সাইজের টুকরি, হাতপাখা, ঢালা, লাইসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরির কাজ শুরু করেন কয়েকজন উদ্যোক্তা। প্রথমে কয়েকটি পরিবার ক্ষুদ্র আকারে প্লাস্টিকের বেত দিয়ে টুকরি তৈরির কাজ শুরু করলেও এখন তা হিঙ্গুলী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে ছড়িয়ে গেছে। গ্রামের মহিলার পারিবারিক কাজ শেষ করে অবসর সময়ে প্লাস্টিকের টুকরি তৈরির কাজ করেন। পাইকাররা প্লাস্টিকের বেত সরবরাহ করেন; সেই বেত দিয়ে বিভিন্ন সাইজের টুকরি তৈরি করে আবার পাইকারদের কাছে দেন তারা। ছোট টুকরি ১৭ টাকা, মাঝারি টুকরি ২৫ টাকা, বড় টুকরি ৬০ টাকা মজুরিতে কাজ করেন তারা। প্রতিদিন ১৫-২০টি টুকরি তৈরি করতে পারেন একজন নারী। প্রতি সপ্তাহে সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার টাকা আর মাসে প্রায় ১২ হাজার টাকা আয় করেন একজন নারী। পাইকাররা নারীদের হাতে তৈরি প্লাস্টিকের টুকরি দু-তিন দিন পরপর সংগ্রহ করে বিভিন্ন মাছের আড়ত, সবজির পাইকারি বাজারসহ ঢাকা-চট্টগ্রামের বিভিন্ন বড় বাজারে নিয়ে গিয়ে তা বিক্রি করেন। তবে নারীদের কোন পুঁজি না থাকায় পাইকাররা তাদের অল্প মজুরি দিয়ে বেশি দামে টুকরি বাজারে বিক্রির করার অভিযোগ করেন কেউ কেউ। তাদের যদি সরাসরি সরকারি প্রণোদনা দেয়া যায় তাহলে তারা লাভবান হবেন টুকরি বিক্রি করে।

উদ্যোক্তা মো: জসিম উদ্দিন জানান, মেহেদীনগর গ্রাম থেকে প্রতি মাসে প্রায় ২০ লাখ টাকার টুকরি দেশের বিভিন্ন বাজারে বিক্রির জন্য নেয়া হয়। প্লাস্টিকের বেতের তৈরি টুকরিগুলো দিয়ে মাছ, সবজি কাঁচামালসহ অন্যান্য দ্রব্যাদি একস্থান থেকে অন্য স্থানে সহজে প্রেরণ করা হয়। টুকরিগুলো অনেক টেকসই এবং দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় অনেকদিন ব্যবহার করা যায়।
এ ছাড়া ফ্যাশন ডিজাইন ও ক্রিস্টাল শোপিচ ও ডেকোরেটেড কেন্ডেল মেকিং (মোমবাতি) ট্রেডে প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন সাবলম্বী হয়েছেন। অন্যের মুখাপেক্ষী না হয়ে এখন নিজেরাই হাল ধরছেন সংসারের। অনেকের দুঃখে ভরা জীবনের গল্প পরিবর্তন হতে শুরু করেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মহিলাবিষয়ক অধিদফতর কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ‘উপজেলা পর্যায়ে মহিলাদের জন্য আয়বর্ধক (আইজিএ) প্রশিক্ষণ’ শীর্ষক প্রকল্পের মিরসরাইয়ে ১৮তম ব্যাচে ফ্যাশন ডিজাইন এবং ক্রিস্টাল শোপিচ ও ডেকোরেটেড কেন্ডেল মেকিং (মোমবাতি) ট্রেডে এই পর্যন্ত প্রায় ৯০০ জন নারী প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। আছমা নূরী ও রিমা রানী দু’জন ট্রেইনার তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। উপস্থিতির হারে প্রতিদিন যাতায়াত খরচ বাবদ প্রশিক্ষণ শেষে প্রতিজনকে ২০০ টাকা করে ১২ হাজার টাকা দেয়া হয়। ক্রিস্টাল শোপিচ তৈরিতে ছক্কা পুঁতি, পৃথিবী পুঁতি, পাল পুঁতি, লাউ পুঁতি, কাপরাঙ্গা পুঁতি, ডায়মন্ড পুঁতি, রগ সুতা প্রধানত ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ক্রিস্টাল শোপিচে ১০০ টাকা থেকে শুরু করে ১০ হাজার টাকার পণ্যও তৈরি করা হয়ে থাকে। যেখানে পুঁজির চেয়ে ৩গুণ বেশি লাভ হয়ে থাকে। ফল, হাতের ব্যাগ, টিস্যু বক্স, ওয়ালমেট, পাখি, ফুল, ফলদানি, টুপিসহ বিভিন্ন শোপিচ তৈরি করা যায়। উদ্যোক্তারা তৈরিকৃত পণ্য স্থানীয় দোকানের পাশাপাশি অনলাইনে বিক্রি করে থাকেন।

হিঙ্গুলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সোনা মিয়া বলেন, আমার ইউনিয়নের প্রায় ৫ শতাধিক মহিলা প্লাস্টিকের বেত দিয়ে টুকরি তৈরি করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন। গ্রামের বেশির ভাগ মহিলা বিভিন্ন এনজিও থেকে বেশি সুদে ঋণ নিয়ে জর্জরিত। তফসিলি ব্যাংক ও সরকারি বিভিন্ন সংস্থা যদি তাদের সহজ শর্তে ঋণ এবং আর্থিক প্রণোদনা দেয় তাহলে টুকরি তৈরির পরিমাণ আরো বেড়ে যাবে।
উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা মেহের আফরোজ বলেন, মহিলাদের আত্মকর্ম সংস্থানের জন্য মহিলাবিষয়ক অধিদফতর কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ‘উপজেলা পর্যায়ে মহিলাদের জন্য আয়বর্ধক (আইজিএ) প্রশিক্ষণ’ শীর্ষক প্রকল্প চালু করা হয়। যার মাধ্যমে নতুন নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি হচ্ছেন। প্রশিক্ষণ শেষে ব্যবসার জন্য কেউ যদি ঋণ নিতে চান তাহলে আত্মকর্ম সংস্থানের জন্য ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্পের আওতায় আমার দফতর থেকে ঋণ দেয়া হয়ে থাকে।