‘প্রক্টর অফিসে উত্ত্যক্ত করার লিখিত অভিযোগ দেয়ার পর দুই মাস পার হয়ে গেলেও কোনো স্টেপ নেয়া হয়নি, উত্ত্যক্তকারী আমার ডিপার্মেন্টের পলিটিক্যাল হওয়ায়। এটার রেমিডি কেউ বলতে পারেন? আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের এমনিতেও কখনো মূল্য ছিল না এনাদের (প্রক্টরিয়াল বডির)। আর কত অযাচার করবে? এত সিভিয়ার একটা ইস্যুতে তাদের কোনো স্টেপ নাই, ছেলে পলিটিক্যাল বলে। এখানে আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরা বানের জলেই ভেসে আসছি বলে ওরা মনে করে, এজন্য এত ইনজাস্টিস’।
আত্মহত্যার দুই মাস আগে গত ১৬ জানুয়ারি এটাই ছিল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থী অবন্তিকা ফাইরুজের স্ট্যাটাস। ‘খাদিজার মুক্তি চাই’ হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে এই স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন তিনি। তার এসব অভিযোগ মোড় ঘুরিয়ে দিচ্ছে অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনার। রূপ নিচ্ছে নতুন বিশ্লেষণের।
জবি সূত্রে জানা যায়, আম্মান বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ইব্রাহীম ফরাজির কর্মী। তবে ইব্রাহিম ফরাজি বলেন, আম্মান সেভাবে ছাত্রলীগ করত না। ডিবেটিংয়ের সুবাদে মাঝে মাঝে সাঈদের সাথে আসত। এই ঘটনার পরে জানতে পারি এটাই আম্মান।

আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় অবন্তিকার মা তাহমিনা বেগম উল্লেখ করেন, লাকি আক্তার লাকি ও রাফিসহ আরো কয়েকজন আমার মেয়ের ওপর নজর রেখে বিভিন্নভাবে মানসিক নিপীড়ন দিতে থাকে। এই লাকি আক্তারও জবি ছাত্রলীগের সভাপতি ইব্রাহীম ফরাজির একনিষ্ঠ কর্মী। লাকি ছাত্রী হলে থাকেন। ছাত্রী হলেও ছাত্রলীগের প্রভাব দেখিয়ে অবন্তিকাকে মানসিক নিপীড়ন করা হতো। যার কারণে অবন্তিকা হলে থাকতে পারেনি।
এ দিকে আম্মানসহ উত্ত্যক্তকারী বাকি সহপাঠীদের কয়েকজন ছাত্রলীগের কর্মী হওয়ায় গত বছরের নভেম্বরে অবন্তির দেয়া অভিযোগ কোনো আমলেই নেননি সাবেক প্রক্টর মোস্তফা কামাল। বরং এর আগে আম্মানসহ তার সহপাঠীরা অবন্তিকার নামে অভিযোগ দিলে তার বাবা-মাকে ডেকে এনে মুচলেকা নেয়াসহ হেনস্তা করা হয়। অভিযোগ আছে, শুধু অবন্তিকাই নয়, পান থেকে চুন খসলেই ভোগান্তির শিকার হন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তাদের সাথে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের কোনো ঝামেলা হলে সাবেক প্রক্টরিয়াল বডির সাথে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ইব্রাহীম ফরাজি ও সাধারণ সম্পাদক এস এম আক্তার হোসাইন মীমাংসা করতেন।

প্রক্টর অফিসে বিচার দিয়ে প্রতিকার না পাওয়ায় মানসিক ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে প্রায় অনেক শিক্ষার্থীর মুখে। গত জানুয়ারি মাসে সাবেক প্রক্টর মোস্তফা কামালের সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমি ব্যবস্থাপনা ও আইন বিভাগের শিক্ষার্থী আলী নূর রহমান বাসে ছাত্রলীগের কিছু কর্মীর দ্বারা হেনস্তার শিকার হন। এর বিচার চেয়ে প্রক্টর অফিসে অভিযোগ দেন তিনি। কিন্তু এখনো কোনো বিচারই পাননি। আলী নূর নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, জায়াগা পেয়ে বাসের সিটে বসলে পরীক্ষার আগে আমাকে আধঘণ্টা আটকিয়ে রাখে তারা। এখনো আমি বিচার পাইনি। বিচার পাব বলে মনে হচ্ছে না।
জবির মেডিক্যাল সেন্টারে চিকিৎসাসেবা নেয়ার সময় ২০২৩ সালের ১ আগস্ট সৌরভ দাশ নামে রসায়ন বিভাগের এক শিক্ষার্থীকে মারধর করেন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের অনুসারী নেতাকর্মীরা। এ ঘটনায়ও সৌরভ দাশ বিচার পাননি।
উত্ত্যক্তকারীরা ছাত্রলীগের সাথে জড়িত বলে প্রক্টর অফিসে অবন্তির অভিযোগে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি- এ বিষয়ে সাবেক প্রক্টর মোস্তফা কামালের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অবন্তিকা অভিযোগ দেয়ার পর তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি। প্রক্টর অফিসে সেও আর যোগাযোগ করেনি। যোগাযোগ করলে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতাম। আমরা যেকোনো ঘটনায় ব্যবস্থা নিয়েছি।

এ দিকে অবন্তিকার মৃত্যুর পর ছাত্রলীগ নিজেদের দোষ ঢাকতে উল্টো বিচারের আন্দোলনে কর্মী পাঠায়। পরে জবি প্রশাসন অভিযুক্তদের বহিষ্কার ও আইনের আওতায় আনার মতো সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিলেও আন্দোলনের হুমকি দিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা চালাচ্ছে। জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাসে পছন্দের ঠিকাদারদের ২০০ কোটি টাকার মাটি ভরাটের টেন্ডার পাইয়ে দিতে তারা নেপথ্যে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে কর্মী ঢুকিয়ে আন্দোলন চলমান রেখেছে। আত্মহত্যার পর মা তাহমিনা বেগম বলেন, অবন্তিকা বলত লাকি, আম্মান পলিটিক্যাল। তাকে বিভিন্নভাবে ভয় দেখাত। লাকি ছিল সবকিছুর নাটের গুরু। তাদের সাথে রাফি, রিমি, মাহিমা, গিতাসহ ৮-১০ জন ছিল। লাকি, রিমিসহ আরো কয়েকজন হলে থাকে। তাদের অত্যাচারে আমার মেয়ে হলে থাকতে পারেনি। আমার মেয়ে খুব মেধাবী। প্রথম থেকে তৃতীয় পর্যায়ে রেজাল্ট ছিল। রাফি প্রথম হবে বলে অবন্তিকে মানসিকভাবে হেনস্তা করে রেজাল্ট খারাপ করাতে চাইত। মানসিক ট্রমার ভেতর রাখত। অবন্তিকার মৃত বাবাকে নিয়ে নানা কটূ কথা বলত। দীর্ঘদিন ধরে মানসিক অত্যাচারে আমার মেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।
এ বিষয়ে জবির প্রক্টর ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেছেন, আমি ২০-২৫ দিন হলো দায়িত্ব পেয়েছি। ঘটনাগুলো অনেক পুরনো। তবুও একটি একটি করে সব অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব। প্রক্টর অফিসে সবাই সমান।
আর ভিসি ড. সাদেকা হালিম বলেছেন, ঘটনাগুলো সব আগের। আমি দায়িত্ব নেয়ার পর একের পর এক অভিযোগ নিষ্পত্তি করছি। অবন্তিকার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিয়েছি। তদন্তে দায়ি প্রমাণিত হলে যেই হোক তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।