বড় আকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) করা হলেও বাস্তবায়নের চিত্র হতাশাজনক। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি মাত্র ৩১.১৭ শতাংশ, যা গত ১৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। চলতি অর্থবছরের মতো কখনো এত কম এডিপি বাস্তবায়ন হয়নি। অর্থবছরের বাকি চার মাসে ৬৮.৮৩ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে হবে শতভাগ অর্জনে। এডিপির ৩০ শতাংশও বাস্তবায়ন করতে পারেনি ২০টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বরাদ্দের হিসেবে কয়েকটি মন্ত্রণালয় ছাড়া বেশির ভাগই তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারছে না। বাস্তবায়ন হারের এমন বেহাল দশা অর্থবছর শেষে এডিপি লক্ষ্য পূরণে দেখা দিয়েছে শঙ্কা। বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এডিপিতে এক হাজার ৩৯২টি প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ রয়েছে ২ লাখ ৭৪ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা। প্রথম ৮ মাসে ৫৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের তত্ত্বাবধানে থাকা এসব প্রকল্পের বিপরীতে খরচ হয়েছে মাত্র ৮৫ হাজার ৬০২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের মাত্র ৩১ দশমিক ১৭ শতাংশ। এটাই হলো বাস্তবায়ন অগ্রগতি। সর্বনিম্ন এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছিল ২০২২-২৩ অর্থবছর। সেটাও চলতি অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ১ শতাংশ বেশি বা ৩২.১০ শতাংশ ছিল।
আইএমইডির তথ্য বলছে, এডিপির ৩০ শতাংশও বাস্তবায়ন করতে পারেনি ২০টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। এর মধ্যে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। এডিপিতে তাদের জন্য বরাদ্দ ৯ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকা। কিন্তু আট মাসে খরচ করতে পেরেছে মাত্র ১ হাজার ৩৭৮ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ মোট বরাদ্দের মাত্র ১৩.৮৮ শতাংশ। এরপরেই মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ। আট মাসে এ বিভাগ বাস্তবায়ন করেছে ১৪.৭১ শতাংশ।
বিগত অর্থবছরের আট মাসের এডিপি বাস্তবায়নের হার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছিল ২০১২-১৩ অর্থবছরে। সেই সময় এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল মোট বরাদ্দের ৪৪ শতাংশ। এ ছাড়া ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৩৯.১৩ শতাংশ, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৩৮.০১ শতাংশ, ২০১৫-১৬ ও ২০২০-২১ সালে ছিল ৩২ শতাংশের ওপরে। বাকি বছরগুলোতে ৩৭ শতাংশের ওপরে ছিল এডিপি বাস্তবায়নের হার। এমনকি ২০১০-১১১ অর্থবছরেও ছিল ৩৭ শতাংশ। চলতি অর্থবছর এডিপিতে সরকারি অর্থ ও বিদেশী ঋণের টাকা খরচও বিগত অর্থবছরের তুলনায় কম।
এ দিকে চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি মাসে এসে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। শুধু ফেব্রুয়ারি মাসে এডিপি বাস্তবায়নে খরচ হয়েছে ১১ হাজার ১৩৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা। অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি মাসে বাস্তবায়ন হয়েছে ৪.০৬ শতাংশ। গত ২০২২-২৩ অর্থবছরের একই মাসে খরচ হয়েছিল ১০ হাজার ৭৯ কোটি ৭৬ লাখ টাকা, যা বরাদ্দের ৩.৯৪ শতাংশ। অর্থাৎ মাসের হিসেবে চলতি অর্থবছরের এডিপি বাস্তবায়ন হার গত অর্থবছরের চেয়ে বেশি। তবে অন্য অর্থবছর চলতি সময়ের তুলনায় বেশি ছিল। বরাদ্দের তুলনায় বাস্তবায়ন অগ্রগতিতে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন করেছে ৭৭.৪৭ শতাংশ। এ ছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন করেছে ৭১ দশমিক ০৩ শতাংশ এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বাস্তবায়ন করছে ৭০ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
অন্য দিকে অর্থবছরের তিন ভাগ বা বেশির ভাগ সময় চলে গেলেও ১০ শতাংশও বাস্তবায়ন করতে পারেনি অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ। বিভাগটির ছয়টি প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ রয়েছে ৩১৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। আট মাসে তারা খরচ করেছে মাত্র ২২ কোটি ৩১ লাখ টাকা। অর্থাৎ মাত্র ৭ শতাংশ বাস্তবায়ন করতেই অর্থবছরের আট মাস শেষ। আগামী চার মাসে এ বিভাগের বাকি প্রায় ৯৩ শতাংশ বাস্তাবায়ন করতে হবে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এডিপি বাস্তবায়নে সবচেয়ে বেশি খরচ করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। বিভাগটি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে খরচ করেছে ১৭ হাজার ৭৮৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, যা বরাদ্দের ৪৪.৪৬ শতাংশ। আর সবচেয়ে কম খরচ করেছে বাংলাদেশ সংসদ সচিবালয়। তারা খরচ করেছে মাত্র ২৪ লাখ টাকা। যদিও তাদের জন্য এডিপিতে বরাদ্দ রয়েছে মাত্র এক কোটি টাকা।
সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত শীর্ষ ১৫ মন্ত্রণালয় মিলে বাস্তবায়নের অগ্রগতি মাত্র ৩২.৫২ শতাংশ। এদের মধ্যে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ২৬.৭৮ শতাংশ, রেলপথ মন্ত্রণালয় ৩৭.৯৩ শতাংশ, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ ১৪.৭১ শতাংশ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ৩২.৮৬ শতাংশ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ২০.৫৯ শতাংশ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ৩০.২৮ শতাংশ, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ১৩.৮৮ শতাংশ, সেতু বিভাগ ৩৮.২১ শতাংশ, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ৪২.৭৭ শতাংশ, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় ৪৬,৭৯ শতাংশ, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ৩১.৭৩ শতাংশ, শিল্প মন্ত্রণালয় ২০.৮১ শতাংশ এবং কৃষি মন্ত্রণালয় ৪৬.৪১ শতাংশ।





